আজ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু সাংবাদিক সাইমন ড্রিংয়ের জন্মদিন

একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন বন্ধু, আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিজয়ী ব্রিটিশ সাংবাদিক, টেলিভিশন উপস্থাপক, প্রতিবেদন নির্মাতা সাইমন ড্রিং। তিনি ডেইলি টেলিগ্রাফ এবং বিবিসি টেলিভিশন নিউজের বৈদেশিক সংবাদদাতা হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দীর্ঘসময় কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার বিবরণ লন্ডনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় নিয়মিত তুলে ধরে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের গণহত্যার ওপর প্রতিবেদন করে তিনি খ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেন। সাইমন ড্রিং ১৯৪৫ সালের এই দিনে ইংল্যান্ডের ছোট্ট শহর নরফোকের ফাকেনহ্যামে জš§গ্রহণ করেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি প্রথম চাকুরীতে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে তিনি বহির্বিশ্ব ভ্রমণের অংশ হিসেবে ভারত ভ্রমণ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি ২২টি যুদ্ধ ও অভ্যুত্থান কাভার করেছেন। ১৯৭১-এ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তানি সামরিক সরকার ৪০ জন বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকা আসার অনুমতি দেয়। টেলিগ্রাফ পত্রিকার সাংবাদিক সায়মন ড্রিং মার্চের ৬ তারিখে তখন আসেন।পরদিন ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বাঙালীর নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের সময় তিনিও উপস্থিত হন। ২৫ মার্চ যুদ্ধ শুরু হলে আগত ৪০ সাংবাদিকের অনেকেই দেশত্যাগ করেন। সে সময় তিনি হোটেলের কর্মচারীদের সহায়তায় লুকিয়ে থাকেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে।
এ সময় পাকিস্তানি বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে তিনি অপারেশন সার্চলাইটের ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার অসংখ্য ছবি তোলেন। ২৭ মার্চ ব্রিটিশ হাইকমিশনের সহায়তায় ব্যাংককে পালিয়ে গিয়ে সেসব গণহত্যার ছবি দিয়ে প্রকাশ করেন ‘ট্যাংকস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’, যা সে সময় বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে।১৯৭১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাকে জোরপূর্বক দেশ থেকে বের করে দেয় । ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে তিনি পুনরায় ১৯৭১ সালের নভেম্বরে কলকাতায় আসেন । সেখান থেকে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় খবরাখবর নিরপেক্ষভাবে ঐ দৈনিকে প্রেরণ করেন। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনে যৌথবাহিনীর সঙ্গে তিনি ঢাকায় আসেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার পর তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে সায়মন ড্রিং অন্যতম। তিনি ১৯৯৭ সালে টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে লন্ডনে ফিরে তিনি আফ্রিকা মহাদেশের দুর্ভিক্ষ পীড়িত অঞ্চলের জনগণকে সহায়তার জন্য স্পোর্ট এইড নামীয় দাতব্য তহবিলের ধারণা তুলে ধরেন। এই তহবিলে ৩৭ মিলিয়ন ডলার জমা হয়। একই সালে `দ্য রেস এসেইন্ট টাইম’ শিরোনামে আরেকটি দাতব্য তহবিল গড়েন ।১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাদের নির্যাতনের ওপর প্রতিবেদন তৈরী করে অর্জন করেন ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্টার অব দ্য ইয়ার, ইরিত্রিয়া যুদ্ধের ওপর ভ্যালিয়ান্ট ফর ট্রুথ, কুর্দিদের বিরুদ্ধে তুরস্কের যুদ্ধের প্রতিবেদনের জন্য সনি এবং হাইতিতে আমেরিকান আগ্রাসনের ওপর প্রতিবেদন তৈরী করে নিউইয়র্ক ফেস্টিভ্যাল গ্রান্ড প্রাইজ পুরস্কার অর্জন করেন । বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে অবস্থান করছেন।
কাজী সালমা সুলতানা , লেখক এবং গণমাধ্যম কর্মী ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.