অ্যাডভেঞ্চার গল্প বা সিনেমায় আমরা অনেক দুঃসাহসী অভিযানের কথা শুনি তবে বাস্তব জীবনেও এমন অনেক ঘটনা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে যা গল্পকে হার মানায়। ইয়ান সিগুর বলস্রু (Jan Sigurd Baalsrud) ছিলেন নরওয়ে আর্মির একজন কমান্ডো। জন্ম ১৯১৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ আর্মিতে প্রশিক্ষণ নেন এবং নিজ দেশের হয়ে জার্মানির ইটলার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত আর্মিতে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধের আগে তিনি ছিলেন মূলত মানচিত্র অঙ্কনের যন্ত্র তৈরির কারিগর (cartographical instrument-maker), পড়াশুনা ও করেছেন এই বিষয়ে। পরবর্তীতে দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধে যোগ দেন এবং দায়িত্ব পালনে অসম সাহসীকতার পরিচয় রাখেন। ১৯৪৩ সালের মার্চ মাসে প্রতিপক্ষ নাজি বাহিনীর বিমান ঘাঁটিতে এক দুঃসাহসীক হামলার পরিকল্পনা করা হয়। মিশন ছিলো বিমান ঘাঁটির কন্ট্রোল টাওয়ার ধ্বংস করা। এই উদ্দেশ্যে ৩ জন সহযোদ্ধা কমান্ডো ও ৮ জন নাবিক নিয়ে একটি বোটে করে রওনা দেন। সাথে ছিলো ১০০ কেজি বিস্কোরক যা দিয়ে টাওয়ার ধ্বংস করা হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাদের এই গোপন অভিযানের কথা ফাঁস হয়ে যায়। জার্মান বাহিনী ইয়ানের বোট আক্রমণ করে ডুবিয়ে দেয়। তীরে সাঁতার কেটে পৌঁছানো বোটের ১১ সঙ্গীকে জার্মান বাহিনী গুলি করে হত্যা করে কিন্তু ইয়ান পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পালিয়ে গেলেও বরফের রাজ্যে ভেজা শরীর নিয়ে প্রতিকূল আবহাওয়াতে টিকে থাকা, আবার শত্রু পক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানো একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়ায়। এদিকে জার্মান বাহিনীর কমান্ডারও তাঁর এই পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন এবং পুরো শক্তি কাজে লাগান ইয়ানকে ধরার জন্য। ইতিমধ্যে ঠান্ডায় ফ্রসবাইটের আক্রমণে ইয়ানের পায়ের দুইটি আঙ্গুল কেঁটে ফেলতে হয়। তিনি নিজেই এই কাজটি করেন। ঠান্ডা জনিত কারণে চোখেও কম দেখতে থাকেন। এ সময়ে নরওয়ের গ্রামবাসীরা তাঁকে সহযোগিতা করেন পালাতে। একটা সময় চলার শক্তি হারান, তাঁকে স্ট্রেচারে করে বহন করা হয়। খারাপ আবহাওয়া ও জার্মান সৈনদের পেট্রোলের কারণে বরফের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে হয় ২৭ দিন, এ সময়ে দিনের পর দিনের খাবারের কষ্ট করেন। দীর্ঘ ৯ সপ্তাহ প্রশিক্ষণ ও জীবনীশক্তির সবটুকু কাজে লাগিয়ে অবশেষে সুইডেনে নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হোন। পারি দিতে হয় মাইলের পর মাইল বরফে ঢাকা পাহাড়ি দুর্গম পথ। তাঁর টিকে থাকার এই সংগ্রাম জার্মান বাহিনীকে মানসিকভাবে পরাস্ত করে আর নরওয়ে আর্মিকে দেয় যুদ্ধে জেতার মনোবল। তাঁর সাহসীকতার এখানেই শেষ নয়, সুস্থ হয়ে আবারো তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত বাহিনীতে থেকে দেশের সেবা করেন। নরওয়ে ও ব্রিটিশ সরকার তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ দুইটি খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৮৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৭১ বছর বয়সে এই বীর যোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেন। ইয়ানের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রতিবছর ২৫ জুলাই তাঁর পালিয়ে আসা পথ ধরে ৯ দিনের একটি অভিযাত্রা আয়োজন করা হয়। Ni Liv ও Den 12 mann নামে দুইটি সিনেমা ও তৈরি হয়েছে এই ঘটনা নিয়ে। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি ।
রাকিবুল ইসলাম / প্যারিস থেকে ।

