
আ ফ ম মাহবুবুল হক প্রথাগত তারকা ব্যক্তিত্ব নন। প্রচারমাধ্যম তাকে নিয়ে স্বস্তিবোধ করে না, যথা সম্ভব এড়িয়ে চলে। পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসক আইউব খান পতন আন্দোলন ১৯৬৮ থেকে বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামল শুরুর প্রথম পর্বে সক্রিয় ও অন্যতম আলোচিত ছাত্রনেতা ছিলেন আ ফ ম মাহবুবুল।
মাহবুবুল হক যে একটা সময়ের প্রতিনিধিত্ব করতেন, যে সময়টা ছিল পূর্ব বাঙলার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের উত্থানপর্ব, যার ফলশ্রুতিতে স্বাধীন বাংলাদেশ। মাহবুবুল হক ষাটের দশকের উত্তাল সময়ের প্রতিনিধি, যিনি নানা সীমাবদ্ধতাসহ সেই সময়ের প্রতিশ্রুতি সমাজ বদলের অঙ্গীকার সংগ্রাম এর উপর শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকেছেন। তিনি ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র, মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রশিক্ষক, সমাজ বদলের সংগ্রামের আপসহীন-ধারাবাহিক কণ্ঠ। তার সতীর্থরা যেখানে এমপি- মন্ত্রী হওয়ার জন্য লাইন ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন, টলে গেছেন, ভেসে গেছেন গড্ডালিকায়। সেই স্রোতে ভাসা মানুষের দলে ভেড়েননি মাহবুবুল হক। নানা সীমাবদ্ধতা নিয়েও বিপরীত স্রোতে পথ চলেছেন।
মাহবুবুল হক এর জন্ম ও বেড়ে উঠা সাধারণ পরিবারে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা তিনি শিক্ষা বোর্ডে প্রথম কুড়ি মধ্যে স্থান করেন। কিশোর বয়েসে, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি মাহবুবুল হকের । উচ্চ মাধমিক পড়াশুনার সময় তিনি সক্রিয় ভাবে আজকের বাংলাদেশ অঞ্চলে জাতিগত নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরোধী প্রতিবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকার ঘটনা ঘটে ছিল যুবক মাহবুবুল হকের জীবনের প্রথম বাঁকে।
ফলশ্রুতিতে চট্টগ্রাম কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষায় মাহবুবুল হককে অংশ গ্রহণ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সেই সময় নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে কলেজ কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ সময় ছাত্র পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে আশংকায় ছাত্রকে পরীক্ষা দেওয়া থেকে বিরত রাখত। কোন ভাবে কলেজ কর্তৃপক্ষকে ‘ ম্যানেজ ‘ করে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষা বোর্ডে ১৬তম স্থান করেছিলেন আ ফ ম মাহবুবুল হক।
পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হন। স্নাতক পর্ব শেষে সচেতন ভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েই প্র্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন মাহবুবুল হক। তৎকালীন সময়ে এই উপমহাদেশের প্রাতিষ্টানিক শিক্ষায় ভাল এমন অনেক ছাত্র মার্কসবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে শ্রেণীকক্ষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। বামপন্থী আন্দোলন অংশ নিয়ে শ্রমিক – কৃষক এলাকায় গিয়ে সংগঠন করা, বাকী জীবন শ্রমিক কৃষকদের মাঝে কাটিয়ে দেওয়ার প্রবণতা শুরু ১৯২০ এর দশক থেকে। তবে ভারতীয় নকশাল আন্দোলন এই প্রবণতাকে আরো এক ধাপ উস্কে দিয়েছিল , অনুপ্রাণিত করেছিল। ভাল ছাত্র হওয়ার পরেও শিক্ষা জীবন সমাপ্তি টানার পিছনে মাহবুবুল হককে নকশাল আন্দোলন কি পরিমান প্রভাব ফেলেছিল তা জানার কোন সুযোগ নেই। কারণ মাহবুবুল হক এই সম্পর্কে তেমন কিছু লিখে যাননি । ষাট -সত্তর দশকের রাজনীতি, শিল্প সাহিত্য, প্রতিবাদী মানুষদের মধ্য নকশাল আন্দোলনের প্রত্যক্ষ- পরোক্ষ প্রভাব অস্বীকার কোন উপায় নেই।
ভাল ছাত্র হিসেবে ভাল চাকুরী, কিংবা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার দিকে তিনি যাননি। নিজের পরিবারের সামাজিক অবস্থান উন্নত করার দায়িত্ব কর্তব্যকে দেশের অন্য দশ জন মানুষের উন্নয়নের সাথে একাকার করে দেখেছেন। মাহবুবুল হকের রাজনীতি শুরু হয়েছিল ১৯৬২ সালে তদানীন্তন পাকিস্থানী সরকারের বৈষম্য মূলক শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার দাবীতে। যুবক মাহবুবুল হক জাতি গত নিপীড়ন, সমতা ও সম- মর্যদার চিন্তার সাথে জড়িয়ে পড়েন। এই ধারাতেই স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ, মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে জাসদ গঠনের সাথে জড়িত হন ।
মাহবুবুল হক মার্ক্সবাদদের ভিত্তিতে একটি শ্রমিক শ্রেণীর দল গড়তে স্বচেষ্ট ছিলেন ।এই প্রচেষ্টা মারাত্মক ভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিপ্লবী মার্ক্সবাদী দর্শনের ভিত্তিতে জন ভিত্তি সম্পন্ন রাজনৈতিক দল গড়ে উঠার সম্ভবনা দেশে – দেশে প্রযোগিক ও দার্শনিক সংকটের মুখোমুখী। দল গঠনের প্রায়োগিক ও দার্শনিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেননি মাহবুবুল হক। তবে তিনি হাল ছেড়ে দেন নি, জীবনের শেষ কর্ম দিবস পর্যন্ত লড়াই সংগ্রামের সাথে ছিলেন। সকল প্রতিকূলতার মাঝে মাহবুবুল হক সম- সমাজ গঠনের লড়াইয়ের সাথে নিজেকে যুক্ত রেখে ছিলেন। ইতিহাসে ভূমিকা রাখা অন্য দশ জন মানুষের মত মাহবুবুল হকের সমাজ ও রাজনৈতিক ভাবনা নির্মোহ ভাবে বিচার মূলক পর্যালোচনার দাবী রাখে।
২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর রাতে মাথায় মারাত্মক আহত অবস্থায় কে বা কারা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেখে গিয়েছিল তা জানা যায়নি। অনেকে এ ঘটনাকে মৌলবাদীদের আক্রমণ হিসেবে মনে করে থাকেন। তবে এ নিয়ে কার্যকর প্রচার আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। মাহবুবুল হক হত্যা প্রচেষ্টার বিচারের বাণী – দাবী পথ হারিয়েছে অনেক আগেই।
২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর, মাহবুবুল হক কানাডাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ঢাকায় মাহবুবুল হক এর স্মরণ সভায় উপচে পড়া প্রাক্তন রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের সমাগম ছিল ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসের কোন এক পড়ন্ত বিকেল বেলায়। মাহবুবুল হকের রাজনৈতিক চিন্তা ও স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য স্মরক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ফেব্রুয়ারী ২০২০।
ফেলে আসা দিনের স্মৃতি কথা বর্তমান সামাজিক -অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের উপর দাঁড়িয়ে লেখা হচ্ছে। বর্তমান সামাজিক অবস্থান পুরানো স্মৃতিকে নানান রঙের আভায় উদ্ভাসিত করে। ১৯৭৪ সালে মিছিলে গুলিবিদ্ধ নেতা, কারারুদ্ধ রাজনৈতিক নেতা কর্মী যখন দৃশ্যতঃ পক্ষ পরিবর্তন করেছেন । এই নেতা কর্মীদের ফেলে আসা দিন গুলোর স্মৃতিতে বর্তমান সময়ের অবস্থানের সাফাইয়ের প্রতিচ্ছবি ঝেড়ে ফেলা সম্ভব হবে না।
২০ নভেম্বর ২০১৭,ঢাকায় মাহবুবুল হক স্মৃতি সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধরী। চিন্তাবিদ হিসেবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্বনাম ধন্য। মাহবুবুল হক যে জাসদীয় ধারার দল করতেন সেই রাজনৈতিক শক্তিকে জনাব চৌধুরী ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তৈরী , লাল পতাকা দিয়ে লাল পতাকা হটানোর যড়যন্ত্র হিসেবে দেখে থাকেন এবং খোলাখুলি ভাবেই মতামত বলতে অভ্যস্থ। মাহবুবুল হক স্মরক গ্রন্থে প্রায় পঞ্চাশ পৃষ্টার লেখায় জাসদ সম্পর্কে একই চিন্তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
মাহবুব স্মরক গ্রন্থ ‘যে জীবন জনতার’ স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন ও পাঠ উন্মোচন করেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। এই অধ্যাপকের সাথেও বামপন্থার কোন যোগাযোগ নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধত্তোর নানান কিছিমের স্বৈর-শাসনের বিরুদ্ধে যাদের কোন অংশ গ্রহণ নেই তাদের কাছ থেকে স্বীকৃতি – সার্টিফিকেট নিয়েই মাহবুব হকের বিপ্লবী হতে হচ্ছে।
স্মরক গ্রন্থে অনুপস্থিত হচ্ছে মাহবুবুবুল হকের রাজনীতি।মাহবুবুল হক ভাল ছাত্র ছিলেন, এর উল্ল্যেখ অনেক লেখাতে আছে। কিন্তু কোন আদর্শ, কিসের নেশায় শ্রেণীকক্ষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন এমন বিষয় গুলো নিয়ে কোন আলোচনা নেই। জাসদ – বাসদের খন্ড-বিখন্ডতা, প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত রাশিয়ার পতন, চীনা সমাজতন্ত্রের উল্টো পথে যাত্রার এর মত ঘটনার পরেও কেন তিনি বিপ্লবী মার্ক্সবাদী আন্দোলনের সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন এমন বিষয় গুলো এই স্মরক গ্রন্থে নেই।
স্মরক গ্রন্থের লেখকদের প্রধানত চার ভাগে ভাল করা যায়। প্রথম ভাগ বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা, যেমন – রাশেদ খান মেনন, আ স ম আব্দুর রব ,মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখ। দ্বিতীয় ভাগে বামপিন্থী বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত , সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী , আনু মোহাম্মদ এর মত বাম ঘরনার বুদ্ধিজীবীদের। তৃতীয় ভাগে রয়েছে জাসদীয় ধারার রাজনৈতিক সহকর্মীদের লেখা। চতুর্থ ভাগে রেখেছেন মাহবুবুল হকের পারিরারিক সম্পর্কিত মানুষেরা লেখা। অধিকাংশ লেখা সহজ ও সুখ পাঠ্য। বাক্য গঠনের নিপুণতা ও শব্দের গাঁথুনি প্রশংসনীয়। পড়তে ভাল লাগলেও বক্তব্যের অনুপস্থিতিতা স্পষ্ট হয়ে উঠে।
এই বইয়ে শেষের অংশে মাহবুবুল হককে কবর স্থান মোনাজাতরত অবস্থার ছবি ছাপানো হয়েছে। ২০০৪ সালে মাহবুবুল হককে হত্যার প্রচেষ্টা চালানো হয়, তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও মাথায় আঘাতের কারণে স্মৃতি ভ্রষ্ট হয়ে যান। পরবর্তী বছর গুলো স্মৃতি শক্তিরহিত ও সীমিত বাকশক্তি নিয়ে বেঁচেছিলেন। এই ফটোটি সেই সময় কালের।
মোনাজাতরত ফটো প্রকাশ কি কোন কাকতলীয় বিষয়? না সে রকম কিছু নয়, বর্তমান সময়ের প্রতিচ্ছবি মাত্র। মুক্তিযোদ্ধা, জেল জুলুম সহ্য করা বিপ্লবী, সামান্য ধর্ম কর্মে আছেন এই মাহবুবকে মধ্যবিত্তের পাতে দেওয়া যায়। এমন বই মধ্যবিত্তের ড্রইরুমের বইয়ের তাকে ঠাঁই দেওয়া যায়। এমন মানুষেরাই এই স্মরক গ্রন্থ প্রকাশে হাত দিয়েছেন।
স্মরক গ্রন্থে ‘ মাহবুব রচনা ‘ শিরোনামে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, বই ও রাজনৈতিক দলের প্রকাশনা থেকে মাহবুবুল হকের লেখা গুলো একত্রিত করে প্রকাশ করা হয়েছে, পৃষ্টা ৪৫১-৪৮৯। প্রশসংনীয় উদ্যোগ। তবে এই স্মরক গ্রন্থের পাতা উল্টালেই চোখ আটকে যায় গ্রন্থ স্বত্ত্ব দাবীর সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ দেখে। পুরো বইটির গ্রন্থ স্বত্ত্ব দাবী করে নাম ছাপিয়েছেন সম্পাদনা পরিষদের একজন।রাজনৈতিক দলের রিপোর্ট ব্যাক্তিমালিকানায়!
স্মরক গ্রন্থে যে সমস্ত লেখা এসেছে তার বড় অংশই নিছক ব্যাক্তিগত স্মৃতি, মাহবুবুল হক ভাল ছাত্র ছিলেন, পারিবারিক বা ব্যাক্তিগত সম্পর্ক সামনে এসেছে। জন- ইতিহাস লিখতে এই সব লেখার গুরুত্ব রয়েছে। ছোট খাটো ঘটনায় উঠে এসেছে অনেক গুরুত্ব কথা। যারা সাব-অল্টার্ন ইতিহাস নিয়ে কাজ করবেন তাঁদের কাছে এই লেখাগুলির মূল্য অন্য লেখা গুলার থেকে ভিন্ন হবে। এই স্মরক গ্রন্থের রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ, লেখক সাংবাদিকদের লেখা আমার আলোচনার বিষয় বস্তু।
লেখার অপর অংশ একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে মাহবুবুল হককে কাছে থেকে দেখার রাজনৈতিক স্মৃতি। কিশোর বয়সে বাসদ রাজনীতির সাথে আমি জড়িয়ে পড়ি। ‘মন্ত্র মুগ্ধতায়’ ১১/১২ কাটিয়ে দেই। এই পথ চলার পথে মাহবুবুল হকের সাথে পরিচয়। তিনি আমারদের নেতা ছিলেন, আমাদের অনেকের জীবনের ‘চেগুয়েভারা ‘ছিলেন । পরবর্তীতে মাহবুবুল হকের সাথে চিন্তার ও পথ চলার ছেদ ঘটে। চিন্তার ভিন্নতা নিয়ে, নানান টানা পোড়নের মধ্যে মাহবুবুল হকের সাথে যোগাযোগ ছিল তাঁর শেষ কর্ম দিবস পর্যন্ত ।
১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত দলের দপ্তরে কাজের সময় মাহবুবুল হককে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। দলের দপ্তরে কাজের সুযোগ হওয়া কিন্তু ট্রাজেডির অংশ। দলের ভাঙ্গন হচ্ছে সেই ট্রাজেডি। দলের যে কোন ভাঙ্গন দৃশ্যতঃ দুই ভাগ হয় কিন্ত প্রতি ভাঙ্গনেই প্রায় সমান সংখক নিবেদিত কর্মীদের হতাশ ও রাজনীতি বিমুখ হয়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে চলে যায়।
প্রধানতঃ রাজনৈতিক শূন্যতা, নিবেদিত কর্মীর অভাব আমাকে মাহবুবুল হককে কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল। দ্বিতীয়তঃ ছিল আমার আগ্রহ। মাহবুবুল হকের অনুপ্রেণায় নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক বই পড়ার সুযোগ ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। মাহবুবুল হকের সংস্পর্শে সম-সমাজ গঠনের দার্শনিক ভিত্তি আমার মধ্যে তৈরী হয়েছিল তা বর্তমান।
১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত ছিল বাসদ রাজনীতির ক্রান্তিকাল। এই সময় ছিল বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিপর্যয়ের, অসম্মান জনক পরাজয়ের সূচনা লগ্ন। প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নে মিখাইল গর্বাচেভ ক্ষমতাসীন হয়ে মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে ঝুকে পড়ে। শেষ পরিনিতিতে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক দেশ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে ভেঙে পড়ে। লেনিন পরবর্তীতে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি ও রাষ্ট্রে আমলাতন্ত্র জেঁকে বসেছিল। গর্বাচেভের সময় ক্ষয়ে যেতে যেতে অবশিষ্ট থাকা বিপ্লবের অর্জন গুলো পুঁজিবাদের পুনরুত্থানের কাছে হেরে যায়। দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে এই প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশও এই প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন দলের কর্মীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয় , অনেকেই নীরবে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। বাসদ রাজনীতিতে গর্বাচেভের খোলা হওয়ার বিতর্ক দলকে তছনছ করে দেয়।
স্মৃতি কথায় মাহবুবুল হক ও তৎকালীন রাজনীতিকে সামনে আনার চেষ্টা করেছি। তবে গুরুবাদ বা অন্ধ আনুগত্যবাদ থেকে এই লেখা যথা সম্ভব মুক্ত ।

অপু সারোয়ার
লেখক পরিচিতি :
অপু সারোয়ার ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল – বাসদ রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন অপু সারোয়ার । ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত বাসদ সর্মথিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য , দপ্তর সম্পাদক ও সহ – সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞান এর ছাত্র ছিলেন। জেনেরাল এরশাদ সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সময় বিভিন্ন দফায় আড়াই বছর কারাগারে ছিলেন। ১৯৯০ এর দশককে জাপান থেকে প্রকাশিত বাংলা মাসিক বাংলার মুখ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লেখালেখির সাথে যুক্ত। প্রকাশিত বই মার্কসবাদীরা যে উত্তরাধিকার পরিত্যাগ করবে।

