প্রাক কথন: সমঝোতা সখ্যতার ব্রিটিশ পর্ব
ভারতীয় উপমহাদেশে নানা ধাঁচের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন শুরু ১৯০০ সালের আগে। এই আন্দোলন ভারতের নানা অঞ্চলে নানা ভাবে বিকশিত হয়েছিল। ভারত যেহেতু এক দেশ ছিল না সেহেতু আজকের ভারত – পাকিস্তান -বাংলাদেশ দখল করতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির একশত বছরের বেশি সময় লেগেছে।
যুগে যুগে বিদেশী শক্তি ভারত বর্ষ হিসেবে পরিচিত অঞ্চলকে বিজয় করে শাসন করেছে। মোগল ও ব্রিটিশ এই ধারার শেষাক্ত বিদেশী শক্তি ছিল। ১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশ ভারত ছেড়ে যাচ্ছিল সে সময়ে ভারতে ছোট বড় মিলিয়ে ৩০০ দেশীয় রাজ্য বা করদ রাজ্য ছিল ছিল। এই রাজ্য গুলি সরাসরি ব্রিটিশ শাসনে ছিল না। এই রাজ্য গুলি আইন কানুন নিজেদের মত করে পরিচালনা করত। বৈদেশিক নীতি ও সামরিক শক্তির জন্য ব্রিটিশের উপর নির্ভরশীল ছিল। এই রাজ্য গুলি ব্রিটিশকে নিয়মিত কর দিতে বাধ্য ছিল। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ত্রিপুরা এই জাতীয় দেশীয় রাজ্যের উদাহরণ।
১৯৪৭ সালে ভারত – পাকিস্থান সৃষ্ট্রির পরে অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য নিজ ইচ্ছায় ভারত – পাকিস্থানে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছিল। এর প্রধান কারণ ছিল এই রাজ্য গুলি ভৌগোলিক ভাবে ভারত – পাকিস্থান এর পেটের মধ্যে ছিল। পৃথক ভাবে টিকে থাকার অর্থনৈতিক অবকাঠামে এদের ছিল না। ভাষা ও সংস্কৃতিতে পাশ্ববর্তী অঞ্চল গুলি থেকে পৃথক ছিল না। এই সব রাজ্যে সামন্ততান্ত্রিক শোষনে মানুষের জীবন ছিল দুর্বিষহ। হায়দারাবাদ ছিল সামন্ততান্ত্রিক শোষনে দুর্বিষহ জীবনের প্রতিচ্ছবি। তেলেনাঙ্গর বিখ্যাত কৃষক বিদ্রোহ এই হায়দারাবাদ অঞ্চলে প্রবাহমান ছিল ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টির আগে ও পরের সময়ে। হায়দারাবাদ ও জুনাগড় এর মত দেশীয় রাজ্য জনগণের সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দু ও রাজন্য মুসলিমকে ভারতভুক্তিতে সামরিক শক্তি প্রয়োগ প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কাশ্মীর সেই থেকে রাজার ইচ্ছে ও জনগণের ইচ্ছের টানাটানিতে জ্বলছে।
অবিভক্ত বাংলায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। এই সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের বড় অংশ পরবর্তী কালে কমুনিস্ট পার্টি গঠনের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এম এন রায় এই ধারা থেকে এসেছিলেন। ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের অপর ধারা বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল -RSP প্রথম কাতারের প্রায় সকলেই সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন থেকে এসেছিলেন। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির বাংলা অঞ্চলের নেতাদের যদি ১৯১৭ সালের রাশিয়ার প্রেক্ষাপটের ছাঁচে ফেলে তুলনা করা যায় তবে বিষয়টা দাঁড়ায় নারোদনিকরা [ সন্ত্রাসবাদী ] কমুনিস্ট রূপান্তরিত হয়েছে।
তৎকালীন রাশিয়ার নারোদনিক [ সন্ত্রাসবাদী ] ও বাংলার অনুশীলন – যুগান্তর সন্ত্রাসবাদী দলের মৌলিক নীতিগত ও গুনগত পার্থক্য বিস্তর ছিল। নারোদনিক [ সন্ত্রাসবাদী ] আন্দোলন ছিল মূলত রাশিয়ান বুদ্ধিজীবীদের পুঁজিবাদবিরোধী , জারতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন। নারোদনিকরা কৃষক শ্রেণিকে শিক্ষিত করে গ্রামীণ রাশিয়ানদের দ্বারা অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিপ্লব সম্ভব বলে মনে করতেন। নারোদনিকরা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য গুপ্ত হত্যাকে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত।
বাংলায় স্বদেশী আন্দোলনের সূচনা করেছিল বিপ্লববাদী সংগঠন – অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর সমিতি। এদের লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসমূলক কর্মকান্ড পরিচালনার মাধ্যমে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানো। এই দল দুইটির সদস্য পদ শুধু মাত্র হিন্দুদের জন্যই সংরক্ষিত ছিল। যদিও কোন সাম্প্রদায়িক হানাহানি বা বিভেদ এর সাথে অনুশীলন -যুগান্তর যুক্ত ছিল না। ব্রিটিশকে বিতরণ করার পর রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি হবে সে সম্পর্কে অনুশীলন -যুগান্তর এর স্পষ্ট কোন রূপ রেখা ছিল না। রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য গুপ্ত হত্যাকে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত অনুশীলন -যুগান্তর ।
সম -সমাজবাদী আন্দোলনের উভয় ধারার নেতারা ১৯৪৭ সালের সময় কালের গড়ে ১৫-২০ বছর জেল কিংবা আত্ম গোপনে কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। একটি বড় অংশের জীবনে বিয়ে ঘর সংসার কোন কিছুই হয়নি। দল ও বিপ্লবের জন্য পুরো জীবন পার করে দিয়েছেন নিষ্ঠার সাথে হাসতে হাসতে। রাজনৈতিক দৃঢতার কারণে প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মানিয়ে নিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন থেকে কমিউনিস্ট আন্দোলনে আসা নেতা কর্মীরা। । প্রসঙ্গতঃ ,ঘর সংসার না করা বা রৈরাগ্য সাধনের সাথে সাম্যবাদী আন্দোলনের কোন সম্পর্ক নেই।
এত আত্ম ত্যাগের পরেও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এই পাশে দাঁড়ানোর এক মাত্র প্রধান কারণ ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করে স্থানীয় পার্টির নীতি নির্ধারণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ফ্রন্টে রাশিয়ার মিত্র ছিল ইংল্যান্ড। তাই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ইংল্যান্ডের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে। শ্রমিক ধর্মঘট বন্ধ রাখে এবং ভারতছাড়ো আন্দোলন থেকে দূরে থাকে। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি ও স্টালিনের নির্দেশে দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি একই পথে হাঁটে।
ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির এই নীতি ছিল প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে লেলিনীয় আন্তর্জাতিকতা বাদী নীতি বিরোধী। প্রথম মহাযুদ্ধের শুরুতে ১৯১৪ সালে লেলিনীয় নীতি ছিল নিজ দেশের শাসক গোষ্ঠী প্রধান শত্রু। সৈনিকদের প্রতি আহ্বান ছিল নিজের শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কামান দাগও। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি এই নীতির বিপক্ষে গিয়ে তৎকালীন শাসক গোষ্ঠীর সাথে হাত মিলিয়েছিল। ঠিক সেই সময়ে সদ্য গঠিত বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল -RSP প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে লেলিনীয় নীতি অনুসরণ করে স্লোগান তুলেছিল সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের জন্য একটি ভাই ও না একটি পয়সা না।
এইভাবেই ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব থেকে কমিউনিস্ট পার্টি ছিটকে পড়েছিল। প্রায় অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল বাংলাদেশ সৃষ্টির সময়।
কমিউনিস্ট পার্টি ও আরএসপির রাজনৈতিক বিরোধিতা অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে রক্তাক্ত সংঘর্ষে রূপ নিয়েছিল। ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী ‘ লেখক হিসেবে উপস্থাপিত সোমেন চন্দ এই হানাহানির শিকার। সোমেন চন্দ সাহিত্যিক ও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন । ১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিট্রিশ এর পক্ষে ছিল। আরএসপি ছিল সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিপক্ষে। এই দুই দলের সংষর্ষে সোমেন চন্দ নিহত হয়েছিলেন ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ। আজকাল সোমেন চন্দকে ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ের লেখক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস সামান্য ভিন্ন। ব্রিটিশ সমর্থক কমিউনিস্ট পার্টি ও ব্রিটিশ বিরোধী আরএসপি এর হাঙ্গমাতে সোমেন চন্দ নিহত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক হানাহানিতে মৃত্য নিন্দনীয় ও দুঃখজনক। সাহিত্যিক সোমেন চন্দ ও রাজনৌতিক সোমেন চন্দকে পৃথক ভাবে দেখার অবকাশ আছে।
এই আলোচনা শুধু মাত্র ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় কমিউনিস্ট পার্টি ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল -RSP তৎকালীন ভূমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

অপু সারোয়ার

