বিভ্রান্তির বেড়াজালে গণবাহিনী গবেষণা-
অপু সারোয়ার
১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন বিএলএফ- মুজিব বাহিনী একাত্তর কেন্দ্রিক স্বল্পস্থায়ী উদ্যোগ ছিল।
যুদ্ধকালীন বিএলএফ এর সমাপ্তি ১৯৭২ সালে বিএলএফ এর অস্ত্র সমর্পনের মধ্যদিয়ে। যুদ্ধকালীন
বিএলএফ এর চূড়ান্ত বিভাজন ও ভবিষৎ রাজনৈতিক ঐক্যের সম্ভবনার সমাপ্তি ঘটে ২১ জুলাই ১৯৭২
সালের ছাত্রলীগের দুইটি পৃথক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। ভাঙ্গনের পর কোন পক্ষই নিজেদেরকে মুজিব বাহিনী
বা বিএলএফ হিসেবে পরিচিত করতে উদ্দ্যোগী হয়নি। রাজনৈতিক বিতর্কে ছাত্রলীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে
পড়ে। সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশ ছাত্রলীগ ( বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র) অংশের সাথে যুক্ত হয়। এই অংশের সাথে
যুক্ত বিদায়ী কমিটির নেতারা রাজনৈতিক দল জাসদ গঠন করে। ১৯৭২ সালের জাসদ ছিল ছাত্র বুদ্ধিজীবী ও
মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিক শক্তি। ছাত্রলীগের অপর অংশ মুজিববাদী ছাত্রলীগ নামে পরিচিতি লাভ করে।
শেখ মুজিবর রহমান ও আওয়ামীলীগ রাজনীতির সমর্থক ছিল।
আলতাফ পারভেজ যুদ্ধত্তোর কালে যুদ্ধ দিনের বিএলএফ -মুজিব বাহিনীর প্রধান সারির নেতাদের জাসদ
গঠন ও আওয়ামীলীগ বলয়ের বিভক্তি পর্বকে মুজিব বাহিনীর দ্বিতীয় পর্যায়ের যাত্রা হিসেবে বর্ণনা
করেছেন – পৃষ্টা ৩০। আপাতঃ ভাবে নখদন্তহীন আটপৌড়ে মন্তব্য মনে হলেও এই অভিব্যাক্তি কোন ভাবেই
সঠিক নয়। দুই পৃথক রাজনৈতিক ধারাকে সঠিক ভাবে চিহ্নিত না করার অপারগতা কিংবা ইচ্ছাপ্রণোদিত
অন্ধত্বকে আলতাফ পারভেজের বিভ্রান্তির সূচনা বিন্দু বলা চলে।
জাসদ যুদ্ধ দিনের বিএলএফ ঐতিহ্যকে ধারণ করলেও রাজনীতির ধারা বিবরণীতে প্রাধান্য পেয়েছে ১৯৬৩
থেকে ১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ ও বিএলএফ। আজকের বাংলাদেশ অঞ্চল নিয়ে একটি
স্বাধীন দেশ গঠনের রাজনৈতিক চিন্তা প্ৰাধান্য পেয়েছিল স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ এর চিন্তা ও
কর্মে। বাংলাদেশের পতাকা , জাতীয় সংগীত, বঙ্গবন্ধু উপাধি, শেখ মুজিবর রহমানের ৭ মার্চ ১৯৭১ সালের
ভাষণ ও তৎকালীন সমসাময়িক রাজনীতির ধারা বিবরণীতে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ, বিএলএফ সহ
অনেকের নাম আসা অতি স্বাভাবিক।
যুদ্ধ কালীন বিএলএফ ছিল তৎকালীন ছাত্রলীগ এর মধ্যে স্বাধীনতা ও স্বায়ত্ব শাসন পন্থীদের
রাজনৈতিক ঐক্য। জাতিগত নিপীড়ন বিরোধী লড়াইয়ে ঐক্য বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পরে ভেঙে যায়
রাজনৈতিক বিতর্কে। এই দুই ধারার ঐক্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিল। তবে
রাজনৈতিক পার্থক্য গুলো স্পষ্ট ভাবে চিহ্নিত না করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় পরিণতিতে স্বাধীন দেশের
রাষ্ট্র পরিচালনার বিতর্কে এই দুই ধারা পৃথক অবস্থান নেয়। স্বাধীন দেশে যুদ্ধ কালীন বিএলএফ এর বড়
অংশ- স্বাধীনতাপন্থী ' জাতীয় সরকার ' ও সমতা ভিত্তিক সমাজের পক্ষে দাঁড়ায়। এই ধারার উদ্যোগে
জাসদ গঠিত হয়েছিল। স্বায়ত্বশাসন পন্থীরা আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে থেকে যান। আওয়ামীলীগ
রাজনীতির অভ্যান্তরিন দ্বন্দ্বে এই ধারার নানা সংযোজন – বিয়োজন ঘটে।
আলতাফ পারভেজ বি এল এফ -মুজিব বাহিনীর যুদ্ধ কালীন ও যুদ্ধত্তোর অধ্যায়কে একাকার করে দেখিয়ে
তত্ব নির্মাণ করছেন। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারী শেখ মুজিবর রহমানের সাথে শেখ ফজলুল হক মনির
আলোচনাকে মুজিব বাহিনীর সর্বোচ্চ ব্যাক্তি এর সাথে আলোচনা হিসেবে উপস্থাপন করছেন – পৃষ্ঠা
৪০২। শেখ ফজলুল হক মনি রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব ও লেখক ছিলেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত স্বাধীন
দেশের পত্র পত্রিকাতে কেউ শেখ ফজলুল হক মনিকে মুজিব বাহিনীর প্রধান হিসেবে উল্ল্যেখ করেননি। সেই
সময় শেখ ফজলুল হক মনি যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন। নতুন রাজনৈতিক পরিচয়েই যে কারো পরিচয় গড়ে
উঠা স্বাভাবিক । শুধু মাত্র ব্যাতিক্রম গবেষক আলতাফ পারভেজ এর কলম ও দৃষ্টি ।
১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি গুলি বহুধা বিভক্ত হয়েছে। এই বিভক্তির কারণ
যাই হোক, ভাঙ্গনের ফলে সৃষ্ট নতুন দলীয় পরিচয়কে পুরানো সংগঠনের অংশ হিসেবে ভাবা বা বর্ণনার
প্রয়াস চিন্তার স্থবিরতা মাত্র। এক সময় সিরাজ সিকদার, টিপু বিশ্বাস উভয়ই ছাত্র ইউনিয়ন করতেন এই
ছাত্র সংগঠনের পক্ষ হয়ে বুয়েট হল সংসদ ও এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন।
এই সময়ে এই দুই জন পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টি ( এম -এল ) এর সদস্য বা পার্টি পরিমণ্ডলে
ছিলেন। সিরাজ সিকদার যখন সর্বহারা পার্টি বা টিপু বিশ্বাসরা যখন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি গঠন
করলেন তখন এই দুই দলকে ছাত্র ইউনিয়ন কিংবা পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টি ( এম –এল ) হিসেবে
বর্ণনা করা প্রয়াস আলতাফ পারভেজ এর মধ্যে দেখা যায় নাই। কিন্তু যুদ্ধকালীন বিএলএফ এর ভাঙ্গন –
জাসদ , যুবলীগ, ছাত্রলীগকে যুদ্ধত্তোর কালে মুজিব বাহিনী হিসেবে দেখানোর প্রয়াস অভিনব ও
স্ববিরোধিতা।
গবেষক আলতাফ পারভেজ নিজের নির্মিত তত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নিজেই সন্দিহান । তার পরেও
বাজারে ছেড়েছেন এই বই। আলতাফ পারভেজ লিখছেন " এমন অনেক অপরিহার্য ব্যাক্তির মতামত ও
দলিলপত্রের পর্যালোচনা এখানে নেই – যা থাকলে ইতিহাসের এই পুনর্পাঠ বাড়তি গ্রহণযোগ্যতা পেত।" –
পৃষ্টা -৩৩। অপরিহার্য ব্যাক্তির মতামত ও দলিলপত্র' ছাড়াই নিজ বয়ানে ৪৫০ পাতা লিখে ফেলেছেন
লেখক ! প্রসঙ্গত এই বইটি ৬০০ পৃষ্টার। এর মধ্যে ১৫০ পৃষ্টা অন্য লেখকদের লেখা পরিশিষ্ট হিসেবে
জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অনেকটা অস্বাস্থকর উপায়ে 'গরু মোটা-তাজা করণের ' পথের মত বইয়ের কলেবর
বাড়িয়েছেন। অপরিহার্য এর অর্থ যা বাদ দেওয়া যায় না অথবা যা বাদ দিলে বিষয়টি অপূর্ণ থেকে যায়।
এই বই পাঠের সময় বইয়ের ৩৩ পাতায় বর্ণিত উপরের লাইন গুলো স্মরণে রাখলে পুনর্পাঠের উদ্দেশ্য
নিয়ে কিছু প্রশ্নের উঁকি দিতে পারে।
গণবাহিনী ' কেস স্টাডি ' : যে গল্পের ফাঁক – ফোঁকরের শেষ নেই। ….
আলতাফ পারভেজ নয়টি অঞ্চলের গণ বাহিনীর সাংগঠনিক বিষয় আলোচনার দাবী করছেন। এই আলোচনা
গুলো কোন তথ্য নিষ্ঠ নয়, পল্লবিত জনশ্রুতির উপর কিছু একটা লিখেছেন। নয় অঞ্চলের পৃথক পৃথক
সমালোচান করলে অনেকটা চর্বিত চর্বন হবে। পাঠকদের মনোযোগ ছেদ পড়ার সম্ভবনা থাকবে।
আলোচনার জন্য পাবনা -সিরাজগঞ্জ কে বেছে নিয়েছি। এই জেলায় ব্যাক্তিগত ভাবে রাজনৈতিক কাজের
সাথে যুক্ত ছিলাম। গবেষক যাদের সাথে সাক্ষাৎকার নিয়ে তত্ত্ব বিনির্মাণ করেছেন ও যাঁদের নামলেখায়
উল্ল্যেখ করেছেন তাঁদের প্রায় সকলকেই ব্যাক্তিগত ভাবে দেখা বা চেনার সুযোগ হয়েছিল। এই অঞ্চলের
রাজনীতির সাথে পরিচিত ও তথ্য যাচাইয়ের সহজ লভ্যতার জন্য পাবনা -সিরাজগঞ্জকে বেঁচে নেওয়া। এই
লেখায় জেলা বলতে তৎকালীন সময়ের ১৯টি জেলাকে বুঝানো হয়েছে। যেমন পাবনা জেলা পাবনা ও
সিরাজগঞ্জ মহুকুমা।
জনাব আলতাফ পারভেজ গণবাহিনী কেস স্টাডি হিসেবে বাংলাদেশের মধ্য পশ্চিমাঞ্চল কে বেছে নিয়েছেন।
এই বইয়ের ৭ অধ্যায়ে – পৃষ্টা ৩৫৭ -৩৯৯ প্রায় চল্লিশ পাতা জুড়ে নয়টি অঞ্চলের গণবাহিনীর কার্যক্রমের
কেস স্টাডি দাঁড় করিয়েছেন।
দলে চলে যান। নায়িকা তখনও জেলে। নায়িকা কে ছাড়তে নায়ক দল বল নিয়ে একের পর একে আক্রমন করে
যাচ্ছে। নায়িকার মুক্তি ও অস্ত্র দিকেই নায়কের লক্ষ্য। কোটি টাকা হাতে পেয়েও নায়ক ও তার দল টাকা
হাতে নিচ্ছেন না। নিজাম ডাকাত থেকে নিজামউদ্দিন আউলিয়া হওয়ার পল্লবিত জনশ্রুতির ছায়া দেখা মেলে
এই গল্প কাহিনীতে । এই হচ্ছে কুষ্টিয়ার গণবাহিনীর কার্যক্রমের চিত্রনাট্য আলতাফ পারভেজের কলমে
।
আলতাফ পারভেজের চিত্র নাট্যের অংশ বিশেষ " মুন্টুর স্ত্রী আলেয়া ছিলেন তখন কুষ্টিয়া কারাগারে।
জীবিত অবস্থায় স্ত্রীকে কারাগার থেকে বের করে আনতে পাগল প্রায় হয়ে উঠেছিল মন্টু। এই কারণেই
গণবাহিনীর ব্যানারে প্রচুর অপারেশন হয়েছে। " – পৃষ্ঠা ৩৬৯ । – কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে মন্টু – লাল্টু –
আলেয়া প্রকৃত নাম। পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টি থেকে জাসদ রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন এই তিন
জন। আব্দুল হকের নেত্তৃধীন পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টি -যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে যশোর-খুলনা –
কুষ্টিয়াতে এই দলের সক্রিয়তা চোখে পড়ত। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এই দল বাংলাদেশকে ' পূর্ব পাকিস্থান '
হিসেবে মনে করতো।
আলেয়া মন্টুর স্ত্রী ছিলেন একথা সত্য। তবে তার চেয়ে বড় পরিচয় আলেয়া একজন নারী, একজন
রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। রাজনীতির কারণেই কারাগারে ছিলেন। আলেয়া – মন্টুদের রাজনীতি নিয়ে ন্যায্য
সমালোচনা থাকা স্বাভাবিক। তবে কোন রাজনৈতিক কর্মীকে, একজন নারীকে নিজ পরিচয়ে উপস্থাপন না
করে শুধু কারো স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপনের মধ্যে আলতাফ পারভেজ পুরুষতান্ত্রিক মনন প্রকাশ করছেন।
সীমাবদ্ধতা নিয়ে জাসদ একটি রাজনৈতিক শক্তি ছিল। কারো স্ত্রী কিংবা প্রেমিকের মুক্তির জন্য জাসদের
১৯৭২-১৯৭৫ এর রাজনীতি পরিচালিত হওয়ার নজির নেই। শুধু আলেয়ার মুক্তির জন্য যে গণবাহিনী অভিযান
পরিচালনা করছিল এমন সিদ্ধান্তে কি ভাবে আলতাফ পারভেজ আসলেন সে সম্পর্কে নীরবতার আশ্রয়
নিয়েছেন। গবেষক আলতাফ পারভেজ লিখছেন " গণবাহিনীর ব্যানারে প্রচুর অপারেশন হয়েছে।“এখানেও
নূন্যতম বিবরণ বা কি ধরনের ' অপারেশন ' হয়েছিল তার উল্লেখ নেই। আর এই অপারেশন এর সাথে
আলেয়াকে মুক্ত করার ' পাগল প্রায় ' পণ এর সম্পর্কই বা কি ছিল এই বিষয় গুলোকে পাশকাটিয়ে যাওয়া
হয়েছে আলতাফ পারভেজের গবেষণায়।
বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় গণবাহিনীর সক্রিয়তার অন্যতম কারণ আলতাফ পারভেজের লেখায় রয়েছে। তবে
এই কারণকে তিনি কারণ হিসাবে উপস্থাপন না করে একপাশে সরিয়ে রেখেছেন। আলতাফ পারভেজের
সংগৃহিত সাক্ষাৎকারে স্থানীয় গণবাহিনী সংগঠক বলেছেন নকশালদের হাতে ২০/৩০ জন জাসদ কর্মী খুন
হয় ১৯৭২-৭৫ এর মধ্যে। পৃষ্টা ৩৭০। ২০/৩০ জন কর্মী খুনের কারণেই জাসদ – গণবাহিনীর বেশি
সক্রিয়তা ছিল। এই সক্রিয়তা ছিল আত্মরক্ষার তাগিদে।
এই অঞ্চলে নকশাল বা ব্যাক্তি সন্ত্রাসের রাজনীতির বলতে লেখক আব্দুল হকের নেতৃত্বের
পূর্বপাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টি (এম -এল ) ও আব্দুল মতিন – টিপু বিশ্বাসদের পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট
পার্টি (এম -এল )। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত আব্দুল হকের দলের নাম ছিল
'পূর্ব পাকিস্থান ' কমিউনিস্ট পার্টি। আর টিপু বিশ্বাসদের দল পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির
স্বাধীনতা কালীন ভূমিকা পাকিস্থান সেনাবাহিনীর সাথে মিলে মিশে কাজ করার।
পাবনা স্থানীয় জাসদ সব সময়ই টিপু বিশ্বাসদের যুদ্ধকালীন ভূমিকার নিন্দা ও বিচার দাবি করে আসছে
১৯৭২ সালের শুরু থেকেই। পাবনার রাজনীতি নিয়ে আলতাফ পারভেজ পাবনার বাসিন্দা একজন
মুক্তিযোদ্ধা ও সিপিবি কেন্দ্রীয় নেতার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এই বইয়ে। মুক্তিযোদ্ধা ও সিপিবি নেতা
পাবনায় ' টিপু বিশ্বাসের নেতৃত্বাধীন নকশালদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান বাহিনীর যোগসাজশের
অভিযোগ করেন।‘- পৃষ্ঠা ৩৮১ । ১৯৭২-১৯৭৫ সালে কুষ্টিয়া সহ সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জাসদকে এক
দিকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন অন্যদিকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা বিরোধী 'কমিউনিস্ট ' আব্দুল হক ও টিপু
বিশ্বাসদের মোকাবেলা করে রাজনীতি করতে হয়েছে।
আলতাফ পারভেজ লিখেছেন " বস্তুতপক্ষে মতিয়ার রহমান মন্টু স্বাধীনতাত্তোর সময়ে আওয়ামীলীগের
ডাঃ হেবারই সহযোগী ছিলেন। কিন্তু চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত মনোমালিন্যের এক পর্যায়ে হেবার
প্রভাবে মন্টু গ্রেফতার হয়ে যান। – পৃষ্ঠা ৩৬৮। আলতাফ পারভেজ এই বই প্রকাশ করছেন ২০১৫ সালে।
১৯৭২- ২০১৫ সাল এর ব্যাবধান ৪৩ বছর। চার দশক পরে লেখক কিভাবে জানলেন যে মতিয়ার রহমান মন্টু
চোরাচালানের সাথে যুক্ত ছিলেন ? এই দাবীর সপক্ষে এই তথ্য সূত্রের উল্ল্যেখ নেই এই বইয়ে। মতিয়ার
রহমান মন্টু চোরাচালানের সাথে যুক্ত ছিলেন কিনা সে বিষয়ে আমার কাছে কোন তথ্য নেই। এই তথ্য
সংগ্রহ আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে একজন মৃত ব্যাক্তিকে উপযুক্ত সূত্র ছাড়া হেয় করার উদ্যোগ
নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যার দাবী রাখে।
পাবনা – সিরাজগঞ্জ গণবাহিনী : ভুল ও মিথ্যা প্রকাশের দ্বিধাহীন উদ্যোগ
সিরাজগঞ্জ গণবাহিনী
গবেষক আলতাফ পারভেজ সিরাজগঞ্জের গণবাহিনীর বর্ণনা সংগ্রহ করছে আবদুর রউফ পাতা ও অন্য
একজন তৎকালীন সময়ে ঢাকা কলেজে অধ্যায়নরত ছাত্রবুদ্ধিজীবীর কাছ থেকে। উপরোক্ত দুইজন জাসদ
রাজনীতিতে গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আব্দুর রউফ পাতা যুদ্ধপূর্ব কাল থেকেই অন্যতম
প্রধান সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন। যুদ্ধপূর্ব কেন্দ্রীয় বিএলএফ ডিজাইন কৃত বাংলাদেশের জাতীয়
পতাকা মার্চ ১৯৭১ এর প্রথমার্ধে সিরাজগঞ্জ উত্তোলন করেছিলেন। তিনি গণ বাহিনীর সাথে যুক্ত
ছিলেন না। ১৯৭৩ -১৯৭৮ পর্যন্ত তিনি রাজনৈতিক কারণে জেলে ছিলেন। আবদুর রউফ পাতার ১৯৭৩ সাল
থেকে জেলে থাকার বিষয়টি আলতাফ পারভেজ নিজ বইতে উল্ল্যেখ করছেন পৃষ্ঠা ৩৭৯। জেলে থাকার
কারণে গণ বাহিনীর গঠন, সম্ভবনা ও সংকট নিয়ে কাজ করার সুযোগ আব্দুর রউফ পাতার হয়নি। তাই
সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের গণবাহিনীর ইতিহাস লিখতে যাঁরা অন্তত ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত জেলের বাইরে ছিলেন
তাদের আলোচনার অনেক বেশি গ্রহণ যোগ্য হতে বাধ্য।
গবেষক আলতাফ পারভেজ লিখেছেন " বস্তুত মুক্তিযুদ্ধকালে সিরাজগঞ্জ যত মানুষ
মারা গেছে তার কয়েক গুন্ বেশি মানুষ খুন হয় স্বাধীনতা -উত্তর এক দুই বছরেই। – পৃষ্ঠা
৩৭৯ । " ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শেখ মুজিবর রহমানের শাসনামলে রাজনৈতিক হত্যা
সন্ত্রাস সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ সব কিছুই হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলে গবেষক কোন
পরিসংখান ও তথ্যের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে বলছেন ১৯৭১ সালের পাকিস্থান রাষ্ট্রের
গণহত্যার সম পরিমান বা কয়েক গুন্ রাজনৈতিক মানুষ খুন হয়েছেন ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫
পর্যন্ত। এই বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
সচরাচর বিভিন্ন ধাঁচের সাম্প্রদায়িক, বাংলাদেশের অভুদ্বয় বিরোধী শক্তি এই জাতীয়
দাবি করে থাকেন। গবেষক আলতাফ সিরাজগঞ্জের রাজনৈতিক হত্যার শিকার জাসদ
কর্মীদের একটা তালিকা দিয়েছেন- পৃষ্ঠা ৫১৬-৫১৭ । আলতাফ পারভেজের তালিকায় নাম
রয়েছে ২৬ জনের । এর মধ্যে ৫ জনের মৃত্যু ১৯৮৫ সনের পরে। আর ৬ জনের মৃত্যু ১৯৭২
সনের জুন মাসে ছাত্রলীগ বিভক্তির ও জাসদ গঠনের চার মাস আগে । মৃতদের মৃত্যু সাল
লেখকের ব্যবহৃত তালিকাটাকেই নেওয়া হয়েছে। আমি শুধু গবেষকের উপাত্তকে সহজ
বোধ্য করে সাজিয়েছি মাত্র । আলতাফ পারভেজের নিজ তথ্যানুযায়ী ১৯৭২-১৭৯৫ সালের
মধ্যে ১৩ জন জাসদ কর্মী খুন হয়েছে। এই সংখ্যা সামান্য কিছু বেশি হতে পারে তবে কোন
ভাবেই ত্রিশের উপর হবে না।
সিরাজগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে গণহত্যার শিকার মানুষের সঠিক পরিসংখান রাষ্ট্র
কিংবা কোন রাজনৈতিক শক্তি এই উদ্যোগ নেননি। এই ব্যার্থতার দ্বায়ভার পৃথক
আলোচনার দাবী রাখে। তবে রক্তে জেগে ওঠে – মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস :
সিরাজগঞ্জ – লেখক ইমতিয়ার শামীম গণহত্যার শিকারদের আংশিক তালিকা দিয়েছেন
এই বইয়ের পৃষ্টা ৪৪১-৪৭৯ পর্যন্ত। লেখক নিহতদের থানা -উপজেলা ভিত্তিক তালিকা,
নাম ঠিকানা, পিতার নাম গ্রাম সহ বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করেছেন। এই সংখ্যা ১৯৭২-৭৫
সালের মধ্যে রাজনৈতিক হানাহানির তুলনায় অনেক গুন্ বেশি । সাম্প্রতিক সময়ে
সিরাজগঞ্জ গণহত্যা তদন্ত কমিটি নামে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের গণহত্যার শিকারদের
তালিকা ও গণহত্যার স্থান গুলি চিহ্নিতের কাজ করছেন। এই তালিকা আলতাফ পারভেজের
২৬ জনের তালিকার চেয়ে অনেক লম্বা।
গবেষক ১৯৭১ সালের গনহত্যায় শিকার মানুষদের খুন হওয়াকে মারা যাওয়া আর ১৯৭২ –
১৯৭৫ সালের মধ্যে রাজনৈতিক হানাহানিতে প্রাণ হারানোদের বর্ণনা করতে খুন ব্যবহার
করেছেন। মারা যাওয়া ও খুন হওয়া শব্দ দুইটির পৃথক অর্থ বহন করে। সচারাচর মারা
যাওয়া দিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুকে বুঝানো হয়ে থাকে। আর খুন হওয়া দিয়ে অস্বাভাবিক
মৃত্যুকে বুঝানো হয়ে থাকে। শুধু মারা যাওয়া দিয়েও ১৯৭১ সালের গনহত্যায় শিকার
মানুষদের বুঝানোর নজির রয়েছে। কিন্তু একই বাক্যে গনহত্যাকে মারা যাওয়া ও
রাজনৈতিক হানাহানিকে খুন বলার প্রবণতা একটি রাজনৈতিক ধারা – প্রবাহ , একটি চিন্তা
ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। এই রাজনৈতিক ধারা – প্রবাহ ১৯৭১ সালের গণহত্যাকে ছোট
ও বিতর্কিত করার যে প্রক্রিয়ায় সক্রিয় । জনাব আলতাফ পারভেজ কি প্রক্রিয়ার
অংশ হিসেবে পথ প্রস্তুত করতে মাঠে নেমেছেন কিনা সে প্রশ্ন জাগা কোন অস্বাভাবিক
নয়।
আলতাফ পারভেজ সিরাজগঞ্জের শাজাদপুর অঞ্চলে ৬ জুন ১৯৭২ সালে অন্তর্দলীয়
কোন্দলে ৬ জন জাসদ কর্মী নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করছেন – পৃষ্ঠা ১১১১ । ঘটনাটি
সত্য , ঘটনার দিন তারিখ যা উল্লেখ করেছেন তা সত্য। অসত্য ও অতিকথন হচ্ছে
জাসদের প্রতিষ্টা ৩১ অক্টোবর ১৯৭২ সাল আর। ছাত্রলীগের বিভক্তি হয়েছে ২১ জুলাই
১৯৭২। জাসদ যে সময়ে গঠিত হয়নি সেই সময়ে নিহতদের কিভাবে জাসদ হিসেবে চালিয়ে
দিয়েছেন তা ব্যাখ্যার দাবি রাখে ।
গবেষক লিখছেন 'অতীত অভিজ্ঞতা বর্ণনাকালে মোহন রায়হান এও দাবি করলেন,
সিরাজগঞ্জ রক্ষীবাহিনীর অভিযানকালে ভারতীয় বাহিনী তাতে সংশ্লিষ্ট থাকত।
বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাহিনী আনুষ্ঠানিক ভাবে ত্যাগ করে ১২ মার্চ ১৯৭২। – সূত্র
বিবিসি ২৩ ডিসেম্বর ২০১১। গবেষক গুরুত্ব পূর্ন এই তথ্য কে কোন রকম যাচাই বাছাই
না করে গ্রন্থিত করেছেন। ১৯৭২-১৯৭৫ পর্যন্ত বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের
গ্রেফতারের কাজে ভারতীয় বাহিনী যুক্ত থাকলে ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর কিভাবে
ভারতীয় বাহিনী সিরাজগঞ্জ বা বাংলাদেশ ত্যাগ করতে সক্ষম হলো তা জানানোর দায়িত্ব
এই তথ্য পরিবেশনকারী গবেষকের।
একই বইয়ের অন্য এক অধ্যায়ে গবেষক টিপু বিশ্বাসের উদৃত্তি দিয়ে বলছেন ১৯৭২
সালের ৮ জুন আত্রাই – নওগাঁ নকশালদের বিরুদ্ধে অভিযানে ভারতীয় বাহিনী অংশ নিয়েছিল
– পৃষ্টা ২৭০। তবে এই ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ করে যথাযতভাবে লিখেছেন '
এই দাবী কোন সূত্র দ্বারা যাচাই করা যায়নি। তথ্য যাচাইয়ের পরস্পর বিরোধী প্রবণতা
আলতাফ পারভেজের পক্ষপাত মূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে এনেছে।
সিরাজগঞ্জের গণবাহিনীর তথ্য সংগ্রহের জন্য আব্দুর রউফ পাতা ও মোহন রায়হানের
সাথে আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন আলতাফ পারভেজ। ১৯৭২-১৯৭৫ পর্যন্ত
সিরাজগঞ্জে রাজনৈতিক দমন পীড়নে ভারতীয় বাহিনীর উপস্থিতির কথা আব্দুর রউফ
পাতা র কাছে যাচাই করেছেন এমন উল্লেখ নেই। আব্দুর রউফ পাতাকে পুলিশ গ্রেফতার
করেছিল ১৯৭৩ সালে পরে রক্ষীবাহিনী আব্দুর রউফ পাতাকে রক্ষীবাহিনীর কাছে
হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছিল রক্ষীবাহিনী।
১৯৭২ -১৯৭৫ পর্যন্ত সিরাজগঞ্জে জাসদের প্রধান ৪ নেতা , বিমল কুমার দাস, আব্দুর
রউফ পাতা গ্রেফতার হন ১৯৭৩ সালে। আব্দুল হাই তালুকদার গ্রেফতার হন ১৯৭৪
সালে। ১৯৭৫ সালে আব্দুল লতিফ মির্জা গ্রেফতার হন। এদের গ্রেফতার অভিযানে
ভারতীয় বাহিনীর উপস্থিতির কথা জাসদ কখন উল্লেখ করে নাই। একজন সাংবাদিক –
লেখক হিসেবে সংগৃহীত তথ্য যাচাইয়ের নূন্যতম পদক্ষেপ থেকে আলতাফ পারভেজ
নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। পুরো বইতেই সংগৃহীত তথ্য যাচাইয়ের নূন্যতম পদক্ষেপ চোখে
পরে না।
আলতাফ পারভেজ লিখছেন " এ সময় নকশালদের সঙ্গে [ জাসদের ] বৈরিতার আরেকটি
ফ্রন্টও সৃষ্টি হয়। বাহাত্তরের ফেব্রুয়ারীতে ছাত্রলীগের আব্দুল হামিদ তালুকদার নামে
একজন বড় চরিত্র নিহিত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে বৈরিতা শুরু হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের
শাসনামলের শুরুতে জাসদ নানামুখী চাপ তৈরী করে সিরাজগঞ্জ শহরের নকশালদের বিরাট
অংশকেই অস্র সমর্পণে বাধ্য করেছিল।
এই জেলার মাওবাদী সশস্র ধারার গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন প্রবীর নিয়োগী মনিরুজ্জামান
তারা প্রমুখ। ' – আব্দুল হামিদ তালুকদার আওয়ামীলীগের রাজনীতি করতেন, খুন হয়েছিলেন
১৯৭৪ সালে ১৯৭২ সালে নয়। এই মামলায় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য
লুৎফর রহমান সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাসদের সাথে
নকশালদের বৈরিতার কোন অবকাশ ছিল না কিংবা শত্রুতা হয়নি।
আব্দুল হামিদ হত্যা কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দমন পীড়ন চলে। কবি মোহন রায়হানকে এই
সময় গ্রেফতার করে বিনা বিচারে জেলে বন্দী রাখা হয়। মোহন রায়হান অন্ততঃ পক্ষে
১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত বিনা বিচারে জেলে বন্দি ছিলেন। ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’
কবি মোহন রায়হানের প্রথম কবিতার বই। কবিতার বইয়ে মোহন রায়হান 'নির্বাসিত
ভূখণ্ডে' নামক কবিতা গ্রন্থিত হয়েছে । কবিতার নিচে লেখার স্থান – পাবনা কারাগার,
পাবনা, তারিখ ২১.২.৭৫ মুদ্রিত আছে ।
আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুল হামিদ হত্যা থেকে ১৯৭৫ সালের প্রথম ভাগ পর্যন্ত কবি
মোহন রায়হান জেলে ছিলেন। অন্য কোথায় গবেষক আলতাফ পারভেজ যে দুই জনের কাছ
থেকে সিরাজগঞ্জ গণবাহিনীর তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন তাঁরা সেই সময়ে কারাগারে বন্দী
ছিলেন। সিরাজগঞ্জ গণবাহিনীর কথা উঠলে গোলাম কিবরিয়া ও আব্দুল হাইয়ের নাম উঠে
আসে সবার আগে। লেখক এই দুই জনের নাম ও এনাদের ভূমিকা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল
ছিলেন- পৃষ্টা ৩৭৭। এর পরেও প্রধান সংগঠকদের সাথে আলোচনা এড়িয়ে সিরাজগঞ্জ
গণবাহিনীর ইতিহাস রচনা করেছেন।
' জাসদ নানামুখী চাপ তৈরী করে সিরাজগঞ্জ শহরের নকশালদের বিরাট অংশকেই অস্র
সমর্পণে বাধ্য করেছিল' – প্রথমতঃ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি যাদের নিজেদেরকে
নকশাল বলত তাদের বড় কোন আত্মসমর্পনের ঘটনা সিরাজগঞ্জ ঘটে নাই। যাঁরা আত্ম
সমর্পন করেননি তাদের গায়ে আত্ম সমর্পনের তকমা প্রচেষ্টা বই লেখাকে সহযোগিতা
করতে পারে। তবে এই তকমা লাগানোর প্রচেষ্টা রাজনৈতিক কর্মীর জন্য অপমানকর।
জাসদ তখন নিজেই নানামুখী চাপের মুখে ছিল। জাসদ কি চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং সেই
চাপের সাথে নকশালদের আত্ম সমর্পনের সাথে কি ভাবে সম্পর্কিত তা ব্যাখ্যার দাবী
রাখে।
এই সময় সিরাজগঞ্জে মোহাম্মদ তোয়াহার পুব বাংলার সাম্যবাদী দলের কেউ – কেউ
আত্মসমর্পণ করেন। সাম্যবাদী দলের মোহাম্মদ তোয়াহা জিয়াউর রহমানকে দেশ
প্রেমিক হিসেবে চিহ্নিত করে সশস্র সংগ্রাম পরিত্যাগ করে । এই নীতির ফলশ্রুতিতে
সারাদেশে মোহাম্মদ তোয়াহার পুব বাংলার সাম্যবাদী দল আত্ম সমর্পন করেছিল
সারাদেশে। সিরাজগঞ্জে এই ধারায় কয়েক জন অপমানকর পথে হেঁটেছিল।
আলতাফ পারভেজ মনিরুজ্জামান তারা ও প্রবীর নিয়োগীর কথা উল্লেখ করেছেন।
মনিরুজ্জামান তারা পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি ( এম- এল ) এর সাধারণ সম্পাদক
ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ঢাকা থেকে গ্রেফতার হন। ২২ মে ১৯৭৫ সালে সিরাজগঞ্জের মালসা
পাড়া গোরস্তানে মনিরুজ্জামান তারার লাশ পাওয়া যায়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বলি একজন
বিপ্লবীর জীবন এ ভাবেই শেষ হয়। মনিরুজ্জামান তারা আত্মসমর্পণের পথে হাঁটেন নি।
প্রবীর নিয়োগী সিরাজ সিকদাদের সর্বহারা পার্টির নেতা ছিলেন। ১৯৭১ এর পরে তিনি
সিরাজগঞ্জের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না। এই অঞ্চলে সেই সময়ে সর্বহারা পার্টির
তেমন কোন কাজ ছিল না। সিরাজ সিকদার খুনের পর প্রবীর নিয়োগী সর্বহারা পার্টির
একাংশের প্রধান নেতা ছিলেন কামাল হায়দার নামে। ১৯৭৬ সালে প্রবীর নিয়োগী জেলে
ছিলেন। সেই সময় তিনিও আত্মসমর্পণের পথে হাঁটেন নি।
১৯৮০ দশকে প্রবীর নিয়োগী রাজনীতির সাথে সম্পর্কই ছিন্ন করেন। আইন পেশার সাথে
যুক্ত বর্তমানে। প্রবীর নিয়োগীর আত্মসমর্পণ ঘটে ভিন্ন পথে , ১৯৯৬ সালে তিনি
আওয়ামীলীগ আমলে হাইকোর্টের সহকারী আত্মর্নি জেনেরাল নিযুক্ত হয়েছিলেন। প্রবীর
নিয়োগী বর্তমানে ঢাকায় উচ্চ আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত। Law of Civil Procedure
নামক ২ খন্ড বইয়ের সহ লেখক প্রবীর নিয়োগী।
পাবনা
পাবনা গণবাহিনীর ইতিহাস লিখেছেন আলতাফ পারভেজ ৩৮০ -৩৮৩ পৃষ্ঠায়। জাসদ
রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এমন কারো সাথে আলাপ বা সাক্ষাৎকার নিয়ে এই ইতিহাস
লেখেন নাই জনাৰ গবেষক। ঘরে বসে বা ঢাকায় বসে ইতিহাস লেখার চর্চায় আগ্রহীদের
জন্য এই এই অংশটি শিক্ষণীয়। কল্পনার রাজ্যে আকাশে হাতি উড়ানোর পথ দেখিয়েছেন
আলতাফ পারভেজ।
পুরো লেখা সিপিবির একজন ও তপন ছদ্মনামে একজন নকশাল কমান্ডারের
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই অংশ লিখিত হয়েছে। এই অংশে দুইটি বিষয়কে আলতাফ
পারভেজ উল্ল্যেখ করেছেন। একজন সিপিবি কেন্দ্রীয় নকশাল নেতা টিপু বিশ্বাসের ১৯৭১
সালে পাকিস্থান সেনাবাহিনীর সহযোগিতার কথা – পৃষ্ঠা -৩৮১। একই পৃষ্টায় আলতাফ
পারভেজ লিখছেন " ৩ ডিসেম্বর [ ১৯৭১] স্থানীয় শনির দিয়ার চরে এইরূপ এক বড়
সংঘর্ষে মুক্তিবাহিনীর ৬৭ জন নিহিত হয়। "
পাবনার গণবাহিনীর ইতিহাস লিখতে গিয়ে কিছু দুমড়ানো তথ্য পরিবেশন করেছেন তার
গল্পের প্রয়োজনে। আলতাফ পারভেজ লিখছেন " আহমেদ করিম ছিলেন তাত্বিক চরিত্রের
ব্যাক্তিত্ব। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে এক পর্যায়ে নিহিত হন তিনি ১৯৮০তে।
………জাসদ নেতা আহমেদ করিম সহ ঐসময়কার আরও কিছু মৃত্যুর জন্য সেলিম মোরশেদ
বাহিনীকে দায়ী করা হতো তখন। “- পৃষ্টায় ৩৮২।
পাবনার ইতিহাস – মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ- আমিরুল ইসলাম রাঙা বইয়ে আহমেদ
করিম এর হত্যাকান্ড সম্পর্কে লিখছেন " ১৯৯০ সালের ৩০ অক্টোবর সন্ধ্যায় পাবনা
মিশন স্কুলের পুর্ব পাশে কোবাদ মিয়ার পেট্রোল পাম্পের পাশে একদল চিহ্নিত সন্ত্রাসী
প্রকাশ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ করিমকে ছুরিকাঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
একাধিক সুত্র থেকে জানা যায় পাড়ায় এক কিশোরীর শ্লীলতাহানির ঘটনায় প্রতিবাদ
করার অপরাধে অভিযুক্তরা বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ করিমকে হত্যা করে। "
পাবনার গণবাহিনীর ইতিহাস লিখতে গিয়ে গবেষক একটি নতুন শব্দের জন্ম দিয়েছেন '
নকশাল মুক্তিযোদ্ধা ' । তবে নকশাল মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু
লেখেননি। নকশালদের একমাত্র বীরত্ব শনির দিয়ার অঞ্চলে ৬৭ জন মুক্তিযোদ্ধা হত্যা
করা।
আলতাফ পারভেজ শনির দিয়ার অঞ্চলকে 'চর ' হিসাবে উল্ল্যেখ করেছেন। ঢাকায় বসে
ইতিহাস রচনার সমস্যা এই এইখানেই। বাংলা ভাষায় চর বলতে নদীর মধ্যে মাটি জমে
জেগে উঠা ভুখন্ডকে বুঝায়। মূলভুখন্ড থেকে চর বা চরাঞ্চলে যাওয়ার জন্য প্রধানত
নৌকা ব্যাবহৃত হত।
শনির দিয়ার পাবনা শহর থেকে ৭/৮ কিলোমিটার পশ্চিম দক্ষিণ অংশে। হেমায়েতপুর
ইউনিয়নের অন্তর্গত। শানির দিয়াড় এর পূর্ব উত্তর চক নাজিরপুর, দক্ষিণে
নিয়ামতুল্লাপুর এবং পশ্চিমে কৃষ্ণ দিয়াড়। একসময় পদ্মা নদীর পাড়ে গ্রামটি হলেও পরে
দক্ষিণে নদী চলে যায়। পাবনা শহর থেকে শানির দিয়াড় সড়ক পথে চলাচল ।
চর কিংবা চর নয় এই বিষয় কোন মৌলক বিষয় নয়। মৌলিক বিষয় হচ্ছে সরোজমিন তথ্য
অনুসন্ধান ও যাদেরকে নিয়ে লিখছেন তাদের সাথে কথা বলা। শনির দিয়ারের আরেকটি
পরিচয় সরকার পরিচালিত বাংলাদেশের একমাত্র মানসিক হাসপাতালের পশ্চিম দক্ষিণ
অংশে এই গ্রাম। অন্য পরিচয় এই গ্রামে নকশাল নেতা টিপু বিশ্বাসের বাড়ী।
আলতাফ পারভেজ এই বইয়ের ভূমিকায় লেখক, শিক্ষাবিদ আবুল ফজল এর বক্তব্য দিয়ে
শুরু করেছেন। " সব রচনার উৎস দায়িত্ববোধ, দায়িত্ব- চেতনা। ' একজন পঠাক হিসেবে
প্রশ্ন আলতাফ পারভেজের কাছে প্রশ্ন নিজের বিবেক ও লেখক সত্তার প্রতি তিনি কত
টুকু দায়িত্ববান হতে পেরেছেন!

লেখক : অপু সারোয়ার

