মোনায়েম খান :কিছু দিন আগের কথা, এক ভদ্রলোকের সাথে ফোনালাপ হয়েছিল । নিতান্তই মামুলি কথাবার্তা । তারপর একপর্যায়ে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্তিতি নিয়ে আলোচনা উঠে আসে। বুঝতে পাড়লাম ,তিনি খুবই রাজনৈতিক সচেতন এবং প্রচন্ড বুদ্ধিমত্তার অধিকারীও বটে। তাঁর কাছ থেকে শিক্ষনীয় রয়েছে অনেক কিছু ।
এমনি আলাপের ফাঁকে আমি একজন লোকের কথা জিজ্ঞাসা করি, তিনি চিনেন কি-না ? নাম বলার সাথে সাথে ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ঐ পুলিশের বাচ্চার কথা বলছেন না তো ? আমার জানা ছিল না , ঐ লোকটির বাবা পুলিশে চাকুরী করেন , তাই ফের জিজ্ঞাসা করি , উনার পিতা পুলিশ বুঝি ? উত্তরে তিনি শ্লেষমাখা কন্ঠে বললেন , আরে না, ঐ-টা পুলিশের মত হারামী।
জানি এ কথা গুলো শুনে অনেকেই বিব্রতবোধ করবেন, তবে বাংলাদেশের পুলিশ সম্পর্কে সাধারন মানুষের ধারনা খুব একটা সুখের নয় । সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্ন স্হানে পুলিশের অপকর্মের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠা গনরোষই তার প্রমান। পুলিশ একটি নিকৃষ্ট গালি হিসেবে প্রতিয়মান হচ্ছে। দেশের আইনশৃংঙ্খলা পরিস্তিতির মারাত্মক অধ:পতন ও পুলিশ কর্তৃক চরম দুর্নীতির কারনেই সাধারন জনতা পুলিশকে বিভিন্ন উপনামে সম্মোধন করছে।
পুলিশ একটি মহৎ পেশা । এই পেশার লোক সরাসরি আপামর জনতার সাথে সম্পৃক্ত । এজন্য পুলিশ বিভাগ সেবাদানকারী সংস্হা হিসেবে অগ্রগণ্য । কিন্তু বাংলাদেশে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত লোকগুলোর সন্দেহজনক আচার আচরণে, সেবা নামক সংগঠনটিকে ,এক অভিশাপ হিসেবে রূপান্তরিত করেছে। এজন্য আইনশৃংঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত লোকদের প্রতি শ্রদ্ধার পরিবর্তে গনমানুষের মনে প্রবল ঘৃনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সন্দেহাতীত , পুলিশ বিভাগের দুর্নীতি প্রতিষ্ঠানিক। এ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বুদ্ধিভিত্তিক বিচক্ষনতার প্রয়োজন নেই। একটি উদাহরণই যতেষ্ট । যেমন, সিলেট অঞ্চলের প্রবাসী অধ্যুসিত থানায় পুলিশ সদস্যরা নিয়োগ পেতে পদবী অনুযায়ী লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে থাকেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই ঘুষের টাকা কা’কে দেওয়া হয় । নিশ্চয় উর্ধতন কর্মকর্তা । এই উর্ধতন কর্মকর্তার পরিব্যাপ্তি মন্ত্রনালয় পর্যন্ত ।
সিলেটের একটি ধনী থানায় পুলিশের বদলীর জন্য যদি মোটা অংকের পয়সা দিতে হয় , তবে ইহা সহজে অনুমেয়, বদলীকৃত পুলিশ সদস্য পয়সা কিভাবে উপার্জন করবে। অর্থাৎ , মন্ত্রনালয় থেকেই দুর্নীতি, চাঁদাবাজী বা ঘুষ গ্রহনের একটি নীরব সম্মতি বা বৈধতা বদলীর সাথেই দিয়ে দেওয়া হয় । কাজেই কর্মস্হলে যোগদানের পর ঐ পুলিশ ,দেশসেবার পরিবর্তে নিজের সেবায় ব্যতিব্যাস্ত হয়ে উঠেন। এবং জোড় জুলুমের মাধ্যমে উপার্জনকৃত পয়সার একটি অংশ গুরু দক্ষিনার ন্যায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়, যার বদৌলতে পুলিশ সদস্যরা সকল আইনি বাঁধা বিপত্তি থেকে নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হন। এই নিখাঁদ সত্য কথাগুলি বাংলাদেশের সকল শ্রেনি , পেশার লোক ভালভাবে অবগত আছেন, মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীও বটে।
এই চিত্র শুধু পুলিশ বিভাগের নয় , বরং প্রতিটি সেক্টরের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠানিক দুর্নীতি জগদ্দল পাথর ছেপে বসে আছে জাতির বুকে । দুর্নীতির মহাপ্রতিযোগীতায় দেশের স্বাস্হ্যখাতও পিঁছিয়ে নেই। প্রতিবৎসর বাজেটে উল্লেখযোগ্য পরিমান টাকা বরাদ্দ থাকলেও, চিকিৎসা সেবা থেকে সাধারন মানুষ বঞ্চিত। সরকারী হাসপাতালগুলোতে বিনা পয়সায় চিকিৎসা প্রদানের কথা থাকলেও পয়সা দিয়েও কাজ হচ্ছে না। এর সাক্ষাত উদাহরণ , সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। উক্ত প্রতিষ্ঠানের ডাক্তার, নার্স ,প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নাইট গার্ড চাপরাসী পর্যন্ত চিত্তগ্রাহী দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমিজ্জিত। এনিয়ে সিলেটের ক’জন সাংবাদিক বার বার প্রতিবেদন লিখছেন। অনেক ভুক্তভুগিরা সঙ্গিন অভিযোগ উত্থাপন করে আসছেন। কিন্তু দেখার কেউ নেই।
শিক্ষাখাতেও ঢালাওভাবে দুর্নীতি চলছে । প্রাইভেট স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলো ইচ্ছামাফিক পয়সা হাতরিয়ে নিচ্ছে, উন্নত শিক্ষার নামে। অথচ বিশ্বমানের পড়াশুনা ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোতে আজও অলিক রয়ে গেছে, একমাত্র চৌকোষ বিজ্ঞাপন ছাড়া । আর সরকারী ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে শিক্ষার পরিবেষ শোচনীয়ভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, অব্যাহত ছাত্ররাজনীতির নামে গড়ে উঠা সঙ্গবদ্ধ আধিপত্যবাদীদের অনৈতিক কর্মকান্ডে। দেশের ছাত্র নামধারী ঐ সমস্ত সোনার ছেলেদের পৃষ্টপোষক কারা, ব্যাখ্যর প্রয়োজন নেই।
দেশের এম পি মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী , নেতা নেত্রীর বাগাড়ম্বরপুর্ন বক্তৃতা বিবৃতিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদের ঘোষনা শুনা যায় । আবেগমাখা প্রতিশ্রুতি শ্রবন করে অল্পতে তুষ্ট জনতা হুড়মুড় করতালি আর শ্লোগানের মাধ্যমে অনুগত্য প্রকাশ করে থাকেন। কি বিষদৃশ্য! সকল অবিচার অনাচারের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা মুখোশপড়া ঐ নন্দিত রাজনীতিকরাই, সে কথা কি জনগন একবারও ভেবে দেখেন না।
হালে বিভিন্ন ইস্যুতে দেশে কিছু বিচ্ছিন্ন আন্দোলন হচ্ছে , অনেকে আবার এই প্রচেষ্টকে সরকার পতনের পুর্বাভাস মনে করছেন। অথবা ইন্দন যোগানোর চেষ্টা করছেন । কিন্তু ভাবার বিষয় হলো, আদৌ কি, এখন তেমন পরিবেষ সৃষ্টি হয়েছে যে , সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশকে সঠিক রাস্তায় পরিচালিত করা যাবে। অর্থাৎ , একটি পুর্ন গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে সংযোজন করা যাবে ?
তর্কাতাতীত, বাংলাদেশ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বৎসর অতিক্রান্ত করেও একটি গনতান্ত্রিক দেশ অথবা রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করতে ব্যার্থ। রাষ্টবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় , একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে গনতান্ত্রিক দল প্রয়োজন । কিন্তু দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশে পারিবারিক তান্ত্রিক দলতন্ত্রের নির্লজ্জ বিকাশ ঘটছে । এবং এইসব দল থেকে পা চাটা চাটুকারদের বংশবৃদ্ধিই হচ্ছে বেশী। ব্যাক্তি পুজারী এই সমস্ত অপদার্থ দিয়ে গনতান্ত্রিক দেশ প্রতিষ্ঠার কোন নজির দুনিয়ার কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
অঘোর অস্হিতিশীল দেশ, বিপদ অত্যাসন্ন।সর্বত্র অনিয়ম ,ফলে ক্ষমতাসীনরা বিব্রতকর পরিস্হিতিতির মুখামুখি।শান্তিকামী মানুষ অবশ্যই একটি পরিবর্তন চায়। তবে সে পরিবর্তন যেন এমন না হয় যে,গরু বিক্রি করে ছাগল যেন কিনতে না হয়।
লেখক: বৃটেন প্রবাসী উপন্যাসিক ও কলামিস্ট।

