মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধু-সরকারের চালকৃত আদলে “অন্তর্বর্তীকালীণ ৯ম জাতীয় বেতন স্কেল” চালু করা হলে প্রবৃদ্ধির হার আরও ২.৫% বাড়বে

জাতীয় আয়-বন্টণ ও জনপ্রতি জাতীয় আয়ের সামঞ্জসে জাতীয় বেতন স্কেলগুলো হলে, দেশের সরকারী দপ্তরসমূহ কর্মশীল থাকে। অনিয়মসহ দূণীতিও নিয়ন্ত্রণে থাকে। বিষয়টি অর্থনীতিতে আলোচিত নয়। তবে সাবেক সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার জাতীয় বেতন স্কেলগুলোর সাথে অর্থনীতির পর্যালোচনা করা হলেই সেটা অনুধাবন করা যাবে।

 

১৯৭১-এর আগে উচ্চতর আয়ী পশ্চিম পাকিস্তানের ভিত্তিতে জাতীয় ও প্রাদেশিক বেতন স্কেল নির্ধারিত হতো। ১৯৬৩ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন অনুপাত ৪৬.২ঃ১ ও ৩০.৭ঃ১ ছিল। তাই স্বাধীনতোত্তর জাতীয় আয়-বন্টণের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জাতীয় বেতন স্কেলে পূণর্গঠণ করা অপরিহার্য ছিল।

 

বৃটিশ-বঙ্গে বাঙালী মুসলমানেরা প্রধানতঃ নিম্ন-মধ্য ও নিম্ন আয়ী গ্রামীণ জীবণে আবদ্ধ ছিল। বাঙালী হিন্দুরা উচ্চ, উচ্চ-মধ্য ও মধ্য আয়ী ছিল। ১৯৪৭ উত্তর প্রর্ত্যাগমনের সাথে সাথে বাংলাদেশাঞ্চলে জাতীয় আয়গোষ্ঠীর পূনর্গঠণ শুরু হয়। ১৯৪৭ উত্তর জাতীয় সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন গড়-আয়ের অনুপাত বাড়ন্ত হয়।

 

স্বাধীনতোত্তর বঙ্গবন্ধু-সরকারামলে চলমান জাতীয় আয়-বন্টণের নিড়িখে সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন মূলবেতন টাঃ২,০০০/- ও টাঃ১৩০/- নির্ধারণসহ করা ১ম জাতীয় বেতন স্কেল চালু করা হয়। বাস্তব জাতীয় পরিস্থিতির চেয়ে জাতীয় বেতন স্কেলে অনুপাতের বেশী এবং বেতন সমকালীণ হওয়ার কারণে প্রবৃদ্ধির হার উচ্চতর ৯.৭% হয়।

 

জাতীয় আয়-বন্টণের সর্বোচ্চ ও সর্বনিন্ম বেতন-অনুপাত বাড়ন্ত থাকে। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক ও মানবিক বিবেচনায় ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম জাতীয় বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ ও সর্বনিন্ম বেতন-অনুপাত ১৫.৪:১ থেকে ক্রমান্বয়ে ১৩.৩:১, ১২:১, ১১.১:১, ১০:১, ৯.৬:১ ৯.৮:১ ও ৯.৪-এ হ্রাস করা হয়।

 

জাতীয় আয়-বন্টণের বাড়ন্ত আয়-অনুপাতের বিপরীতে ১ম থেকে ৮ম জাতীয় বেতন স্কেলগুলোর সর্বোচ্চ-সর্বনিন্ম বেতন-অনুপাত কমান্ত হওয়ায় অর্থনীতিতে এর অবদান যথাক্রমে প্রায় (+)২.২%, (+)১.৪%, (+)০.৬%, (-)০.১%, (-)০.৬%, (-)১.১% (-)০.৯% ও (-)১.৩% হয়।

 

ভারত-পাকিস্তানের জাতীয় আয়-বন্টণের অনুপাত ৩৪ঃ১ ও ৩৩ঃ১। আয়কর বাদে জাতীয় বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন বেতন অনুপাত ১৮ঃ১ ও ১৮.৭ঃ১ (ইন্টারনেট দেখুন)। বাংলাদেশের জাতীয় আয়-বন্টণের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন অনুপাতের স্থিতিশীল ধারা এখন ৩২ঃ১। আয়কর বাদে জাতীয় বেতন স্কেলের জন্যে সে অনুপাত ২০ঃ১ সুষম।

 

জাতীয় আয়-বন্টণের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন অনুপাতের স্থিতিশীল ধারা ৩২ঃ১-এর বিপরীতে জাতীয় বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন বেতন-অনুপাত ৯.৪ঃ১ তথা অর্ধেকেরও কম হওয়ায় অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির হারের উপর সরকারী সংস্থাসমূহের ভাব (-)১.৩% তথা অবদানের বদলে অপদান রাখে। এ অনুপাত ২০ঃ১ হলে প্রবৃদ্ধির হার ৩.৫% বাড়বে।

 

উন্নতদেশে জনপ্রতি জাতীয় বৃদ্ধির আনুপাতিক হারে বছরওয়ারী কেবল জাতীয় বেতন স্কেলের বেতনই বৃদ্ধি পায় না, বয়স্কভাতা, মাতৃভাতা দারিদ্রভাতা, বেকারভাতা সবই বছরওয়ারী বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে বছরওয়ারী জনপ্রতি আয় বৃদ্ধির আনুপাতিক প্রবৃদ্ধিভাতা নীতি না থাকায় ৫ বছরে ক্রমে আরও ১.০% প্রবৃদ্ধি হ্রাস পায়।

 

জুন, ২০১৫-তে জনপ্রতি জিডিপি টাঃ৯৬,০০৪/ এর ভিত্তিতে জুলাই, ২০১৫-তে ৮ম জাতীয় বেতন স্কেলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল-বেতন টাঃ৭৮,০০০/-ও টাঃ৮,২৫০/-টা করা হয়। জুন, ২০২০-তে টাঃ১,৭৫,০০০/-হওয়ায় জনপ্রতি জিডিপি-আয় বেড়েছে ৮২.৩%।

 

১.৫% প্রবৃদ্ধিহার ইনক্রিমেন্টনীতি হওয়ায় (যা সমীচীন নয়) ৮৫% কর্মজীবির ৫ বছরে মূল-বেতন ১০% বেশী বেড়েছে। তাই জাতীয় আয়ের নিরিখে নবীন-প্রবীনদের মূল-বেতন প্রায় ৮২.৩% থেকে ৭২.৩% হ্রাস পেয়েছে। এতে সরকারী সংস্থাসমূহে কর্মশীলতা কমেছে এবং দূর্ণীতি বেড়েছে।

 

উপজেলা-জেলাশহরের ভিত্তিতে ৮ম জাতীয় বেতন সর্বনিন্ম স্কেলের (২০নং) শুরুর বেভন প্রায় ২৫-৩০% বেশী রয়েছে। আবাসনভাতাও আরও ১০-৫% বেশী। এটা জাতীয় মুজুরী-স্কেল বাড়ানোকে প্রভাবিত করে। জানুয়ারী, ২০২১-এ সর্বনিন্ম স্কেলের (২০নং) প্রাম্ভিক মূল-বেভন ১৩,০০০/-হলে মূল-বেতন ৫৭.৬% বাড়বে। বাস্তবমুখীও হবে।

 

৫০.০% কম বেতনেও গতবছর বন্যা-করোনাকালে সরকারী সংস্থাসমূহ দায়িত্বশীল ও সরকার-জনতার আস্থার স্থলে ছিল। সবপর্যায়েই মূল-বেতন ন্যুনত ৪০% বাড়বে জন্যে “অন্তর্বর্তীকালীন” জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ণে সংকট হবে না। জানুয়ারী, ২০২১-এ থেকে মূল-বেভন বাস্তবায়ণে ২০২০/২১ অর্থবছরে বেতন ও অনুদানখাতে মাত্র ১৫% ব্যয় বাড়বে।

 

 

মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধু-সরকারের চালুকৃত ১ম জাতীয় বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন বেতন অনুপাত ১৫.৪ঃ১ ভিত্তিক ১০০গুণ বাড়িয়ে জানুয়ারী, ২০২১-এ “অন্তর্বর্তীকলীণ” জাতীয় বেতন স্কেল” চালু করা হলে প্রবৃদ্ধির হার এ অর্থবছরে আরও ২.২৫% বাড়বে। নিবিড় সমীক্ষা করে জাতীয় মুজুরী-স্কেল ও জাতীয় বেতন-স্কেলকে সামঞ্জস করতে হবে।

 

জুলাই, ২০২১-এ থেকে অন্যান্য ভাতাসমূহ প্রাপ্য হবে। বছরওয়ারী জানুয়ারী, ২০২১-এ জনপ্রতি জাতীয় বৃদ্ধির আনুপাতিক কেবল মূল-বেতনের প্রবৃদ্ধিভাতা দেওয়ার নীতি চালু থাকলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি গড়হার ২.৫% বাড়তি হবে এবং শুরূতে বেশী হবে। এই সাথে কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ হলে আরও ১.৩% বাড়বে।

 

প্রকৃতির চক্রে গত বছরের মতো ২০২১ সালেও বড় বন্যার হবে। বন্যা ও করোনাকালে মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধু-সরকারের আদলে “অন্তর্বর্তীকলীণ” জাতীয় বেতন স্কেল” চালু এবং রংপর ও ময়মনসিংহ বিভাগ মাধ্যমে জাতির ব্যয়-উৎপাদন চক্রের গতিশীলতার জন্যে আর কোন উত্তম পথ নেই।

 

প্রযুক্তি আধুনিকরণ, রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ, নির্মাণ সরকারের সমকালীণ কর্ম-দায়িত্ব। এজন্যে সুবিধা বাড়লেও প্রবৃদ্ধি কিঞ্চিত বাড়ে। তবে রংপর ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং “অন্তর্বর্তীকলীণ” সুষমমুখী জাতীয় বেতন স্কেল” চালু হলে প্রবৃদ্ধির গড়হার ৩.৮% (=১.৩+২.৫) বাড়বে। আরও উন্নয়ণখাতে ব্যয় বাড়ানো যাবে।

============================================================

*মোহাম্মদ আহ্সানুল করিম- রাষ্ট্র-বিশেষজ্ঞ, মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক বিসিএস কর্মকর্তা। ১৯৮২ থেকে “উচ্চতর সমৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ” গঠনের উদ্যোক্তা এবং প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা (১৯৮৫), প্রগতিশীল গণতন্ত্র(১৯৯১), ও সংবিধান সংশোধনের দিকগুলো (২০১০) নিবন্ধ/বইযের লেখক।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.