বজ্রপাত যেন বজ্রনাশ

বজ্রপাত জানা বা বোঝা সরাসরি বিজ্ঞানের বিষয়। বিজ্ঞানের বিষয় যেমন জটিল হয় আবার বুঝতে পারলে জলের মতন সহজ কেননা বিজ্ঞান তার সাধ্যমত সকল বিষয়কে মানুষের নাগালে নিয়ে আসে এবং ফলাফল দেয় প্রমাণ সহ।  বজ্রপাত বিষয়টি বিজ্ঞানের তৈরি বিষয় নয় , এটা প্রাকৃতিক। তবে এটা বোঝার জন্য বিজ্ঞানের সহায়তার প্রয়োজন অবশ্যই। সাধারণ মানুষের নিকট বজ্রপাত একপ্রকার ভয়ের এবং অপ্রয়োজনীয়ও বটে। কেননা বজ্রপাত আঘাত হানে এবং সরাসরি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিগত কয়েক বছর যাবৎ আমাদের দেশে বজ্রপাত ভয়ানক থেকেও ভয়ানক হয়ে উঠেছে। প্রায়শই পত্রিকায় দেখি বজ্রপাতের কারণে মাঠে- ময়দানে মৃত্যুর মিছিল।

 

দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বেড়েই চলছে। প্রতিকার বলতে অসহায়ের মতন মৃত্যুকে গ্রহণ করে নেওয়া মাত্র।  বজ্রপাতে এত মৃত্যু দেখে অনেকদিন যাবৎ আপন আগ্রহে এই বিষয়ে পড়াশোনা করার চেষ্টায় ব্রত আছি এবং বোঝার চেষ্টা করছিলাম, প্রতিকার কি ? তবে সত্যি বলতে বজ্রপাত নিয়ে যা বলা বা লেখা প্রয়োজন সেটা মোটেও সহজ বিষয় নয় কেননা এক বাক্যে বা হাতের আঙুল দিয়ে গুনে কোনো প্রতিকার নেই। বিষয়টি যতটা না জটিল তার চেয়েও বেশি জটিল প্রতিকারে কেননা এটা প্রাকৃতিক এবং অঞ্চল বা সীমানার কোনো নির্দিষ্টকরণ নেই । তবে প্রতিকারের জন্য সর্বপ্রথম যে বিষয়টির অতিব প্রয়োজন তা’হলো সচেতনতা।

 

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাড়ি- ঘর- দালান কোঠা বজ্রপাত থেকে নিরাপদ রাখা সহজ। আধুনিক যুগের বড় বড় সুউচ্চ বা সাধারণ দালান- কোঠাগুলোতে বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে রক্ষা করা হয়। যেমন : বাড়ির ছাদে মেটাল জাতীয় অ্যান্টেনা বসিয়ে বজ্রপাতকে দালানের নিচে মাটির ভিতর প্রবেশ করিয়ে  সুরক্ষা করা হয়। ইউরোপের প্রায় সব বাড়ি- ঘরেই  বজ্রপাত হতে সুরক্ষা পেতে এমন অ্যান্টেনা ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। পদ্ধতিটির টেকনোলজি শতভাগ বিজ্ঞান সম্মত ও শতভাগ কার্যকর। টেকনোলজির  বিষয়টি বলা মানে পুরো পদ্ধতিটি নিয়ে বিস্তারিত লেখার প্রয়োজন তাই এখানে লিখছি না, তা’ছাড়া এটা ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয় । তবে একথা সত্য যে, বাড়ি- ঘর- দালান- কোঠা নিরাপদ রাখা সম্ভব হলেও খোলা মাঠে বা জলে বজ্রপাত থেকে রক্ষার পদ্ধতি একটিই, সেটি হলো নিজেকে যথাসময়ে নিরাপদ স্থানে স্থাপন করা। এর ছাড়া ভিন্ন পথ নেই ।

 

একটু দেখে নেই বজ্রপাত মূলত কি ? বজ্রপাত যা ইংরেজিতে  Lightning বলা হয়, সেটা মূলত আকাশে আলোর ঝলকানিকে বুঝায়। সংক্ষেপে বললে বলা যায়,  বাতাসের সংকোচন ও প্রসারনের ফলে দুইখণ্ড বা অনেক খন্ড মেঘের মধ্যেকার এমনকি মেঘ ও মাটির মধ্যে বৈদ্যুতিক আধানের নির্গমন যা বিকট আওয়াজে আমরা শুনতে পাই। বায়ুমণ্ডলের উপরের অংশে নিচের তুলনায় তাপমাত্রা কম থাকে। এ কারণেই অনেক সময় নিচের দিক থেকে উপরের দিকে মেঘের প্রবাহ হয়। এ ধরনের মেঘ কে ” থাণ্ডার ক্লাউন ” বলা হয়ে থাকে।

 

অন্যান্য মেঘের মতন এই মেঘেও ছোটো ছোটো জলের কণা থাকে এবং উপরে উঠতে উঠতে জলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় । এভাবে জলের পরিমাণ যখন ৫ মিঃমিঃ এর বেশি হয়, তখন জলের অনুগুলো পারস্পরিক বন্ধন ধরে রাখতে পারে না। তখন জলকণাগুলো আলাদা হয়ে যায়। ফলে সেখানে বৈদ্যুতিক আধানের সৃষ্টি হয়। এই আধানের মান নিচের অংশের চেয়ে অনেক অনেক বেশি হয়। ঠিক এরকম বিভব পার্থক্যের কারণেই ওপর হতে নিচের দিকে বৈদ্যুতিক আধানের নির্গমন হয়। ঠিক তখনই আলোর ঝলকানি হয় যা মূলত বজ্রপাত ।  ওপরের ব্যাখ্যাটি প্রতিষ্ঠিত অনেকগুলো  ম্যাকানিজমের একটি। এখানে বলা ভালো যে, Hydrologist দের মাঝে নানান মতপার্থক্য দেখা যায়।

 

এশীয় মহাদেশের মধ্য ভুটান বজ্রপাতের দেশ হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও এশীয় দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা, ভারত, ও নেপালে বজ্রপাত বেশ ঘটে তবে বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবণতা অনেক বেশি। এর মূল কারণটি মৃলত ভৌগলিক। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, হিমালয় এই অঞ্চলে বজ্রপাতের অনেক বড় উপসর্গ বেশ উপস্থিত বটে।  ভৌগলিক বিষয়টিও বিস্তারিত ব্যাখার বিষয়। ভিন্ন কোনো লেখায় চেষ্টা থাকবে বিস্তারিত লেখার । বিশেষজ্ঞদের মতে বা খোলা চোখেই যা নজরে আসে, বজ্রপাতের কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে বিশেষিতভাবে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা কৃষক- শ্রমিক কিংবা নদী বা সমুদ্রের জলে মাছ শিকারে যাওয়া জেলে এমন সংখ্যাই বেশি। অধিকাংশেই এই মৃত্যুগুলো  অসচেতনতার কারণেই বেশি ঘটে।

 

সচেতন হতে পারলে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ থাকে। লক্ষণীয় যে, বজ্রপাত শুরু হবার পূর্বে কতগুলো ধাপ থাকে। প্রথম ধাপে বিদ্যুতের চমকানি থাকে। মেঘগুলো ঘণ ও জটলা হতে থাকে এবং আকাশ সেই সময়ে খুব বেশি মাত্রায় ঘণ কালো রূপ লাভ করে না। কিছুটা কালো মেঘের তৈরি হয় । সামান্য বৃষ্টি বা হালকা বিদ্যুৎ চমকায়।  অর্থাৎ জনমানুষেরা এগুলো দেখে সচেতন হতে পারেন বা হওয়া উচিত । এই বিষয়গুলো সবার দেখা ও জানাই আছে । শুধুমাত্র সঠিক সময়ে নিজেদের রক্ষা করাটাই হলো উপযুক্ত কাজ।

 

গাও- গ্রামে খোলা মাঠে উঁচু তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধে বেশ সহায়ক অবশ্যই । তবে সেটা আর আমাদের নাই বললেই চলে। এমন কি ব্রিটিশ আমলে সীমানা অঞ্চলগুলোতে একপ্রকার ম্যাগনেটিক পিলার ছিলো। যে পিলারগুলো পিতল, তামা, লোহা, টাইটেনিয়াম ও চুম্বকধতবের সমন্বয়ে গঠিত ছিলো এবং সেই পিলারগুলো বজ্রপাত থেকে রক্ষা দিতো মাটিতে আর্থিং এর সহায়ক ভূমিকায় । বজ্রপাতের সময় যে বিদ্যুতের ঝলকানি তৈরি হয়, পিলারগুলোর মেটেরিয়াল তা’শোষন করে আর্থিং এর মত কাজ করতো এবং মানুষ বজ্রপাত থেকে বেশ রক্ষা পেতো । দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দামী ধাতুর কারণে ( যদিও তেমন দামী নয় ) সেই সব পিলার ধীরে ধীরে সব খোয়া বা চুরি হয়ে গিয়েছে।

 

অনেকেই বলেন বা লিখেন বর্তমান যুগে মোবাইল টাওয়ারগুলোর কারণে বজ্রপাতে মৃত্যু বেশি হয়। বিষয়টি মোটেও বিজ্ঞান সম্মত নয়। যদি বিজ্ঞান সম্মত বিবেচনায় নেই তাহলে বলতেই হয়, উল্টো মোবাইল টাওয়ারগুলো উঁচু হওয়ায় বজ্রপাত থেকে সেই অঞ্চল কে রক্ষা হবার কথা। তবে হ্যাঁ মোবাইল টাওয়ারগুলোতে অবশ্যই বজ্রপাত হতে সুরক্ষার জন্য মেটাল অ্যান্টেনার সাহায্য মাটিতে আর্থিং এর ব্যবস্থা থাকতে হবে । তবে সাধারণ ধারণা থেকেই বলা যায়, যেহেতু মোবাইল টাওয়ারগুলো বিকিরণের কাজ করে, সেইহেতু নিশ্চয়ই সব মোবাইল টাওয়ারেই বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা করাই থাকে। তা’না হলে যে মোবাইল টাওয়ারগুলো অনায়াসেই ধ্বংস হয়ে যাবে। এমন কি জ্বলে- পুড়ে ছাড়খার হয়ে যাবে ।

 

গত দু’সপ্তাহ পূর্বেও দেশে বজ্রপাতে অনেকে মৃত্যু ঘটেছে। তবে প্রায় সব মৃত্যুই ছিলো খোলা মাঠের। দেশের জাতীয় পত্র- পত্রিকায় সেই সময়ে বিভিন্ন রকমের সুরক্ষার কথা ছিলো। নয়টি উপায়, বারোটি উপায়, ষোলটি উপায় কিংবা নানান উপায় ইত্যাদি ইত্যাদি।  কিভাবে ঘরে বসে থেকেও নিজেকে রক্ষা করবেন। বজ্রপাতের সময় কোথায় দাঁড়ানো যাবে না, কোথায় হাত দেওয়া যাবে না, কোথায় বেশি নিরাপদ ইত্যাদি।  অথবা নানান ধরনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরামর্শ। সেগুলো খুব স্বাভাবিক কারণেই উপযুক্ত পরামর্শ ছিলো। তাই সেই একি কথাগুলো লেখাতে তুলে আনলাম না। তবে একটি কথা শেষে বলতেই হয়, বজ্রপাতের সময় নিজেকে রক্ষার সবচাইতে উপযোগী হলো খোলা মাঠ থেকে সরে আসা। জলে থাকলে নৌকার ছই এর ভিতরে নিরাপদ হওয়া। মোদ্দা কথা বজ্রপাতের পূর্বাভাস লক্ষ্য রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই খোলা মাঠ ত্যাগ করা । এর বিকল্প নেই বললেই চলে । লেখার শেষ প্রান্তে এসে লিখতেই হয়, দেশের জনমানুষদের বজ্রপাত হতে সুরক্ষার বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই গবেষণায় আরো অনেক বেশি অর্থ প্রদান করতেই হবে। যত গবেষণা তত উপায় এবং তত মুক্তি।

 

 

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.