শহিদ পরিবার শহিদ কানাইলাল দাস

কানাই লাল দাস (২৭), জাতিতে ধীবর, মাছ ধরতেন, কেনাবেচা করতেন। এই নিয়েই টানাটানির সংসার চলতো যুবক কানাইলালের। সিরাজগঞ্জের বাগবাটী গণহত্যায় শতাধিক বাঙালির সঙ্গে শহীদ হন তিনিও। তিন সন্তান নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন তাঁর অন্তঃস্বত্তা স্ত্রী সন্ধ্যারাণী দাস। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কিভাবে পালিয়ে বেড়িয়েছেন সন্তানদের নিয়ে, স্বাধীনতার পর সরকারি সহযোগিতা ছাড়া কিভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে, তা মনে পড়লে এখনো শিউরে ওঠেন তিনি। শহিদের স্ত্রী সন্ধ্যারাণী দাসের সঙ্গে কথা হয় বাগবাটীর দূর্গা-গোপাল মন্দির প্রাঙ্গণে। তিনি জানান, তাঁর বাবা বোঁচা সরকারও মাছ ধরে বিক্রি করতেন। তাঁর বাবার বাড়ি জামালপুরের সরিষাবাড়িতে। চার ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। মুক্তিযুদ্ধের অন্তত সাত বছর আগে তার বিয়ে হয়। চলে আসেন তার শশুরের গ্রাম হরিণা বাগবাটিতে। চান্দু, বিশ্বনাথ ও ঝর্ণা নামের তিন সন্তানের জন্ম দেন সন্ধ্যারাণী দাস। চোখের সামনে নানা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আসে সত্তুরের নির্বাচন। তারা সবাই পাড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভোট দেন শেখ মুজিবের নৌকা মার্কায়। ভাবতে থাকেন, এবার ‘শেখের ব্যাটা’ তাদের দুঃখ ঘোচাবেন। কিন্তু দেশে বেঁধে যায় যুদ্ধ। বিভিন্ন এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপদ ভেবে আশ্রয় নিতে থাকে তাদের হরিণাবাগবাটীতে। সে সময় বেড়ে যায় ডাকাতের উপদ্রæপ। ডাকাতের হাত থেকে রক্ষার পাশাপাশি ‘মিলিটারি’ এলে যেন আগেই খবর পাওয়া যায়, বাড়ির আশপাশের আড়ার মধ্যে পালিয়ে থাকা যায় এ জন্য প্রত্যেক বাড়ির লোকজন মিলে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। শহিদের স্ত্রী জানান, কিন্তু হরিণা-বাগবাটীতে একদিন কালোদিন হয়ে আসে। দিনটি সম্ভবত জুন মাসের প্রথম দিকে। সারারাত গ্রাম পাহারা দিয়ে বাড়ির পুরুষেরা এসে কেবলই ঘুমানোর আয়োজন করছেন। তখনই শোরগোল শোনা যায়, ‘মিলিটারি এসে গেছে, গ্রাম ঘেরাও করে ফেলেছে। পালাও পালাও।’ স্বামী আর দুই শিশু সন্তানকে বিছানা থেকে তুলে দেন বিছানা থেকে। ছেলে চান্দুর বয়স তখন ছয় বছর আর বিশ্বনাথের বয়স চার বছর। শিশু সন্তানদের পালিয়ে যেতে বলেন বাড়ির পাশের আড়ার মধ্যে। কোলের শিশু ঝর্ণার বয়স দেড়/দুই বছর। তাকে বুকে জড়িয়ে নিজেও আশ্রয় নেন বাড়ির পাশের (বর্তমান বাগবাটী দূর্গা-গোপাল মন্দিরের পাশে) আড়ার মধ্যে। তার মতোই সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন আরো অনেকেই। সবাই চুপচাপ। চাপা আতঙ্ক। কেউ গর্তের মধ্যে, কেউ গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে-বসে-শুয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন। এমনি সময়ে জমদূতের মতো আড়ার মধ্যে ঢুকে পড়ে দুই রাজাকার। তারা ধরার চেষ্টা করে পুরুষদের। তাদের সঙ্গে গ্রামবাসীর পাছড়াপাছড়ি শুরু হয়। তখন আরো কয়েকজন পাকসেনা আর রাজাকার এসে এলোপাথারি গুলি করতে শুরু করে। ধরে ফেলে কাউকে কাউকে। এক লাইনে দাঁড় করায় তার স্বামী কানাইলাল দাস, ভানু দত্ত, সানু দত্তরা দুই ভাই, হরিপদ দত্ত, শ্যামা দত্তসহ ৭ জনকে। তাদেরকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ঠা ঠা করে গুলি করে হত্যা করে। সে এক বিভীষিকাময় সময়। দুই সন্তানকে তখনো খুঁজে পাননি সন্ধ্যা। বুকের মধ্যে থাকা শিশু সন্তানকে নিয়ে পড়িমরি করে আড়ার মধ্যে থেকে বেড়িয়ে ছুটতে থাকেন পাশের গ্রামের দিকে। আশ্রয় পান এক মুসলমান পাড়ায়। তারাও ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে আশ্রয় দিতে দ্বিধা করেন না। হুশ ফেরার পর স্বামী-সন্তানকে খুঁজতে আবার ফিরে আসার চেষ্টা করেন হরিণা বাগবাটী গ্রামের দিকে। কিন্তু গ্রামবাসী তাকে ওই বিপদের অগ্নিকুন্ডের মধ্যে আসতে দেয় না।

শহিদ কানাইলাল দাসের স্ত্রী সন্ধ্যারাণী বলেন, পরে তাদের গ্রামের আরো অনেকেই আশ্রয় নেয় সে গ্রামে। তাদের কাছে নিশ্চিত হন স্বামীকে পাকসেনা ও রাজাকারদের হত্যার খবর। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের সামান্য বাড়িঘর। একদিন পর খুঁজে পান দুই শিশু সন্তান, দেবর বলরাম দাস ও তার জা’কে। এই বিপদের সময় দেবর-জা হয়ে ওঠে তার বেঁচে থাকার অবলম্বন, সহায়-সম্বল। আশ্রয় নিতে এ গ্রাম সে গ্রাম ছুটে বেড়াতে থাকেন। মানুষ আশ্রয় দেয় আন্তরিকতা নিয়ে ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে। খেতেও দেয় তাদের সামর্থ অনুযায়ী। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে পাকসেনা ও রাজাকার থেকে বাঁচিয়ে রাখার ভরসা দিতে পারে না। এ পরিস্থিতিতে আরো কয়েকটি হিন্দু পরিবারের সঙ্গে তারা চলে যান ভারতের মাইনকারচরে। সেখানে দশ/পনের দিন থাকার পর তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় নিদানপুর শরণার্থী ক্যাম্প। সেখানেই মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জন্ম নেয় তার শেষ সন্তান। মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে চাইলেও শরণার্থী শিবিরের নাম অনুযায়ী সন্তানের নাম রাখেন নিদান দাস। দেশ তখন স্বাধীন হয়েছে। ধুবড়ি থেকে সন্ধ্যারাণীদের একটি নৌকায় তুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় দেশে। সন্ধ্যারাণী বলেন. ১১ দিনের সন্তান নিদানকে নিয়ে নৌকায় ওঠেন তিনি। তাদের নামিয়ে দেওয়া হয় সিরাজগঞ্জের জেলখানার ঘাটে। দেবর-জায়ের ওপর ভরসা করে তিনি শিশু সন্তানদের বুকে জড়িয়ে নিয়ে চলে আসেন স্বামীর ভিটায়। পোড়াবাড়ি তখন খাঁখাঁ করছে। থাকার মতো অবস্থা নেই। পাশেই শহিদ কুলু দারোগার বিশাল বাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে, সেখানকার এক ঘরে আশ্রয় নেই তারাও। দেবর আর তার স্ত্রীর আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে শুরু হয় স্বামীহারা মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। শুনেছেন, শহিদ পরিবার বা মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের জন্য তখর নানা সাহায্য সহযোগিতা করেছে সরকার। কিন্তু তিনি কোনও সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পাননি আজ পর্যন্ত। দেবর আর তার স্ত্রী তাদের ভগবানের মতো সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। এখন ছেলেরাই তার দেখাশোনা করে। একটি বৃদ্ধভাতার কার্ড পেয়েছেন কিছুদিন আগে, তা-ও নানা কারসাজির মধ্যে দিয়ে, শহিদ পরিবারের সদস্য হিসেবে তো নয়ই।

সন্ধ্যারাণী দাস (৭৪), স্বামী: শহিদ কানাইলাল দাস। গ্রাম: হরিণা বাগবাটী। সাক্ষাৎকার: বাগবাটী দূর্গা-গোপাল মন্দির প্রাঙ্গণ। ১৮ জনু ২০২১, বিকেলে। সাইফুল ইসলাম, রাজনৈতিক কর্মী-মুক্তিযোদ্ধা-লেখক। সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহŸায়ক।

 

বাগবাটী-সিরাজগঞ্জ প্রতিবেদক- সাইফুল ইসলা

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.