হ্রদ, ঝর্ণা, পাহাড় আর গভীর জঙ্গলের হালস্ট্যাট

গত শনিবার ইংল্যান্ড ম্যানচেস্টারে বন্ধু বেলালের মেয়ের বিয়েতে থাকার কথা ছিলো।  সব ছিলো গতবছরে পাওয়া নিমন্ত্রণ অনুযায়ী এই বছরের প্রী-প্রোগ্রাম । সেই কারণেই সপ্তাহখানেক ছুটি পূর্বেই নিয়ে রেখেছিলাম। করোনা সব   ওলটপালট করে দিয়েছে। এই মূহুর্তে অষ্ট্রিয়া ছেড়ে ভিন্ন দেশে যাওয়া হবে আত্মহত্যার সামিল। বন্ধু বেলালের মেয়ের বিয়ে হয়েছে, বিয়ের প্রোগ্রাম যদি সময় সুযোগ হয় আগামী বছর হবে এবং থাকার ইচ্ছা পোষণ করি। বন্ধু বেলালের সাথে সেইভাবেই কথা হয়েছে। আমার শুভেচ্ছা থাকবে বন্ধু বেলালের মেয়ের সুন্দর ভবিষ্যতের  জন্য।

20200723_114928.jpg

আর্থিক যে অবস্থায় থাকি না কেন, সারাবছর কাজ আর কাজের পরে গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে এক সপ্তাহের জন্য ইউরোপের যেকোনো দ্বীপরাষ্ট্রে সাগরজল আর কড়া রোদ্দুর উপভোগ করাটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে এবার সেই সুযোগটা খুবই কম, কারণ সেই করোনা।

20200723_140148যেহেতু হাতে এখন সপ্তাহখানেক ছুটি আছে, তাই সময়টাকে অষ্ট্রিয়ার ভিতরেই পাহাড়, নদী আর জঙ্গলে কাঁটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েই গত সাতদিন ঘুরে বেড়িয়েছি।  ঘুরে বেড়িয়েছি নানান পাহাড়, জঙ্গল আর শহরে। তবে আজকে কেবল অষ্ট্রিয়ার হালস্ট্যাট  শহর ও সেই শহরের মনোরম পরিবেশের একটি নিয়ে খুবই সংক্ষেপে কিছুটা বলার  প্রয়াসে এই লেখা ।

20200723_160236

হালস্ট্যাট শহরটি অষ্ট্রিয়ার অঙ্গরাজ্য ওভারওস্টারাইখ সালজকামারগুটের একটি অংশ। সালজকামারগুটের আশেপাশের পাহাড়/ হ্রদ বেষ্টিত শহর ডাকস্ট্যাইন/ হালস্ট্যাট অর্থাৎ পুরো সালজকামারগুট ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভূক্ত।

20200723_133818.jpg

অষ্ট্রিয়ায় আমার বসবাসের শহর লিন্জ থেকে হাইওয়ে ধরে দূরত্ব ১২৬ কিলোমিটার এবং একঘন্টা চল্লিশ মিনিট যাত্রা পথ। হাইওয়ে ছাড়া পাশের রাস্তা ধরে যাত্রা সময় মোটামুটি দুই ঘন্টা বিশ মিনিটের মতন লাগবে। হাইওয়ের পাশের রাস্তাকে রোমান্টিক রাস্তা বলা হয়, কেননা এই রাস্তাটি পাহাড় এবং হ্রদের কাছ ঘেঁষে চলার রাস্তা।  মনোরম পরিবেশে এই রাস্তাকে তাই রোমান্টিক রাস্তা বলা হয় ।

20200723_141247.jpg

হালস্ট্যাট শহরটি ৫৯,৮ কিলো স্কয়ার মিটারের শহর এবং মোট বাসিন্দা ৭৭৯ জন মাত্র। এই শহরটিতে বছরে গড়ে ছয় থেকে সাত লক্ষ পর্যটকের আগমন ঘটে। ২০১৮ সালে সেই রেকর্ড ভেঙে নয় লক্ষ পর্যটকের আগমন ঘটেছিলো ।

IMG-20200724-WA0005

হালস্ট্যাট শহরের অনেকগুলো উঁচু পর্বতের একটিতে গতকাল আমরা চারজন হালস্ট্যাট শহরের সেন্টার থেকে ১১০০ ফিট উপরের হালস্ট্যাট স্কাইওয়াক ওয়ার্ল্ড  হেরিটেজ ভিউতে ছিলাম। খাঁড়া পর্বতের চূড়ায় উঠার ব্যবস্থা ক্যাবল কারের মাধ্যমে করা আছে। পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে ক্যাবল কার সোজা উপরে উঠে যায়। প্রতি একজনকে ১৭ ইউরো টিকেট মূল্য প্রদান করতে হয় ।

20200723_164732.jpg

 

তাছাড়া রয়েছে পায়ে হেঁটে পাহাড়ের ভিতর দিয়ে সরুপথ দিয়ে উপরে উঠার ব্যবস্থা।  তবে সেই ক্ষেত্রে পর্যটকদের পাহাড়ে হাঁটার ভালো জুতো এবং সাথে পিঠে বহন করা ব্যাগে হালকা কিছু খাবার ও পানীয় সাথে রাখতে হবে । কেননা এত উঁচুতে উঠাটা বেশ সময় সাপেক্ষ এবং যাত্রা পথে বিশ্রামে হালকা  খাবার ও পানীয় প্রয়োজন হয় । আমরা চারজন বেশ হাসিঠাট্টা ও আনন্দ করেই পায়ের রাস্তায় উপরে উঠি। ব্যবস্থা পূর্বেই সব করে নিয়েছিলাম।

20200723_164403.jpg

পথিমধ্যে অনেক ছবি তোলা আর গল্প গুজব  করতে করতে   উপরে উঠি ।  স্কাইওয়াক ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ভিউ পাহাড়ের চূড়ায় চমৎকার একটি রেস্টুরেন্ট আছে। রেস্টুরেন্টের মূল আকর্ষণ হলো ঝুলন্ত বিরাট ব্যালকনি, যেখানে বসে পানীয় ও খাবারের সাথে সমগ্র হালস্ট্যাটের হ্রদ, পাহাড় ও জঙ্গলের মনোরঞ্জন পরিবেশ খাবারের সাথে উপভোগ করা যায়।

IMG-20200724-WA0023.jpg

সত্যি বলতে আবহাওয়া যদি চকচকে রোদ্দুরের হয়, তাহলে এমন জায়গা ছেড়ে কেউ অতি সহজে উঠতে চাইবে না ।

20200723_161001.jpg

 

রেস্টুরেন্টটি সর্বদাই পর্যটকদের ভিড়ে গমগম করে । অষ্ট্রিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবারের সাথে হালকা  কিছু স্ন্যাকস পাওয়া যায়।  তবে অষ্ট্রিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবারেই পর্যটকদের বেশি আকর্ষণ থাকে।

20200723_135839.jpg

 

গতকাল আমাদের ভাগ্য বেশ ভালো ছিলো বলা যায়।  পরিষ্কার আকাশ আর কড়া রোদ্দুর পাওয়াটা ছিলো আনন্দের । রেস্টুরেন্টে হালকা  খাবার আর পানীয় খেয়ে দীর্ঘ বিশ্রাম আর মনোরঞ্জন পরিবেশ উপভোগ করে বিকেলের দিকে আবার পাহাড়ের সরু পথ ধরে পায়ে হেঁটেই শহরের হ্রদে জাহাজ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নিচে নেমে আসি ।

IMG-20200724-WA0015.jpg

হালস্ট্যাট শহরের হালস্ট্যাট হ্রদে প্রতি ঘন্টায় জাহাজ ভ্রমণের চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। ছোটো এই জাহাজগুলো পাহাড় ঘেঁষে সমগ্র হালস্ট্যাট শহরের হ্রদেই ঘুরে বেড়ানো যায় । লেখা দীর্ঘায়িত  না করে কিছু ছবি যোগ করে দিলাম, কেননা ছবি কথা বলে ।

IMG-20200724-WA0007.jpg

 

আগামীর লেখায় পূর্বের ভিন্ন ভ্রমণের কথা লেখার ইচ্ছা রইলো।  আমাদের দেশ থেকেও বেশ কয়েক বছর ধরে অনেকেই ইউরোপের স্যাংজেন ভিসা নিয়ে ইউরোপ ঘুরতে এসেছে। এবার হয়তো করোনায় সেই সুযোগটি অনেকের হবে না । তবে আগামীতে করোনার ক্রান্তিকাল শেষ হলে নিশ্চয়ই আবার আমাদের দেশের অনেকেই ইউরোপ ভ্রমণে বের হবে। তাদের জন্য এই হালস্ট্যাট হতে পারে অতীব  আকর্ষণীয় একটি পর্যটন কেন্দ্র। হাজার হাজার ফিট উপর থেকে হ্রদ, পাহাড়, সবুজের সমারোহ নিশ্চিত পর্যটকদের মনকে জয় করবেই । আগামীর দিনগুলো করোনা মুক্ত হোক, সেই প্রার্থনা করি ।

 

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.