উত্তম কুমারের বার্লিন সফর

আমার প্রথম ইউরোপের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা যেন প্রথম প্রেমের রোমাঞ্চ।কাজের চাপে শেষ পর্যন্ত বার্লিন যেতে পারব কিনা বুঝতে পারিনি।তারপর সত্যিই একদিন প্লেনে চড়ে বসলাম।অদৃষ্টে বিদেশ যাত্রা থাকলে ঠেকায় কে?রওনা হলাম বার্লিন।বার্লিনে ছিল আসল কাজ,অকাজে ঘুরে এলাম আরও কয়েকটি শহর।এখানে আমার দিনগুলো সব বিলিয়ে দিই শুটিংয়ের জন্য।প্রোডাকশন ম্যানেজারদের নোটবুকে সব তোলা থাকে।পনেরোটা দিনের ওপর ছিল আমার অবাধ স্বাধীনতা।স্বেচ্ছাচারীর মতো খরচ করেছি।ছটা দিন কাটিয়েছি বার্লিনে।তারপর অন্য নগরে,লন্ডন,প্যারিস,জূরিখ,রোমে।আর প্রতি শহরেই মনের মধ্যে গুনগুনিয়ে উঠেছে,’এলেম নতুন দেশে’।বার্লিনের প্রেমে পড়েছি প্রথম দর্শনেই।সাধুভাষায় বলতে পারি, তারা মৈত্রী, ইংরেজিতে ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’।এমন সুন্দর সাজানো শহর ইউরোপে আর কোথাও দেখিনি।।যেন শিল্পীর হাতে আঁকা ছবি।হিল্টন হোটেলে ছিলাম।ভারতে যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাৎ জাগ্রত বার্লিনবাসী।তাছাড়া রাত্রির আয়ুও সেখানে কম,হোটেলে ফিরে আসতে না আসতেই নিশিভোর।প্রায় জিতনিদ্র হয়েই কাটাতে হয়েছে কটি দিন।তবু অসুস্থ বোধ করিনি।না দেহে, না মনে।প্রথম বিদেশে ভ্রমণের উচ্ছ্বাস সব অভাব পুষিয়ে দিয়েছিল।চক্ষে আমার তৃষ্ণা নিয়ে সারা বার্লিন শহরটা ঘুরে বেড়িয়েছিলাম।
শহরের চেয়েও ভালো লেগেছে শহরের মানুষদের।ওরা শহরবাসী, কিন্তু শহুরে নয়।আমাদেরই মতো সরল অনাড়ম্বর তাদের জীবন।পরকে আপন করে নিতে পারে এক মুহুর্তে।খুব ‘ইনফরম্যাল’।বাঙালি চরিত্রের সাথে কোথায় যেন একটা মিল আছে ওদের।আমার বন্ধুভাগ্য ভালো জানতাম।কিন্তু বার্লিনে এত অল্প সময়ের মধ্যেই বন্ধু জুটে যাবে ভাবিনি।জানিনা শ্রীমতী হেয়নার সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে, আদৌ হবে কিনা তাও বলতে পারছি না।জার্মান মেয়ে।তাঁর নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে কেমন ফাঁপড়ে পড়লাম।তিনি নিজেই তাঁর নামটা একটু ছেঁটে দিলেন।বললেন,’আমাকে হেয়না বলেই ডাকবেন।’বয়স বেশি নয়।বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ‘পাবলিসিটি’ বিভাগে তার চাকরি।উৎসবের ছবির ‘রাইট আপ’ ও নানা প্রবন্ধে লেখাই তাঁর প্রধান কাজ।বন্ধুত্ব হয়ে গেল শ্রীমতী হেয়নার সঙ্গে।তাঁর বাড়িতেও একবার গিয়েছিলাম।বেশ গোছানো সংসার।আমাদের মধ্যবিত্ত ঘরের মতো।ওর অশেষ কৌতূহল আমাদের দেশ সম্পর্কে।আমাদের জীবনযাত্রার সব কথাই তিনি জানতে চান।এই অনুসন্ধিৎসু মন দেখেছি আরো অনেকের মধ্যে।আমাদের সমাজ, রাজনীতি এবং ফিল্ম সম্বন্ধে জানার আগ্রহ ও ওদের খুব বেশি।এমনকি সেই বৃদ্ধাও বাদ জাননি।যিনি ফেস্টিভ্যালের টিকিট দিতেন।টিকিট দেওয়ার সঙ্গে যেন একটু স্নেহও তিনি ঢেলে দিতেন।আমার সঙ্গে তাঁর বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল।একটু-আধটু গল্প হত।জিজ্ঞেস করতেন, আমার দেশের বাড়ির কথা এবং আরো কতকিছু।
সত্যি বলতে কী,উৎসবের ছবি দেখা আর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেয়ে আমার নতুন বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে বেশি ভালো লাগত।যদিও ছবি না দেখে উপায় ছিল না এবং প্রেস কনফারেন্স ও পার্টিতেও যেতে হত।ছবি যে খুব বেশি দেখেছি তা নয়।তবে ইউরোপীয় সিনেমার হাল আমলের এক্সপেরিমেন্ট সম্পর্কে কিছুটা আইডিয়া নিয়ে ফিরেছি।রোমান পোলনস্কি-র’কুল দ্যা সাক’ দেখলাম।ব্রাজিল, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশের ছবিও কিছু দেখেছি।হলপ করে বলতে পারি, আবেগ বা গল্পের সঙ্গে আধুনিক সিনেমার ভাসুর ভাদ্দর বউর সম্পর্ক টিকবে না।’ডি ড্রামাটাইজেশন’ কথাটি আজকাল বেশ শুনতে পাই।বিষয়টা কী ভালো করে দেখে এলাম।বুঝলাম, আসলে এটি সিনেমার ক্ষয়রোগ।এর হাত থেকে উদ্ধার না পেলে চলচ্চিত্র বাঁচবে না‌।কয়েকটি ছবি তো বেশ মন দিয়ে দেখলাম।কই মন তো ভরলো না।ওখানকার বেশিরভাগ দর্শকও কি তৃপ্তি পেয়েছিলেন?নিশ্চই নয়।ওরা যদি সত্যিই খুশী হতেন তবে পুরস্কার দেওয়ার সময় অত চেঁচামেচি হলো কেন?যখন ‘কুল দ্যা সাক’,’মাসকুল্যাঁ’প্রভৃতি ছবির নাম ঘোষণা করা হল,তখন দর্শকদের কী বিরক্তি! রাগে যেন সকলেই ফেটে পড়লেন।’কুল দ্যা সাক’ ছবির গোল্ডেন বেয়ার পাওয়ার ব্যাপারটা অনেকেরই মনঃপুত হয়নি।বেশ বুঝতে পারলাম, একঘেয়ে পাপাচার আর যৌনবিকৃতির মাঝখানে ‘নায়ক’ বেশ একটা নতুন আস্বাদ, সজীবতা এনে দিয়েছিল।তাই বুঝি, পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান মঞ্চে এসে দাঁড়াবার পর মানিকদা(সত্যজিৎ রায়) এমন স্বতঃস্ফূর্ত অভিনন্দন পেলেন।
আত্মপ্রচার দোষের জানি।তবু একটি ঘটনা না বলে পারছি না,যা আমার মনে বেশ দাগ কেটেছিল।জু পালাস্ট থেকে বেরোবার পর রোজই অটোগ্রাফ শিকারীরা ঘিরে ফেলতেন।আমাকে দেখে চেঁচিয়ে বলে উঠতেন-‘দার হেলড’ অর্থাৎ ‘দি হিরো’।সই দিতাম অকাতরে।একবার একটি ছেলে দৌড়ে ছুটে এল আমার কাছে।’অটোগ্রাফ’ চাই।তার চোখ-মুখের ভাব দেখে মনে হল,আমার একটি স্বাক্ষর না হলে আর তার চলছে না।সই পাবার পর এমন সুন্দরভাবে হাসল যে আমি অপলক নেত্রে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।মুখটি আজও মনে পড়ে।তার চেয়েও স্মরণীয় এক বৃদ্ধা।আমার অটোগ্রাফ চাইলেন।আমি একটু অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালাম।উনি বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন আমি কী বলতে চাই।বললেন,’এই প্রথম ভারতের ছবি দেখলাম এবং এই প্রথম ফিল্ম স্টারের অটোগ্রাফ চাইলাম।’ অভিভূত হয়েছিলাম, বলা নিষ্প্রয়োজন।কয়েক সেকেন্ড কোনও কথা বলতে পারিনি।তারপর ধন্যবাদ জানালাম বৃদ্ধাকে।
বার্লিন সফরের অনেক মুহুর্তই অবিস্মরণীয়।নানা রঙের সব ঘটনা।নানা কারণে মনে গেঁথে আছে।চ্যাপলিনের কন্যা অভিনেত্রী জেরালিন্ড চ্যাপলিনের সঙ্গে পরিচয় হল।সেটাও ভোলবার নয়।খুব পরিস্কার ইংরেজিতে কথা বলেন এবং ধীরে ধীরে।বললাম,’আমি তোমার বাবার একজন ‘ফ্যান’।লন্ডনে যাচ্ছি,গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা হবে তো?”বাবাকে তো এখন লন্ডনে পাবে না।তিনি এখন অনেক জায়গা ঘুরে বেড়াচ্ছেন।,’জানালেন শ্রীমতী চ্যাপলিন।আমাদের ফিল্ম সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে চাইলেন,আমার কথা জানবার আগ্রহও তাঁর কম ছিল না।আমার শিল্পীজীবনের একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় তাঁকে দিলাম।সবশেষে তাঁকে আমন্ত্রণ জানালাম ভারতবর্ষে একবার ঘুরে যেতে।’খুব ইচ্ছা আছে।দেখি কবে যেতে পারি।’চটপট জবাব দিলেন শ্রীমতী জেরালিন্ড।আর একজন অভিনেত্রীর সঙ্গেও আলাপ হলো।ইনি ‘জর্জি গার্ল’ ছবির নায়িকা শ্রীমতী লিন রেডগ্রেভ।ওঁর স্বভাবটা যেন চ্যাপলিন তনয়ার ঠিক উল্টো।আর ওঁর চেহারা চলনবলন ঠিক বাঙালি মেয়ের মতো।তাও আবার খুব স্মার্ট বাঙালি মেয়ে নয়‌।শান্ত, নম্র পল্লীবালা যেমন।তবে একটা ব্যাতিক্রমও দেখলাম।শ্রীমতী লিনের সাজবার শখ খুব বেশি।খুব সেজেগুজে থাকেন।সাজলে তাঁকে বেশ দেখায়।খুব কম কথা বলেন।আমি যত বলেছি,তিনি তত শুনেছেন।উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ছাড়া কিছু বলেননি।
জাঁ-লুক গদারে২-র ‘ম্যসকুল্যাঁ ফেমিনা’-র শিল্পী জাঁ পিয়ের লো’র সঙ্গে কথা হয়নি।নানা জনের ভিড়ে অল্প সময়ের জন্য সে সুযোগ হলো না।ইনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন।ছোটবেলা থেকেই অভিনয় করছেন।ক্রুফো৩-র ‘ফোর হানড্রেড ব্লোজ’ছবির সেই সুন্দর ছেলেটিই জাঁ পিয়ের লো।এখন তরুণ।বার্লিনে বিখ্যাত অবিখ্যাত বহু ব্যক্তির সান্নিধ্যে এসেছি।ইতালির বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক পাসোলিনিকে বেশ লাগল।ইনি ছিলেন বিচারক মন্ডলীর একজন সদস্য।খাবারের টেবিলেই প্রথম পরিচয়।নিরামিশাষী,মদ্যপানও করেন না।কে যেন বললেন কমিউনিস্ট ভাবধারার লোক।তাই ড্রিঙ্ক করেন না।বলেন,’দশ দিনেই আমার ‘সিনারিয়ো’ লেখা হয়ে যায়।’বেশ অবাক হলাম।তারপর শুনলাম ওঁদের দেশের সিনেমার কথা।আমাদের ছায়াছবি সম্পর্কেও একটু আধটু বললাম।এই ধরনের ব্যক্তিগত কথাবার্তায় বেশ স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেছি।খুব সচেতন থাকতে হত সাংবাদিক সন্মেলনে।’আপনি কি সৌমিত্র চ্যাটার্জির ভাই?’, হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন এক মহিলা সাংবাদিক! মনে মনে বললাম ,’ভাই তো ঠিকই, তবে তুমি যা ভাবছ তা নয়।’ মুখে জবাব দিলাম,’না’।পদবীর মিলটা দেখেই(নায়ক-এর প্রচার পুস্তিকায় আমার নামের সঙ্গে পদবীটাও ছিল।)একথা তাঁর মনে হয়েছিল হয়তো।তাছাড়া আমার কোনও ছবি ওঁদের দেখার কোন সুযোগ হয়নি এর আগে।
বার্লিন ছাড়ার পর বেশ নিশ্চিন্তে দেশ ভ্রমণে মেতে পড়লাম।বার্লিন উৎসবে আমি আমন্ত্রিত হয়ে গেছিলাম।সেখানে লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা, দেখা-সাক্ষাতের একটা দায় ছিল।অন্য জায়গায় তো আর এসবের বালাই ছিল না।তাই আমাকে পায় কে।লন্ডনে অবশ্য এক টেলিভিশন কোম্পানি আমার আগমন সংবাদ পেয়েছিল।আমার লক্ষ্য ছিল সকলের অলক্ষ্যে নগরদর্শন।শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে পেরেছিলাম।টেলিভিশনে আমাকে আর কেউ দেখতে পায়নি।প্যারিসের পথে আর আত্মগোপন করতে পারলাম না।দুজন বাঙালি যুবক হঠাৎ দেখতে পেয়ে কাছে এলেন।’আপনি এখানে?’বললাম,’বার্লিন ফেরত’।বার্লিন উৎসবের খবর তারা রাখতেন।দেশের খবর রাখতে চাইলেন।যথাসম্ভব বললাম।প্যারিসের নাইট ক্লাবেও গিয়েছিলাম।সবকিছু নিয়ে ‘মিথ’ তৈরি করা আমাদের স্বভাব।কত কিছু শুনেছি প্যারিসের নাইট ক্লাব সম্পর্কে।তেমন ভয়ানক কিছু কিন্তু দেখলাম না।একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, ওরা প্রমোদে মন ভরিয়ে দিতে জানেন।তবু ওদের প্রাণ কাঁদে কিনা জানবার অবকাশ পেলাম না।প্যারিস থেকে জুরিখ ও ফ্রাঙ্কফুর্ট হয়ে রোমে এসে পৌঁছাবার এবং ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য সবকিছু দেখর পর আমার মনও কখন অজান্তে অস্থির হয়ে পড়েছিল টের পাইনি।তেহরান হয়ে করাচিতে যখন পৌঁছালাম তখন প্রতি পল যেন শত যুগ মনে হতে লাগল।আগেও বুঝেছি, এবার বিদেশ ঘুরে এসে যেন সমস্ত অন্তর দিয়ে অনুভব করলাম, কলকাতার চেয়ে কাউকে বেশি ভালোবাসিনি।
শুদ্ধস্বর/আইপি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.