সাংবাদিক নামে ভুঁইফোড় সাংবাদিক

সাংবাদিকতা একটা নীতি নৈতিকতা বোধ সম্পন্ন পেশা, যা মর্যাদাসম্পন্ন। সাংবাদিকরা বিপদে মানুষকে সাহায্য করতে পারেন, পারেন সমাজের যে কোন অন্যায় অসংতির প্রতিবাদ করতে আজ এ লেখায় আমার প্রিয় সাংবাদিকতা নিয়েই কিছু কথা বলবো।এসব আমার নিজস্ব ভাবনা, কাউকে আঘাত করতে নয়।গুরুত্বপূর্ণ এ পেশার কিছু অসংঘতি, আশার নিরাশার কথাই তুলে ধরবো এখানে।

একটি শব্দ, এমনকি নিজের নামটি সঠিকভাবে লিখতে বা বানান উচ্চারণ করতে না পারলেও অনেকেই এখন সাংবাদিকপারিচয় নেয়। নিজেকে বলেন ডিজিটাল সাংবাদিক। পড়া বা লিখার প্রয়োজন নেই। দেখতে ও বলতে পারলেই সাংবাদিক। তবে, তারা কেউ আবার সাংবাদিক শব্দটিও উচ্চারণ করতে পারেন না। বলেন, সম্বাদিক। কেউ বলেন, সাম্বাদিক। এদের গলায়রঙবেরঙের ব্যাগ, কোমরে হরেক রঙের বাহারী পরিচয়পত্র, হাতে নানা রঙ ও সাইজের মাইক্রোফোন ঝুলিয় তাদের বেশিরভাগইনতুন মোটরসাইকেলে চষে বেড়ায় পুরো এলাকা যেনো দেখার কেউ নেই। এদের বেশ-ভুষা দেখে দাপুটে সাংবাদিক মনে হলেওপরিচয়পত্র দেখলেই চোখ ছানাবড়া হওয়ার অবস্থা। তাদের কারণে পেশাদার সাংবাদিকগণ রয়েছেন চরম বিপাকে।

সাংবাদিকতা বা সাংবাদিক কাকে বলে এর নূন্যতম কাণ্ডজ্ঞান না থাকলেও নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে স্বার্থ হাসিল করারধান্দায় তারা এত চটুল, ঠিক, প্রতারণার আশ্রয় নেয় যে তাদের কাছে সকল সাংবাদিক গণমাধ্যম কোণঠাসা। এমন ভাবে তারানিজেদের উপস্থাপন করে যে, তাদের ভাবসাব দেখলে মনে হবে দেশের সকল গণমাধ্যম তাদের কথায় উঠবস করে। আসলে এসবপাকনা কথা তারাই বলে যারা প্রকৃত অর্থে মিথ্যাবাদী, ভুয়া অপসাংবাদিকতা করছে।

একশ্রেণীর ভুঁইফোড় অনলাইন টিভি ও অনলাইন পোর্টালের এক থেকে পাঁচ হাজার টাকায় সাংবাদিকের কার্ড কিনে পুরোউপজেলা চষে বেড়াচ্ছে প্রায় শতাধিক ভূয়া সাংবাদিক। একশ্রেণীর সংঘবদ্ধ এসব অসাধু চক্রের কাছ থেকে অনলাইন পত্রিকা ওঅনলাইন টিভির কার্ড নিয়ে তারা যথেচ্ছা করে বেড়াচ্ছেন। অথচ এরা কেউ স্কুলের গন্ডিও পেরুতে পারেনি। অধিকাংশক্ষেত্রেভুটভুটি চালক  নরসুন্দর, মুচি, ছিচকে চোর ও মাদক ব্যবসায়ীরাও পিছিয়ে নেই কার্ড কিনে সাংবাদিক পরিচয়ে দাপিয়েবেড়াচ্ছেন। এরা সাংবাদিক সেজে মোটরসাইকেলে প্রেস ও সাংবাদিক লিখে বোকা বানাচ্ছেন বিভিন্ন মহলকে।

তথাকথিত অনলাই পত্রিকা ও টেলিভিশনতো আছেই। মফস্বল এলাকায় এরকম পত্রিকা ও টেলিভিশন প্রতিনিধিদের বেশদাপট। ব্যস্ত সাংবাদিক। পরিচয়পত্র আর টেলিভিশন হলে, লগো ঝুলিযে ছুঁটে চলেন রানার! তাদের কত নামডাক। কোন ঘটন-অঘটন, এমপি, মিনিষ্টারের সভা-জনসভা এমনকি ইসলামি জলসা ও ঈদ জামাতের ছবি তুলায় তাদের ব্যস্ততা চোখে পড়ারমতো। আর নির্বাচন হলে তো কথাই নেই। তাদের ধারেকাছে যায় কে।

প্রিন্ট বা অনলাইন পোর্টালে কোন কথা লিখা যাবে, কোন কথা লিখা যাবে না, অথবা কোন ভিডিও চিত্র প্রকাশ করা যাবে আরকোন ভিডিও চিত্র প্রকাশ করা যাবে না সেই সম্পর্কে তাদের কোনো নুন্যতম ধারণা নাই। এরা মুঠোফোনে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় যেকোনো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শেয়ার করে সেটিঅনলাইন টিভি চ্যানেল বলে প্রচার করছে। কোনটি টিভি চ্যানেল, কোনটি অনলাইন টিভি, কোনটি ফেসবুক পেইজ এসবসম্পর্কে সাধারণ মানুষের তেমন ধারণা নাই, আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর টাউট-বাটপার অনলাইন টিভিচ্যানেলের নাম ভাঙ্গিয়ে সাংবাদিকতার নামে প্রতারণা করে চলেছে। তাদের প্রতারণার কারণে টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকগণ চরমবিপাকে পড়েছে। কারণ টিভি চ্যানেলে সংবাদের গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রচার করা, তাই সব ঘটনা প্রচার করা সম্ভব হয় না। কিন্তুএকশ্রেণীর এসব টাউট-বাটপার মুঠোফোনে যেকোনো ঘটনার ভিডিও করে তা ফেসবুক পেইজে শেয়ার করে টিভি চ্যানেল বলেপ্রচার করে সাধারন মানুষকে বোকা বানাচ্ছেন।

বিভিন্ন সংকটময় মূহুর্তে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা, পাতি নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যখন ত্রাণ বা কোন কিছু বিতরণকার্যক্রম পরিচালনা করেন তখন তারা ছবি তুলতে ও ভিডিও করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে, ফিরিয়ে বিভিন্নস্টাইলে ছবি তুলেন। যেন কোন প্রতিযোগিতার ফটো সেশন। দু’ পাঁচ’শ টাকার বিনিময়ে কতোজনের যে বিতরণের ছবি তুলেন, ভিডিও করেন, তা নিজেও জানেনা। মহাব্যস্ত এই সাংবাদিকরা এই মৌসুমগুলোতে ভালো টাকাও উপার্জন করেন, তাতে কোনসন্দেহ নেই।

বিশেষ করে বর্তমান করোনাভাইরাস প্রাদূর্ভার পরিস্থিতিতে তাদের অনেকের পোয়া বারো। করোনাভাইরাস প্রাদূর্ভার পরিস্থিতিমোকাবেলায় সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, মাস্ক প্রদানসহ ঘরে অবস্থানরত (হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা) নিন্ম আয়ের খেটেখাওয়া মানুষকে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, হুইপ, এমপি বা ওমুক নেতার সৌজন্যে খাদ্য বা ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের কথা বলেসুবিধাবাদিরা নিজে যখন এ কার্যক্রম করেন, তখন এইসব বড় বড় সাংবাদিকদের খুঁজছেন ছবি বা ভিডিও করার জন্য। কিন্তু, ওই  ছবি কোন পত্রিকা বা অল লাইনে প্রকাশ কিংবা ভিডিও কোন টিভি চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে, তা দেখারও সময় নেই, মন্ত্রী, হুইপ, এমপি বা ওমুক নেতার সৌজন্যে ওইসব দানশীল ব্যাক্তিদের। ছবির নিচে কিছু চমকপ্রদ কথা লিখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমফেসবুকে দিলেই মহা খুশি ওইসব দানশীল ব্যক্তি ও তাদের চামচারা। যারা ওই দানের সময় উপস্থিত ছিলেন।

সামাজিক দূরত্ব না মেনে ঘেষাঘেষি আর ঠেলাঠেলি করে দানের সময় ওই বস্তুটা নিজেও একটু ছুঁয়ে দিয়েছেন ওইসব চামচারাখুবেই খুশি এইসব মহান সাংবাদিকের উপর। তাইতো এসব সাংবাদিকের মহা দাপট। তাদের দাপট আর আচরণে এখন প্রকৃতসাংবাদিকরাই মুখ লুকিয়ে পালায়। নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। পেশাদার সম্মানিত সাংবাদিকদের জন্যবিষয়টি লজ্জাকর হলেও ছড়া ছন্দের মতই ভূয়া সাংবাদিকরা দেশ জুড়ে বেহাল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে ফেলেছে।

সাংবাদিক সেজেগুজে একশ্রেণির প্রতারক অফিস-আদালত, অলি-গলি চষে বেড়াচ্ছেন। পান থেকে চুন খসলেই রীতিমতবাহিনী নিয়ে হামলে পড়ছেন সেখানে। প্রকৃত ঘটনা কি-সে ঘটনার আদৌ কোনো নিউজ ভ্যাল্যু আছে কি না, সেসব ভেবে দেখারফুসরৎ নেই তাদের। তাদের দরকার নিজেদের প্রতাপ দেখিয়ে, আতংক ছড়িয়ে টুপাইস কামিয়ে নেয়া সাংবাদিক না হয়েও সাংবাদিকতার বেশভূষা তাদের মূল পুঁজি। খ্যাত-অখ্যাত একাধিক গণমাধ্যমের ৪/৫টি আইডি কার্ড বুকেপিঠে ঝুলিয়ে দাপিয়ে বেড়ায় সর্বত্র। যারা পেশাদার সাংবাদিক (সৃযোগ সন্ধানী) তাদের কারো না কারো সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেসাইনবোর্ড হিসেবেও ব্যবহার করেন তারা।

অনেকে আবার সাংবাদিকদের সংগঠনে নিজের নামটা লিখিয়ে নেয়, তা না হলে নিজেরাই’ সাংবাদিক’  ‘রিপোর্টার’ ‘প্রেসক্লাব’ শব্দ যোগ করে ভূইফোঁড় কোন সংগঠন খুলে বসেন। তখন তাদের বুলি থাকে অন্যরকম-“আমি সাংবাদিক কি না সেটা আপনারজানার দরকার নাই, আমি সাংবাদিকদের সেক্রেটারি বা প্রেসিডেন্ট আমি সাংবাদিক বানাই, আমার স্বাক্ষরে আইডি কার্ড দেই- আমার পরিচয় আলাদাভাবে দেয়ার কি আছে?” ভূয়াদের এতোসব সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ও কথিত ক্লাব-ইউনিটি, ফোরাম, সোসাইটি, সংস্থা, সমিতি দাপ্তরিক প্রতারণার ধকলে নানাভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে মহানসাংবাদিকতার পবিত্র পেশাটি। এরা মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে ‘প্রেস’ কিংবা ‘সংবাদপত্র’ লিখে নির্বিঘ্নেদাবড়ে বেড়ায়। ভূয়া সাংবাদিকের নানা অপকর্মের কারণে প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি এখন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার উপক্রমহয়েছে।

সাংবাদিকদের অনেকেই ব্যাঙ্গ করে বলেন ‘সাংঘাতিক” মফস্বল শহরের সাংবাদিকদের শরীরে তা তকমা হিসেবেই সেঁটে আছে! হেয় করে ‘সাংঘাতিক’ বলে আখ্যা দেয় । ‘সাংঘাতিক’ বলে ডাকে। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের ‘সাংঘাতিক’ কথাটি শুনতেনিশ্চয়ই অনেক অপমান বোধ হয়। শুনতে অনেক কষ্ট লাগে। কিন্তু, প্রকৃত কোনো সাংবাদিকই এ কথাটির জোরালো প্রতিবাদকরেন না। কারণ, তারা মনে করেন, এ কথার যুক্তিকতা আছে। তাই তারা হাসি মুখে কষ্ট করে হলেও কথাটি শুনে হজম করেফেলেন।

সাংবাদিক ও সাংঘাতিক দু’টি শব্দই বহুল প্রচলিত শব্দ দু’টি প্রায় সমউচ্চারিত কিন্তু অর্থ অনেক ভিন্ন। বাংলা অভিধানে‘সাংবাদিক’ শব্দের বর্ণনায় বলা হয়েছে, সংবাদ সর্ম্পকীয়। সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ বা পেশা করেন যিনি ; সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য সংবাদ সংগ্রাহক। সাংবাদিকের কাজ বা বৃত্তি ইত্যাদি। অপর শব্দ ‘সাংঘাতিক’ সম্পর্কে বলা হয়েছেভয়ানক; ভীষণ: মারাত্মক। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে দু’টি শব্দের অর্থ প্রায় সমপর্যায়ে চলে এসেছে।

 

সাংবাদিক না হয়েও মনগড়া অনলাইনের কার্ড বানিয়ে  মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরছে এবং সংবাদর নামে মিথ্যা তথ্য সরবরাহকরছে স্মার্টফোন পুঁজি করে। আবার কেউ সম্পাদক, কেউ প্রকাশক, কেউ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, কেউ চিফ রিপোর্টার  কেউ বার্তাসম্পাদক হয়েছে অথচ এরা কেউ স্কুলের গন্ডিই পেরুতে পারেনি তাহলে এরা এসব পদে অধিস্ট হয় কি ভাবে ইত্যাদি হাজারো প্রশ্নসাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ একশ্রেণীর এসব টাউট-বাটপারদের কারণে পেশাদার সাংবাদিকগণ পেশাগতদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনার মুখে পড়ছে বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে।

সংবাদ লেখা ও সাংবাদিকতায় সারাদেশে চাটুকার, প্রতারক, মিথ্যাবাদী ও অশিক্ষিত, মূর্খরা অনুপ্রবেশ করছে এই নিয়ে প্রকৃতসংবাদ ও সাংবাদিকতা প্রশ্নাতীতভাবে জৌলুস হারাচ্ছে এবং নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। শহরের তুলনায় এর প্রভাব জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়। আবার জেলার চেয়ে উপজেলা সমূহে আধিপত্যতা বেশি। কারণ জেলাতে প্রশাসনিকচাপের মুখে অপসাংবাদিকতা টিকতে পারেনা। উপজেলা পর্যায়ে গ্রামাঞ্চলে, চরাঞ্চলে নদনদীর দুর্গম এলাকা কেন্দ্রিকঅপসাংবাদিকতা, মিথ্যাবাদী, প্রতারকগোষ্ঠীরা সঙ্গবদ্ধ হয়ে তাদের অসৎ কার্যকলাপ চালিয়ে যায়।

সবশেষে যা না বললেই নয়, তাহলো পরিস্কার–পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন আর একেবারেই জরুরি দরকার ছাড়া বাইরে যাবেন না।বিপদে একে অন্যর পাশে দূর থেকে হলেও দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের যত্ন করুন। সবাই ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন, ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। নির্ভয়ে সবাইকে ভ্যাকসিন নিতে হবে এবং অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।মাহবুবে হাকীকীর দীদার নসিব করুণ এবং মহামারি করোনাভাইরাস থেকে আমাদের মুক্তি দান করুন। আমিন।

 

লেখক: আবু জাফর শিহাব(এল এল বি)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.