স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলোর মৃত্যুঘণ্টা বাজানো হলো। দায় চাপানো হলো অতীতের মতোই শ্রমিকের ওপর এবং দায়মুক্ত হতে চাইল রাষ্ট্র। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়েছিল মুসলিম লীগের। ভাষা, সাদা ভাত আর সোনালি আঁশের কথা একাকার হয়ে গিয়েছিল মুসলিম লীগবিরোধী আন্দোলনে। তাই ২১ দফায় সন্নিবেশিত হয়েছিল পাটশিল্প জাতীয়করণের দাবি। কী এক বিষণœ ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী এদেশের জনগণ। যারা যুক্তফ্রন্টে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাই সর্বশেষ পেরেক ঠুকলেন সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এই রাষ্ট্রীয় খাতটির কফিনে।
৪৪ বছরে রাষ্ট্রীয় পাটকলের ইতিহাস ক্রমাগত লোকসানের ইতিহাস এই কথা উচ্চকণ্ঠে বলছেন কর্তাব্যক্তিরা। এই ৪৪ বছরে লোকসান হয়েছে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। বছরে গড়ে লোকসান ২৪৩ কোটি টাকার আঘাত এই রাষ্ট্র সহ্য করতে পারছে না। যদিও তুলনা করাটা বোকামি যে এই সময়কালে খেলাপি ঋণ মাফ করা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। তারপরও কেন লোকসান, কাদের কারণে লোকসান, কী করলে লোকসানকে লাভে পরিণত করা যেত সেসব নিয়ে যত প্রশ্ন এবং প্রস্তাবনা কোনোটিরই উত্তর দেননি এই ৪৮ বছর যারা পাট খাত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তারা। একটি হিসাবে দেখানো হয়েছিল ৪০/৫০ বছরের পুরনো যন্ত্রপাতির বদলে আধুনিক মেশিন স্থাপন করলে খরচ হবে ১২০০ কোটি টাকা। উৎপাদন বৃদ্ধি পেত তিনগুণ, শ্রমিক ছাঁটাই তো করতে হতোই না বরং ২৫ হাজার টাকা মজুরি দিয়েও কারখানা লাভজনক করা যেত। সেই টাকা বরাদ্দ হলো না কিন্তু ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলো কারখানা বন্ধ করার জন্য।
এই ভূখণ্ডে পাটশিল্পের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জে বাওয়া জুটমিল স্থাপনের মধ্য দিয়ে। সেই বছরের ১২ ডিসেম্বর ২৯৭ একর জায়গা আর ৩৩০০ তাঁত নিয়ে এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল স্থাপন করেন আদমজীরা তিন ভাই।
প্রাথমিকভাবে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এই কারখানা বার্ষিক ৬০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত হয়। পাটশিল্পে এই সম্ভাবনা দেখে একের পর এক কারখানা স্থাপিত হতে থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে পাটকলের সংখ্যা ছিল ৭৫টি। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ রাষ্ট্রপতির আদেশে ‘পিও ২৭’ (বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজেস ন্যাশনালাইজেশন অর্ডার ১৯৭২) অনুযায়ী ব্যক্তিমালিকানাধীন ও পরিত্যক্ত পাটকলসহ সাবেক ‘ইপিআইডিসি’-এর মোট ৬৭টি পাটকলের তদারকি, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন গঠিত হয়। ১৯৮১ সালে এর নিয়ন্ত্রণাধীন মিলের সংখ্যা ছিল ৮২।
বিশ্বব্যাংক ও সাম্রাজ্যবাদী দাতা গোষ্ঠীর পরামর্শ ও চাপে ১৯৮২ সালের পর বিরাষ্ট্রীয়করণ ও পাটশিল্প থেকে পুঁজি প্রত্যাহার শুরু হলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হওয়া শুরু হয়। ২০০২ সালে ‘অজগর’ আখ্যা দিয়ে বন্ধ করা হয় আদমজী। পাটশিল্পকে ‘সানসেট ইন্ডাস্ট্রি’ আখ্যা দিয়ে একে বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হতে হতে বর্তমানে বিজিএমসির পাটকলের সংখ্যা ৩২। এর মধ্যে চালু রয়েছে ২৫টি, মামলা এবং বিচারাধীন ৫টি, ১টি নিয়ে বিক্রয়োত্তর মামলা, ১টিতে ভিসকস উৎপাদন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ করলেও বেসরকারি পাটকল কিন্তু বাড়ছে। বর্তমানে বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৮৫। মিলগুলোতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ২ লাখের বেশি। শ্রম নিংড়ে নিয়ে এদের মজুরি ২৭০০ টাকা স্কেলে। চাকরির নিশ্চয়তা বলতে কিছু নেই। এটা দেখিয়ে বলা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কারখানায় শ্রমিকের মজুরি বেশি। বলা হয় শ্রমিক নেতাদের কারণে কারখানায় উৎপাদন কম। কিন্তু একবারও কি বলা হয়েছে যে এরা সবাই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। সবাই দুর্নীতির ঘুঘু দেখল কিন্তু চাকরি হারানোর ফাঁদে পড়ল শ্রমিক। ঘুঘু দেখে মুগ্ধ শ্রমিকরা এখন ফাঁদে পড়ে জব্দ।
দেশে পাট চাষের জমির পরিমাণ ১৪ লাখ ৭৫ হাজার একর। পাট উৎপাদন ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ১১ লাখ টনেরও বেশি। কাঁচা পাট গড়ে প্রতি বছর রপ্তানি হয় ২.৫ লাখ টন যার মূল্য প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা। পাটপণ্যের গড় উৎপাদন ১০ লাখ ৫০ হাজার টন যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ১ লাখ ৫০ হাজার টনের মতো। আর বাকি প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার টন পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি হয় যার মূল্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। একটা সাধারণ হিসাবে দেখা যায়, পাটজাত দ্রব্যের রপ্তানি প্রতি বছরই বাড়ছে। পাট উৎপাদনে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও পাটজাত দ্রব্যের রপ্তানিতে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে। ২০১৬-১৭ সালে বাংলাদেশের উৎপাদন ১৫ লাখ ৩০ হাজার টন আর ভারতের ছিল ১৬ লাখ ৫৬ হাজার টন। কিন্তু বাংলাদেশ রপ্তানি করেছিল ৭৯৪ মিলিয়ন ডলার আর ভারত রপ্তানি করেছিল ৩২৪ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বে বাংলাদেশ এখনো তাই পাটের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ।
পাটের সম্ভাবনা বাড়ছে দেশে এবং সারা বিশ্বে। পাট এমন একটি পণ্য যার কোনো কিছুই ফেলনা নয়। পাটের পাতা, আঁশ, পাটখড়ি সবই কাজে লাগে। যে জমিতে পাট চাষ করা হয় তার উর্বরতা বৃদ্ধিসহ পরিবেশ রক্ষায় পাটের অবদান কম নয়। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারে ২৩৫ ধরনের পাটপণ্যের এক প্রদর্শনী হয়েছিল। পাটকাঠি দিয়ে চারকোল উৎপাদন করলে তা জ্বালানি সমস্যা সমাধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চাল, গম, আটা, চিনিসহ ১৮টি পণ্যের মোড়ক ব্যবহারে পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার আদেশ জারি হয়েছিল। ম্যানডেটরি প্যাকেজিং অ্যাক্ট ২০১০ বাস্তবায়ন হলে দেশের বাজারে পাটের বিপুল চাহিদার সৃষ্টি হবে।
করোনা পরবর্তী পরিবেশ সচেতনতার কারণে পাটের সম্ভাবনা বিশ্বব্যাপীই বাড়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হচ্ছে পাটের নতুন বাজার। গাড়ি ও বিমানের ইনটেরিওর ডেকোরেশন এবং সৌন্দর্য বর্ধনে পাট দ্বারা তৈরি পণ্যের ব্যবহার হচ্ছে। বিএমডাব্লিও, ভক্সওয়াগন, টয়োটা, নিশান গাড়ির বহু যন্ত্রাংশ তৈরিতেও পাটের ব্যবহার বাড়ছে। ইউরোপের ২৮টি দেশে একযোগে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেখানে পাট হতে পারে সবচেয়ে ভালো প্রাকৃতিক বিকল্প। এক হিসেবে দেখা যায়, সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৫০০ বিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা আছে। এর ২/৩ শতাংশও যদি পাট দ্বারা পূরণ করা যায় তাহলেও পাট খাতের চেহারা পালটে যাবে। সুতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বাংলাদেশে ভিসকস ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ১২০০ কোটি টাকার ভিসকস আমদানি করা হয় চীন থেকে। দেশের ৫০/৬০টি স্পিনিং মিলে ভিসকস ব্যবহৃত হয়। এই ভিসকস তৈরি করা সম্ভব পাটের আঁশ থেকে।
এতসব সম্ভাবনা সত্ত্বেও পাটশিল্প কেন ধুঁকছিল মৃত্যু যন্ত্রণায়? পাট নিয়ে ভুলনীতি, দুর্নীতি ও লুটপাটের খেসারত কি দেবে সারা দেশের জনগণ? পাটের গবেষণায় অর্থ বরাদ্দে এত কার্পণ্য কেন? পাটের বীজের চাহিদার ৯০ শতাংশের জন্য কেন ভারতের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে? পাট কেনার জন্য কেন সময়মতো টাকা বরাদ্দ করা হয় না? জুলাই-আগস্ট মাসে যখন কৃষকের হাতে পাট থাকে এবং পাটের দাম ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা তখন রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার পাট কেনার জন্য টাকা বরাদ্দ করা হয় না। আবার যখন পাট চলে যায় আড়তদারের কাছে এবং দাম ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকা মন হয়ে যায় তখন পাট কেনার টাকা বরাদ্দ হয়। এতে কৃষকের লাভ হয় না মোটেই কিন্তু কারখানার লোকসান হয় প্রচুর। এর দায় কার শ্রমিকের না নীতিনির্ধারকদের? আবার প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ না করায় পাট ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায় না। ২২টি পাটকলের জন্য ২২ লাখ কুইন্টাল কাঁচা পাট কেনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল কিন্তু কেনা হয় ১৫ লাখ ৬৫ হাজার কুইন্টাল পাট। চাহিদার ৭১ শতাংশ পাট কিনেছিল বিজেএমসি। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল না দেওয়ার দায়িত্ব কেউ নিল না।
পাট নিয়ে লুটপাট ও পাটের সম্ভাবনার কপাট বন্ধ করছে যারা তাদের বিচার কি হবে? একদিকে শ্রমিকের আহাজারি অন্যদিকে কারও কারও লোভে চকচক করা চোখ দুটোই দেখছি আমরা। সরকারি কারখানার বিশাল জায়গা, ২৫টি কারখানায় কমপক্ষে ২৬০০ একর জায়গা যার বাজারমূল্য একেবারে কম করে হলেও ১৩ হাজার কোটি টাকা। রাস্তা, গোডাউন, নদীর ঘাট, যন্ত্রপাতি মিলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ কে বা কারা পাবে? পিপিপি’র নামে রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার এই আয়োজন অনেকদিন দুঃখের সঙ্গে মনে রাখবে দেশের মানুষ। স্বাধীনতার পর পাটের গুদামে আগুন দিয়ে একদল যেমন সুবিধা নিয়েছিল, আজ পাট শ্রমিকদের কপালে আগুন দিয়ে আর একদল লাভের হিসাব কষছে। ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, সস্তা শ্রমশক্তি, কাঁচা পাট উৎপাদন ও সরবরাহের নিশ্চয়তা এসব নিজেদের কব্জা করার জন্য অপেক্ষা করছিল তারা। বাজার অর্থনীতির নামে এই লুটপাটের মহোৎসব দেশবাসী দেখবে দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সঙ্গে। লোকসানের নীতি এবং নেতৃত্ব বহাল থাকল আর উৎপাদনের নায়করা চোখের জল মুছতে মুছতে চলে যাবে প্রিয় কারখানা থেকে। আহারে পাটকল শ্রমিক! তোমাদের দুঃখ অনেকের সুখের জন্ম দিল।
লেখক, রাজেকুজ্জামান রতন
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট ।

