ধর্মের নামে ভিক্ষাবৃত্তি : এক অমার্জনীয় অপরাধ

মোনায়েম খান :“যে ভাই গো যে নিয়তে করে যায় গো দান আমার আল্লাহ নবীজীর নাম।”।

এই পংক্তি গুলো ক’জন ভিক্ষুক পুঁথির সুরে নেচে গেয়ে সিলেট-আখাউড়া রুটের লোকাল ট্রেনে যাত্রীসাধারনের মনোরঞ্জন করে দু/চার আনা পয়সা কামিয়ে নিত। ইহা আজ থেকে ৪০/৪৫ বৎসর আগের কথা। তখন আখাউড়া থেকে সিলেটগামী বা সিলেট থেকে আখাউড়া গামী লোকাল ট্রেন গুলোতে সঙ্গবদ্ধ ভিক্ষুকদের উপস্হিতি ছিল চোখে পরার মত।ট্রেন গুলোতে একদিকে যেমন হকারদের দৌরাত্ব ছিল ঠিক তেমনি ভিক্ষুকদের উপদ্রব যাত্রীসাধারনের ভুগান্তি সহজে সহ্যসীমা অতিক্রম করতো । নিরুপদ্রব নিভৃত ভ্রমনচারী লোক ভিক্ষুকদের প্রতি বেজায় অতিষ্ঠ হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ যাত্রী দীর্ঘপথে সহযাত্রী হিসেবে দীনহীন ভিখারীদের প্রতি অনিচ্ছা সত্বেও সন্তোষজনক আচরন প্রদর্শন করতেন ।কারন , আমোদ প্রিয় লোক ভিক্ষুকদের আবেগপ্রবণ গীতিমালা, সুর, ছন্দ ও উপস্থাপনার বাচনভঙ্গি দেখে গন্তব্যের দুরুত্ব সংকুচিত হয়ে যাবে বলে মনে করতেন বিধায় ,যাত্রাপথে ইহা একটি বাড়তি চিত্তবিনোদনের সুযোগ হিসেবে গ্রহন করতেন ।

নি:সন্দেহে ভিক্ষুকরা খুবই কেতাদুরস্ত ও চালু ছিল । মানুষকে কিভাবে আবেগ তাড়িত করে লুন্ঠন করা যায়, তা তারা উঁচু মাত্রায় রপ্ত করে রেখেছিল । এবং সুযোগ পেলে সদ ব্যবহার করতে কখনও কুন্ঠাবোধ করতো না । যেমন, উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় , অবস্তাসম্পন্ন স্বচ্ছল ব্যক্তি দেখা মাত্রই তাঁকে উদ্দেশ্য করে বন্দনার ভাষায় বলে উঠতো –
এই কোণেতে বসে আছেন বড় ভাগ্যবান
তিনি আমাদের করবেন আজ বড় একটা দান
আল্লাহ যেন দেখান তাঁরে আরাফাতের ময়দান
আমার আল্লাহ নবীজীর নাম।
তাদের এই চাতুর্য কেউ বুঝতেন না ,এমন নয় । তারপরও কিছু কোমল প্রান সদয়চিত্তের ব্যক্তিবর্গ ভিক্ষুকদের ভিক্ষা চাওয়ার অভিনবত্বে মুগ্ধ হয়ে হৃষ্টচিত্তে পকেট খুলতে দ্বিধান্বিত হতেন না ।যাত্রাপথে কিছু না কিছু খুশি মনে দান করে যেতেন, পরকালে পূন্য লাভের আশায় ।

সিলেট – আখাউড়া রুটের লোকাল ট্রেনে মাঝে মধ্যে ভ্রমন করার সুযোগ হয়েছিল আমার। বিশেষ করে সিলেট থেকে ভানুগাছ(কমলগঞ্জ)যাওয়া আসা ছিল বিধায অতি পরিচিত চেনা মুখ ৪/৫ জনের দলবদ্ধ ভিক্ষুকদের সাথে প্রায়শ:ই দেখা হতো। উল্লেখ, লোকাল ট্রেনে সিলেট থেকে ভানুগাছ যেতে তখন চার/ পাঁচ ঘন্টা সময় লেগে যেত। তাছাড়া ক্রসিংয়ে বিলম্ব হলে সে সময় আরও বৃদ্ধি পেত।দুর্ভোগ প্রলম্বিত হত।

ভিক্ষাবৃত্তি একটি নিন্দনীয় কাজ। যা ধর্মেও সায় দেয় না। কোন হাদিসের উদ্ধৃতি ছাড়াই বলছি, পাঠশালায় পড়েছিলাম, “নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা, মেহনত কর সবে”। এই চিরন্তন বাণী আমার মনে মগজে পাথরের মত প্রবিষ্ট বিধায় ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃনার চোখে দেখে আসছি , সেই শৈশব থেকে।কিন্তু লোকাল ট্রেনের ঐ পেশাদার ভিক্ষুকদের প্রতি কেন জানি মনে করুনার উদ্রেক হতো। তাই অনিচ্ছা সত্বেও কিছু ভাংতি পয়সা দিয়ে দিতাম। মনে পড়ে, যখনই উল্লেখিত পথে যাত্রী হয়েছি , কাউন্টার থেকে টিকেট খরিদ করার সাথে সাথে ভাংতি কিংছু পয়সা অবশিষ্ট আছে কি-না নিশ্চিত হয়েই ট্রেনে পা রাখতাম। কারন, যাত্রাপথে অবশ্যই ভিক্ষুকদের দেখা মিলবে। দু/চার আনা ওদেরকে দিতে হবে।

আজও স্পষ্ট মনে আছে, ঐ ভিক্ষুকদের মধ্যে ১২/১৪ বৎসরের একটি ছেলেই মুলত: দলের মধ্যমনি ছিল। ছেলেটি অন্ধ ছিল না, তবে নৈপুন্যের সাথে চমৎকার অন্ধের অভিনয়ে ছিল বেশ পারদর্শী । মনে হতো, পাঁকা অভিনেতারাও তার কাছে হার মানবেন। ঐ ছেলেটি রেল বগিতে পা রেখেই পুঁথির সুরে গেয়ে উঠতো, যে ভাই গো যে নিয়তে করে যায় গো দান, সাথে সাথে তার অপর সঙ্গিরা সুরের সাথে সুর মিলিয়ে জবাব দিত এই বলে, আমার আল্লাহ নবীজীর নাম। তাদের সুমিষ্ট সুর ভিক্ষা চাওয়ার হৃদয়স্পর্শী আকুতি মিনতি সহজে যাত্রী সাধারনদের মনে ভাবাবেগের প্লাবন বয়ে যেত। ফলশ্রুতিতে,
কিছু কোমলপ্রান মানুষ বিনা বাক্যব্যয়ে যৎসামান্য পয়সা দান খয়রাত হিসেবে দিয়ে যেতেন।

অত:পর ১৯৮৪ সনে প্রবাসী হওয়ার পর সর্বশেষ ১৯৯৯ সালে আর একবার লোকাল ট্রেন চড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, সহধর্মিনীর অনুরুধ রক্ষার্থে ।উদ্দেশ্য , কিছু সময় দেশের ট্রেন যাত্রা উপভোগ করা ।উল্লেখ, সে বৎসরই প্রথম ইংলেন্ড থেকে স্বপরিবারে বাংলাদেশে বেড়াতে যাই।

দীর্ঘদিন পর চেনা রাস্তা কিছুটা অচেনা মনে হলেও ট্রেনে পা রাখতেই ফিল্মী রিলের মত মানসপটে ঐ ভিক্ষুকদের মুখচ্ছবি ভেসে উঠে। সহযাত্রী দু একজনের সাথে আলাপক্রমে জানতে পারলাম, সঙ্গবদ্ধ ভিক্ষুকদলের অস্তিত্ব তখন আর নেই। যদিও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোক তখনও ভিক্ষাবৃত্তির সাথে জড়িত রয়েছে ।

বিস্ময়ের হলেও সত্য, ভুলে যাওয়া সেই চাতুরীবাজ ভিক্ষুকদের প্রেতাত্মা ,প্রতিচ্ছবি বৃটেনের বাংলা টিভি চ্যানেল গুলোতে নতুন সংষ্করণে প্রতিভাত হচ্ছে। এ উপলব্ধি বৃটেনে অবস্থানরত বাংলাদেশী কমিউনিটির সংখ্যধিক্য লোকের। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় , বেশ কিছু অতি পরিচিত হুজুর বাংলা টিভি গুলোর সহায়তায় চ্যরিটি নামধারী লাভজনক ব্যবসা খুলে রেখেছেন । তারা বৎসরব্যাপী বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসা আর ইসলামী প্রতিষ্ঠানের নামে অলিক কল্পকাহিনী শুনিয়ে সরলপ্রাণ ধর্মভিরু মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার পাউন্ড। দ্বীনি খেদমতের আড়ালে সুক্ষ লুঠতরাজের মাধ্যমে এক এক জন হুজুর অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছন , এমন বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা প্রায়শ:ই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে।অথচ অতিমাত্রয় ধর্মান্ধ লোকগুলো অন্ধবিশ্বাসের উপর অটল থেকে হুজুর লেবাসধারী প্রতারকদের অব্যাহত ভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। জানি না ঐ লোকগুলো কখন খালি চোখে স্বচ্ছ আকাশ দেখতে পাবে।

আজ থেকে ৪০/৪২ বৎসর আগের দেখা ট্রেনের ভিক্ষুক আর বর্তমানের চ্যারিটি ব্যবসায়ী, স্বঘোষিত দ্বীনি খেদমতকারী ,টিভির মোল্লা মৌলভীর মধ্যে দৃশ্যত: কোন পার্থক্য নেই । উভয়ের গুনগত মান ও প্রতারণার কৌশল প্রায় এক ও অভিন্ন। যেমন, দু/চার আনা পয়সার জন্য রেলের ভিক্ষুকরা যেভাবে পুঁথির ছন্দে দান খয়রাতের উপকারিতা ও পরকালে সুফল লাভের সুসংবাদ বর্ননা করে যাত্রীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতো ঠিক তেমনি আজ ,উল্লেখিত বর্নচোরা মোল্লা মৌলভীরা একই পদ্ধতিতে ধর্মপ্রান মানুষদের পরকালের ভয় ভীতি দেখিয়ে বাগিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার পয়সা ।

ট্রেনের ভিক্ষুকদের মুখে শুনতাম, একটি পয়সা দিয়ে যাও গো আমাকে , সত্তর পয়সা পাইবা তুমি কঠিন হাসরে । এমনি আরও কত হাম নাত, জিকির শুনেছি তার সবকিছু এখন আর মনে নেই। সেই একই সুর আজকের মোল্লাদের মুখে । চরম অজ্ঞতায় ,ওরা ধর্মের নামে ভিক্ষাবৃত্তির প্রসার ঘটাচ্ছে।যা খাঁটি ধর্মপ্রান লোকের কাম্য নয় ।

শারীরিকভাবে অক্ষম ভুখা নাঙ্গা ভিখারীরা নিতান্তই পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য সহজসরল মানুষের মনে অনুকম্পা জাগানোর প্রচেষ্টায় দানের ফজিলত হিসেবে জান্নাত প্রাপ্তির সুসংবাদ শুনাতো। বর্তমানে খয়রাতের উপর নির্ভরশীল মোল্লা নামধারী নব্য ভিক্ষুকরা সেই একই কায়দায় ধর্মপ্রান মানুষকে দানের বদলে আখেরাতের সকল সুখ স্বাচ্ছ্যান্দ লাভের পুর্ন নিশ্চয়তা দিয়ে আসছে। কোন কোন মোল্লা এমনও বলেন, আমার মাদ্রাসায় একটি ঘর বানিয়ে দিন, আল্লাহ আপনার জন্য বেহেস্তে একটি ঘর বানিয়ে দিবেন। আবার কেউ বলেন, একটি জায়নামাজের জায়গার ব্যবস্হা করে দেন, জান্নাতে আপনি এই জায়গাটুকু পেয়ে যাবেন। অর্থাৎ, পয়সার বিনিময়ে জীবদ্দশায় নিশ্চিত বেহেস্তের সার্টিফিকেট পেয়ে যাবেন। কি সাংঘাতিক ঔদ্ধত্যপুর্ন কথা ! ভাবতে অবাক লাগে এমন অকাট-মুর্খ অসাড় কথা মানুষ বিশ্বাস করে কিভাবে ? এদের বয়কট করা সময়ের দাবী।

একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবে আমাদের বিশ্বাস, বেহেস্ত -দোজখ নির্ধারণের মালিক একমাত্র মহান আল্লাহতালা। কোন হুজুর তার নিশ্চয়তা দিতে পারেন না । অন্তত: এই বোধোজ্ঞান একজন মুসলমান মাত্রই থাকা অবশ্য জরুরী।এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই, নিশ্চয়ই আমরা সরল পথের অনুসারী।

লেখক: বৃটেন প্রবাসী উপন্যাসিক ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.