মোনায়েম খান: সদা সত্য কথা বলিও।
মিথ্যা বলিও না।
মিথ্যা বলা মহাপাপ।
অতি পরিচিত এই নীতিবাক্য গুলো, সেই কবে পাঠশালায় অধ্যয়ন কালে শ্রুতি লিপির খাতায় লিখে নিতে হতো। শুদ্ধ বানান আর পরিচ্ছন্ন লেখার উপর ভিত্তি করে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ নাম্বার দিতেন; ভাল লাগতো।
আমি যখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র, তখন আমাদের শিক্ষক ছিলেন জনাব গিয়াসউদ্দিন স্যার। অত্যন্ত বিনয়ী আর উদার প্রকৃতির মানুষ ছিলেন তিনি,স্নেহ করতেন সবাইকে।তাঁর কাছেই মূলত আমরা শ্রুত লিপি জমা দিতাম।স্যার খাতা দেখতেন, ফাঁকে ফাঁকে চোখ তুলে আমাদের পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেন। মৃদু স্বরে নীতিবাক্য গুলো উচ্চারণ করতে করতে আমাদেরকে সত্যবাদী হওয়ার পরামর্শ দিতেন। সেই একই কথা আমার শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতা আর পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা বলতেন।কচি মনে ঐ শ্লোক গুলো দারুন রেখাপাত করতো।একসময় মননে মগজে ঐশী বাণীর মতো পংক্তি গুলো স্বমূলে হৃদয় মন্দিরে প্রোতিথ হয় এবং পথ চলার পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করি।
সত্যবাদীতা এক চরম উৎকৃষ্ট চারিত্রিক গুণাবলী,যা একজন মানুষকে খাঁটি মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিা করতে শক্তি যোগায়।অনাদিকাল ব্যাপী এই অঘোম সত্য বানী গুলো চলে আসছে অপরিবর্তিত ও অবিকৃত অবস্থায়। মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত কোন কিছুই দীর্ঘস্থায়ী হয় না, দাঁড়াতে পারে না বেশি দিন। একদিন ঠিকই ঠুনকো কাচের মতো ভেঙ্গে যায়,পরিনাম হয় ভয়াবহ, বিভৎস।কাজেই সত্য আকড়ে থাকার নামই হল মসৃণ পথে জীবনের সর্পিল রাস্তায় গর্বে পথ চলা এক নির্ভিক সৈনিক।
যুগ থেকে যুগান্তর, সত্য আর মিথ্যার নীরব লড়াই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।অধিকিন্তু, বিভিন্ন উপাখ্যান আর উপমায় আমরা শুনে আসছি, পরিকল্পিত প্রতিবন্ধকতার বেড়াজালে কখনও সত্যকে ধাবিয়ে রাখা যায় না। সকল বাধা বিপত্তি চূর্ণ করে সবশেষে সত্যের জয় হয়।এ সবই সত্য কথা, অবধারিতও বটে,কারন অসত্যের প্রতি বিধাতা বিমূখ।এই সূক্ষ সুন্দর কথা গুলোর মধ্যে চিদ্রান্বেষণের কোন জোঁ নেই।সবাই স্বীকার করবে এক বাক্যে।কিন্তু কেন জানি আমার উর্বর মস্তিষ্ক সরলভাবে ঐ নীতিবাক্য গুলো মানতে রাজি নয়। কোথায় যেন একটু ভিন্নতা বা বৈপরীত্য অনুধাবন হয় বিধায় নতুন করে শ্লোক গুলো নিয়ে ভাবতে,বিবেক তাড়া দিচ্ছে।দৈনন্দিন জীবন আর পারিপার্শ্বিকতার ছাপ অবগাহন করে অকপটে স্বীকার করছি, সত্য বলা বা নিজেকে সত্যবাদী প্রমান করার মধ্য আদৌ কোন ফায়দা বা স্বার্থকতা খুঁজে পাচ্ছি না। বরং নিজেকে এক অনাবশ্যক, অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ার সামিল বলা যেতে পারে। আরও একটু পরিষ্কার করে বললে, বলতে হয় সত্যবাদীতা অচিন্তনীয় বিপদ ডেকে আনে, যেহেতু বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় সত্যকে সত্য বলাটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।দৃশ্যত সমাজ জীবনের প্রতিটি স্তর মিথ্যার বেসাতিতে সমুজ্জল – এ উপলব্ধি গুণিজনদের। সত্য এখন চাদরে ঢেকে আছে। তবু কিছু লোক সত্য সুন্দর বলে অবিশ্রান্ত ডাক দিয়ে যাচ্ছে,নিরলশ। কিন্তু আকন্ঠ দূর্নীতি গ্রস্থ সমাজ আর সমাজের সভ্য মানুষ গুলো অবহিত চিত্তে এড়িয়ে যাচ্ছে তাদের আহ্ববান।
এক কাপড় পরিধান করে অফিসে যাওয়া আসার অতিপরিচিত নিরিহ মানুষটি সত্যবাদী। নিবিষ্ট চিত্ত আর নিয়মানুবর্তিতার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, দায়িত্বের প্রতি যত্নশীল,মানব সেবা যাদের ধর্ম,সেই সব মানুষই অবিশ্বাস্য ভাবে সমাজে উপেক্ষিত। অফিসে যে লোকটি “উপরি” আয়ের সংকীর্ণ,স্থূল রাস্তায় হাঁটছে সেই লোক গুলোরই দাপট সবচেয়ে বেশি। সমাজে তাদের স্থান উপরে। এজন্য ব্যক্তি বিশেষে একক ভাবে কারো উপর দোষ চাপিয়ে দেয়ার মূর্খতা বিবেচ্য নয়।কারন পুরো সমাজ ব্যবস্থা এখন পঙ্খিলতা আর মিথ্যাচারের আবর্তে দোল খাচ্ছে।বিচারের জন্য আদালতের দ্বারস্থ জীর্ণ শীর্ণ অসহায় মানুষ চিৎকার করে সত্য কথাটি বলছে,শুনার কেউ নেই।অথচ পরিকল্পিত, সাজানো মিথ্যা সাক্ষীর আলোকে বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে অপরাধী,এ দৃশ্য অতিপরিচিত।সমাজ জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাপক ভাবে সত্যের উপর মিথ্যা-ই জয়লাভ করছে। এবং সমাজের বৃহত্তর অংশ বিবেকের অপমৃত্যু ঘটিয়ে মিথ্যার জয়গান আর জয়ধ্বনি দিতে গলদঘর্ম হয়ে পড়েছে।
ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে মানবতার। সত্যকে ছাপিয়ে মিথ্যার জয়জয়কার চারিদিকে। ভাল মানুষ আজ বড় অসহায়, নির্লিপ্ত ভাবে তাকিয়ে দেখছে অবিচার।অতএব,ইহা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, সত্যকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে কষ্টসাধ্য।নির্ভিক সাহসিকতা প্রমাণের প্রচেষ্টা,যা সবার জন্য সম্ভব নয়।কারন কষ্টসহিষ্ণু ক’জনেরই বা রয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই,”সদা সত্য কথা বলিও” এ নীতিবাক্য গুলো শুধু মাত্র পুস্তকের পাতায় দেখতেই ভাল লাগে। কারন বাস্তব জীবনে তার কোন মূল্য নেই। জানিনা,আদৌ কখনও সত্য মিথ্যার উপর বিজয়ী হবে? ইহা বিস্মিত বিবেকের একটি সংবেদনশীল নিরব প্রশ্ন।
লেখক: বৃটেন প্রবাসী উপন্যাসিক, কলামিস্ট।

