মিথ্যাচার আর বদনাম রটানো: একটি মারাত্মক ক্ষয়রোগ

মোনায়েম খান :কোন সন্দেহ নেই , ইহা স্পষ্ট দিবালোকের মত প্রমান সাপেক্ষ সত্য , আমরা এখন এক অভুতপূর্ব উন্নত বিশ্বে বসবাস করছি । যোগাযোগ ব্যবস্হার বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীকে একটি চক্রবাল গ্রাম হিসেবে পরিনত করেছে । দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বসবাসকারী জনসমষ্টি এখন আর আচেনা অজানা নয় । আধুনিক সামাজিক প্রচার মাধ্যমের বদৌলতে দূরত্ব বহুলাংশে সংকুচিত হয়ে এসেছে। এবং তা আমাদের দৈনিন্দ জীবনের উপর প্রভাব ফেলছে প্রশ্নাতীত , সুফল বয়ে নিয়ে এসেছে বহু মাত্রায় ।

উন্নত যোগাযোগ মাধ্যম এখন মানুষের জীবনের সাথে শক্ত গাঁট চড়া বেঁধেছ , প্রতি মুহুর্ত একটি সমান্তরাল হিস্যা হিসেবে চলমান জীবনযাপনে মুখ্য ভুমিকা পালন করছে । অস্বীকার করার উপায় নেই , সোস্যল মিডিয়া, জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যেমন, প্রয়োজনীয়তাও সার্বক্ষনিক । এবং এই অগ্রসর বিজ্ঞানের জয়যাত্রা আমাদের জন্য অফুরন্ত কল্যান বয়ে নিয়ে এসেছে । এ’তে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয় , অবশ্য কিছু পশ্চাৎপদ অন্ধ লোক ছাড়া ।

এক সময় ছিল যখন সামাজিক প্রচার মাধ্যম বলতে পত্র পত্রিকা আর রেডিও টিভিকে বুঝানো হতো । যা অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ছিল বিধায কিছু অতি ভাগ্যবান লোকই এই সমস্ত গনমাধ্যমে কথা বলা বা লিখার সুযোগ পেতেন । নিন্দিত স্বজনপ্রীতির কারনে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল প্রতিভা অংকুরেই ঝরে পরেছে ধুলোয় । এমন উদাহরণ আছে হাজারও । আমরা তাও জানি ,ভাগ্যাহত লোকগুলো ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে একদম নিরব নিভৃতে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো। ইচ্ছা থাকা সত্বেও মুখ খুলেননি কখনও।

কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পুর্ণ ভিন্ন। এখন নিজের মত প্রকাশের জন্য কোন প্রতিষ্ঠিত গনমাধ্যমের দারস্হ হওয়ার প্রয়োজন পরে না । কোন তোষামোদের অবকাশ নেই , ধর্নার নামে বেল্লাপনা অঙ্গে ধারন করারও প্রয়োজন নেই । কারন এখন টুইটার বা ফেইসবুকের মাধ্যমে তা করতে পারেন। যেহেতু আপনি মত প্রকাশে পরিপূর্ণভাবে মুক্ত , বলতে পারেন স্বীয় মতাদর্শের কথা, করতে পারেন ভাল মন্দের সমালোচনা। তবে তা অবশ্যই হতে হবে গঠনমুলক ,মার্জিতভাবে।ইচ্ছাকৃত অপরকে অাঘাত না করে ।

হাল আমলে প্রচার মাধ্যমের এই প্রসারতা সন্দেহেতীত কল্যান যেমন বয়ে নিয়ে এসেছে ঠিক তেমনি কিছু মানসিকভাবে অসুস্থ লোকদের অশালীন , আপত্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রনোদিত লেখার মধ্যে অপসংস্কৃতির বীজ রুপন করছেন বলে বিজ্ঞমহলে অভিযোগ উঠছে ।বিশেষ করে কিছু অতি উৎসাহী লোক , সমাজের অনেক বরেণ্য লোক ও তাঁদের পরিবার নিয়ে অবান্তর কুৎসা রটানো বা কারও মিথ্যে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করে বিভ্রান্তি চড়ানোর যে ঘৃনিত মানসিকতা লালন করছেন , সামগ্রিকভাবে সভ্য সমাজে তা যেমন গ্রহনযোগ্য নয় ঠিক তেমনি ঐ লোকদের বিবেকের দেউলিয়াত্বই ফরিস্ফুটিত হয় ।

বদনাম রটানো বা মিথ্যে মৃত্যুর সংবাদ ছড়ানোর মধ্যে ভাল কোন কিছু অর্জন করা যায় , এমন ধারনা পোষনকারী লোক নির্ঘাত চরম অন্ধকারে বসবাস করছেন । তাদের বোধশক্তি মৃত, সমাজে বিবাদ বিসংবাদ উসকে্ দেওয়ার জন্য মুলত: এরা সবছেযে বেশী দায়ী। সম্মিলিতভাবে এদের বয়কট করা উচিত।

মনে রাখা ভালো, পরিকল্পিত বদনাম রটিযে কাউকে সমাজে খাটো করা যায় না । সাময়িক সময়ের জন্য ধুম্রজাল সৃষ্টি করা যায়,তবে তা ফানুষ আকাশের মত ঠিকই উবে যায় এক দিন । আর প্রকৃত সত্য যখন জনসম্মুখে উম্মোচিত হয় তখন বদনাম রটনাকারী ব্যক্তিরাই ভৎর্সনার কোপানলে পতিত হয়। কাজেই এমন সরু রাস্তায় না হাঁটাই উত্তম।

ফেইসবুকের আর্শিবাদে অতি সহজে হাজারও নর নারীর সাথে নির্মল বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যায় । খোঁজে পাওয়া যায় হারিয়ে যাওয়া স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কত পুরানো বন্ধু বান্ধবদের । ভাবের আদান প্রদানের মাধ্যমে এক সুদৃঢ় সম্প্রীতির সেতুবন্ধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এসুবাদে আমরা পরিচিত হই কত জানা অজানা জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিদের সাথে । তাঁদের মধ্যে এমন অনেক আছেন যাঁদের বুদ্ধিভিত্তিক লেখার মাঝে দৃষ্টিনন্দন শৈল্পিকতা বিরাজমান , তা থেকে শিখতে পারি অনেক কিছু।

দুনিয়া জ্ঞানার্জনের এক বিস্তৃত ভুমি । ভাল কিছু করা বা শিখার মধ্যে মানুষ জন্মের স্বার্থকতা জড়িত। এ প্রসঙ্গে আমার জান্নাতবাসী পিতাজী বলতেন, ‘আপনার অবস্হান থেকে যৎসামান্য হলেও যদি ভাল কিছু করেন , ফলাফল হিসাবে আপনার আত্মার নৈর্মল্যই প্রতিভাত হবে ‘। কারও প্রতি সহমর্মিতা, সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করার মধ্যে শুধু মনের উদারতা ও সন্তুষ্টিই নিহিত নয় , বরং এতে মন বর হয় আত্মার শুদ্ধচারিতাও প্রকাশ পায় ।

সভ্য মানুষ হিসেবে নুন্যতম মানবীয় দায়ীত্ববোধের প্রতি অবজ্ঞা বা বিমুখ হয়ে যাঁরা হিংসার বসবর্তী হয়ে মিথ্যা সংবাদ আর লোকের নামে বদনাম ছাড়তে ব্যস্ত, তাঁরা কি একবার ভেবে দেখেছেন তাঁদের ঐ নীতিগর্হিত অপচেষ্টার বদৌলতে কি অর্জন করতে যাচ্ছেন ? অধিকিন্তু চারিত্রিক নৈগূন্য ছাড়া ।
কোন লোকের মিথ্যে মৃত সংবাদ বা কারও পরিবার পরিজনের নামে বদনাম রটানো সবছেয়ে নিকৃষ্ট কাজ। এ কাজে যাঁরা ব্রতী, তাঁরা দৃশ্যত: চরম অজ্ঞতার কারনে এমন কদর্য অভ্যাসে আক্রান্ত । তাদের উদ্দেশ্যে বলবো , হীনমন্যতায় সময় নষ্ট না করে ভাল কিছু করেন , সমাজ আপনার কাছে তা আশা করে। একটু ভেবে দেখেন, আপনার মিথ্যচার অার বদনাম রটানোর অভ্যাস যদি আপনার উত্তরসূরিদের মাঝে সংক্রমিত হয় , তবে আপনিই বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আর তখন হয়ত হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকবে না যে আপনি তা শুধরাবেন । কেবল পরাজয়ের গ্লানি আর মর্মদহনই শুধু অবশিষ্ট থাকবে।

লেখক: বৃটেন প্রবাসী উপন্যাসিক , কলামিস্ট।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.