কেন আমাদের এখনও আন্তর্জাতিক নারী দিবস দরকার!

কেন আমাদের এখনও আন্তর্জাতিক নারী দিবস দরকার! আমি প্রায়ই কিছু লোককে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে বলতে বা মন্তব্য করতে শুনি ” আন্তর্জাতিক নারী দিবস নিয়ে    আপনি আর কি করবেন? আজকাল নারীদের রাজত্ব সর্বত্র এবং তারাই হয় পৃথিবী শাসন করছে”। যাদের এমন অজ্ঞ এবং অন্ধ মনোভাব আছে তাদের সাথে আমি একমত নই। আমার কাছে, আন্তর্জাতিক নারী দিবস মানে সমান ভোটাধিকারের ও নারী মুক্তি আন্দোলন জন্য যারা যুদ্ধে করেছিলেন এবং একবিংশ শতাব্দীতে ও নানা ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন তা উদযাপন করা। আমাদের আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করার প্রয়োজন অনেক গুলো কারণে। প্রথমতঃ যদিও আমরা একবিংশ শতাব্দীতে বাস করছি, বিশ্বজুড়ে এখনও নারীরা ভয়াবহ বৈষম্য এবং অবিচারের মুখোমুখি হচ্ছে। দ্বিতীয়তঃ নারীরা বিশ্ব জনসংখ্যার অর্ধেক প্রতিনিধিত্ব করা সত্ত্বেও, তাদের এখনও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উপার্জন ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সমান সুযোগ নেই। তৃতীয়তঃ প্রতিদিনের ভিত্তিতে বিশ্বজুড়ে তিনজনের মধ্যে একজন নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, নারী দেরকে যৌন নির্যাতন, লাঞ্ছিত ও হত্যা করা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী পুরুষদের চেয়ে বেশি। মহিলা এবং মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনও নিয়মতান্ত্রিক হিসাবে প্রমাণিত। শুধুমাত্র বেশিরভাগ নারীরা যে বাড়িতে বা নিজ গৃহে সহিংসতার শিকার হন, তা নয়, এক পর্যায়ে নারীর প্রতি সহিংসতাও ‘রাজনৈতিক’ হিসাবে দেখা যেতে পারে, কারণ ঘরে এবং বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই নারীরা নানা ভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং নির্যাতিত। তারা এখনও কর্মক্ষেত্রে বা রাস্তায় যৌনতার মুখোমুখি। পুরুষদের তুলনায় নারীরা এখনও দারিদ্র্যের মধ্যে বেশি। বেশিরভাগ নারীরা গার্হস্থ্য কাজ করেন বা প্রত্যাশিত গৃহস্থালীর কাজ সম্পাদন করেন, তারা প্রতিদিন ১৬ ঘন্টা অন্তত কাজ করেন। অনেক ক্ষেত্রে, অজ্ঞাতসারে, তাদের নীতিট নিহত হয়, শক্তি নষ্ট হয়, মনোবল চূর্ণ হয় এবং তার পরও তারা চালিয়ে যায়। একজন মহিলার ভূমিকা শিশু যত্ন ও বাড়ির যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে দেখা হয়। এখনও বেশিরভাগ মহিলার বাড়ি এবং শিশুদের যত্ন নেওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। অভিজ্ঞতার মাত্রা সমান বা তার চেয়েও বেশি থাকা সত্বেও নারীরা একই পেশায় পুরুষদের চেয়ে কম বেতন পাচ্ছেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ও নারীদের নিম্ন-প্রতিনিধিত্ব করা হয়। বিশ্বব্যাপী, পাঁচ সংসদ সদস্যের মধ্যে কেবল একজন মহিলা। COVID-19 ও নারীদের গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছে, প্রতিদিন তারা নানা ধরনের অসমতার মুখোমুখি হচ্ছেন। মহিলাদের কর্মসংস্থানের উপর এক বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলেছে এবং তারা পুরুষদের চেয়ে দারিদ্র্যের মধ্যে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

 

লকডাউন চলাকালীন বিশ্বজুড়ে গার্হস্থ্য নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন এবং নারী ও মেয়েদের প্রতি সহিংসতা ব্যাপক হারে বেড়েছে। কেবল এগুলোই নয়, এধরনের আরও চ্চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন প্রতিনিয়তই বিশ্বের নারীরা। সাম্যের জন্য লড়াই যদিও অনেকটা এগিয়েছে, এবং আমরা অনেক সমর্থনও পাচ্ছি, তারপরও আমাদের অবশ্যই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে এবং কীভাবে আমরা অগ্রগতি করতে পারি তার প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে এবং আমাদের মনে রাখতে হবে “A challenged world is an alert world.” ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের মধ্যে কেউই আমাদের জীবনকালে লিঙ্গ সমতা দেখতে পাবোনা এবং সম্ভবত আমাদের অনেকের বাচ্চারাও দেখতে পাবে না। লিঙ্গ সমতা অর্জন করতে প্রায় এক শতাব্দী বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। সুতরাং আমাদের অনেক কাজজ করার আছে এবং আমরা সবাই সেই কাজগুলোতে অংশ নিতে পারি এবং নিজ নিজ ভূমিকা পালন করতে পারি। আমরা জানি, আমাদের কারোরই পক্ষে একাকী পৃথিবী পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে সম্মিলিত ভাবে কাজ করলে নারী হিসাবে আমরা কী অর্জন করতে সক্ষম তা কল্পনাও করতে পারি না।

 

 

 

সম্মিলিতভাবে, আমরা সবাই একটি অন্তর্ভুক্ত বিশ্ব তৈরিতে সহায়তা করতে পারি। তবে প্রথম এবং সর্বাগ্রে আমাদের এই সত্যটি গ্রহণ করতে হবে যে ‘সমান বিশ্ব একটি সক্ষম বিশ্ব, এবং নারীর অধিকারের জন্য লড়াই মানে মানবাধিকারের লড়াই। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের লক্ষ্য হ’ল বিশ্বব্যাপী দেশগুলিকে নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণে সহায়তা করা। আসুন আমরা সবাই মিলে এই নারী দিবসে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই এবং সব ধরনের বৈষম্য এবং অবিচারেকে চ্যালেঞ্জ করি, কারন চ্যালেঞ্জ থেকে আসে পরিবর্তন। আন্তর্জাতিক মহিলা দিবসকে সমর্থন করার জন্য #ChooseToChallenge একটি শক্তিশালী প্রক্রিয়া হতে পারে। আমি একজন মা, একজন নারী, আমার শিক্ষা, ক্যারিয়ার, এবং ব্যাক্তিগত/সংসার জীবনে ও অনেক চড়াই উতরাই, অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং সেই বাধাগুলো অতিক্রম করেই আমি আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি সেই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি। এখনও চলার পথে প্রতিনিয়তই নানা ধরনের বৈষম্যের ও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি এবং সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। আমার, বন্ধু-বান্ধব, স্বজন এবং সহকর্মীর মধ্যে অনেক নারীরাও এই এই ধরনের লড়াই লড়ছেন। আমি আমার নিজের পরিকল্পনা, গবেষণা ও উপস্থাপনায়, লন্ডনবাংলা’র নিয়মিত বিষয় ভিত্তিক, বিশ্লেষণ মূলক অনুষ্ঠান ‘আগামীর পথে’ নামে একটি টক শো, তৈরি করতে সক্ষম হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমরা নারীদের বিরুদ্ধে ঘরোয়া সহিংসতা, ধর্ষণ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং বিবাহের ক্ষেত্রে বয়সের ব্যবধানের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকি। লিংকটি টিপ দিলেই দেখতে পাবেন। (https://www.youtube.com/playlist?list=PLIuPXpOY1KediRFlWmnzljLlSZwjP7phU). আমি আপনাকে সকলকে এই ভিডিওগুলি দেখতে, এবং সমতা অর্জনের লড়াইয়ে আমাদের যুদ্ধে সহায়তা করতে করতে ও সাথে থাকবার আহবান জানাচ্ছি।

হুসনা খান হাসি লন্ডন ০৮/০৩/২০২১

One comment

  1. হুসনা খান হাসির লিখা – কেন আমাদের এখনও আন্তর্জাতিক নারী দিবস দরকার ? প্রবন্ধটি চমৎকার, তথ্য সমৃদ্ধ, নারী সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য দিক নির্দেশক দিশারী হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। লিখাটিতে নারীদের অবস্থা ও অবস্থানের বিস্তারিত বিবরণ আছে কিন্তু অবস্থার পরিবর্তনের কোন পরিকল্পনা পরিষ্কার করা হয় নাই। একুশ শতকে এসেও আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করতে হয় কেন ? যদি নারী সমাজের অকাঙ্খিত অবস্থা এবং অনির্ধারিত অবস্থান পরিবর্তন করার জন্য আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলন করা না হয় তাহলে আরো অনন্তকাল আমাদের আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদ্যাপন করতে হবে ব্যর্থ ভাবে। হুসনা খান হাসির এই লিখাটি নারীদের জন্য একটি জাগরণী বার্তা হবে এই আশা করি। প্রবন্ধটি ইংলিশ, ফ্রান্স সহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক ভাবে প্রচারিত হোক এই উদ্যোগ নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসার জন্য আবেদন জানাচ্ছি। শুভেচ্ছান্তে নুরুল ইসলাম, টরন্টো, কারাডা

Leave a Reply to Nurul IslamCancel reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.