বাংলাদেশের বাজেট এবং আমার কিছু প্রস্তাবনা

আশা করেছিলাম প্রস্তাবিত বাজেটের উপর, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় ব্যাপক আলোচনা হবে। আর স্বাস্থ্য এবং প্রান্তিক- দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দিকে নজর রেখে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো হবে। কিন্তু সরকার তা করলেন না। সংসদে বাজেট আলোচনায়, দুর্ভাগ্য ও দুঃখ জনক ভাবে, করোনা আক্রান্ত হয়ে তিন জন আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতাদের উপর শোক প্রস্তাব ও স্মৃতিচারণ করতেই বেশি সময় নিতে হয়। এর প্রয়োজনীয়তা যে ছিল, তা নিয়ে সমালোচনার কোন প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু, বাজেটের উপর তথ্যভিত্তিক আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রেখে, অনুমোদনের দিনটি আরও দু’দিন পিছিয়ে দিলে অসুবিধাটা কি ছিল? এত তড়িঘড়ি করে এক অসামঞ্জস্যপূর্ণ, বড় ধরনের ঘাটতি  বাজেটের চুড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হলো। সেখানে দেশ  বরেণ্য  অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞসহ অনেকেরই প্রস্তাব বা সমালোচনার কোন মূল্যায়ন করা হলো না।
প্রথম দিনেই, প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু ডিজিটাল আর কিছু মৌখিক উপস্থাপনা, সরাসরি সম্প্রচারিত টিভি চ্যানেলে দেখেছি। আমার তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায়, ফেসবুকে  কিছু লিখেছিলাম। দেখলাম মাত্র কয়েকজন দেখেছেন, কমেন্টসও খুবই কম। অবাক হয়েছি, কারণ আমার দু’টি ফেইসবুক একাউন্টে পাঁচ হাজারের বেশি ফেইসবুক বন্ধু আছেন। কিন্তু, আমার ইনবক্সে দেখলাম, বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক পরিচিত- অপরিচিত, বন্ধু- বান্ধবেরা অনেক কমেন্টস, প্রশংসা, মতামত ও পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ তথ্য প্রযুক্তি আইনে সরকারের সমালোচনা করতে ভয় ভীতির কথাও উল্লেখ করেছেন। লেখাটি বাংলাদেশে প্রচারের জন্য অনুরোধ আসে। শরীরের অবস্থা খারাপ থাকায়, লেখাটিতে আরও সময় দেয়া হয়ে ওঠেনি। তাই আজ আমার পূর্বের লেখার সাথে আরও একটু সংযুক্ত করলাম।
আমি এখনও মনে করি, এই বাজেট একটি উচ্চাভিলাষী, বাস্তবতা বিহীন কল্পনা জগতের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। করোনা প্যান্ডামিক সময় কালীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাবস্থার দিকে মোটেও নজর না দিয়ে, অর্থমন্ত্রীমহোদয় (এখানে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে) ৪,৫% থেকে ৮% পর্য্যন্ত অবাস্তব জিডিপি গ্রোথের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। অথচঃ বিশ্ব অর্থনৈতিক সার্বিক পরিস্থিত, বাংলাদেশের অর্থনীতিটাকে যে কতটা প্রভাবিত করে ও কথটা নির্ভরশীল, তা বুঝতে কোন বড় মাপের অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
আমাদের রপ্তানিযোগ্য যে ক’টি শিল্পখাত রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গার্মেনটসখাত। গার্মেনটস, লেদার বা পাট- পাটশিল্প, সব কিছুই রপ্তানি বাণিজ্যে উপর নির্ভরশীল। তাসের ঘরের মতো ধসে পড়বে, যদি না বিশ্বব্যাপী করোনা প্যান্ডামিক কারণে লম্বা সময়ের জন্য অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা চলতে থাকে।
একই প্রভাব পড়বে রেমিটেনস খাতেও। যা ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। কয়েক লক্ষ প্রবাসী বহির্বিশ্বে বেকার হয়ে গেছে। এখনই সরকারের উপর চাপ রয়েছে, এদেরকে দেশে ফেরত নিতে। ঐ সব দেশের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেলে, অনুরোধ নয়, জোর করে ঠেলে ফেরত পাঠাবে। গর্বের সাথে উল্লিখিত রেকর্ড ব্রেককরা ১৬,৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিটেনস, কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, একবার কি ভেবে দেখেছেন? আর এই দুইখাতে ধস নামলে, আমাদের অস্তিত্ব কোথায় গিয়ে ঠেকবে? শুধু কৃষি খাত থেকে কি দেশের অর্থনীতি রক্ষা করা সম্ভব? ডোমেস্টিক অর্থনীতিও যে ঐ দু’টি বিশেষ খাতের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল!।
এই বাজেটে বিশেষ প্রয়োজনীয় খাতের চেয়ে বরাদ্দের পরিমাণ ও প্রণোদনা, অপ্রয়োজনীয় খাতেই বেশি পরিলক্ষিত। উৎপাদন খাতের চেয়ে উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ বেশি। স্বাস্থ্য খাত, বর্তমান মহামারী দুর্যোগ মোকাবিলায় উপেক্ষিত। যে খাতটি, এমনিতেই উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। প্রায় সাত কোটি নিন্ম আয়ের প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য, এই মহামারী সময়োপযোগী তেমন কোন উদ্যোগ বা ব্যবস্থাপনার কথা এই বাজেটে ফোটে ওঠেনি।
সোসিও ইকোনমির আলোকে ও আদেলে, দেশে অনতিবিলম্বে বিভিন্নমুখী বীমা ব্যবস্থা চালু করতে সরকারের এক্ষুনি উদ্যোগী হওয়া উচিত হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য বীমা। সকল স্থরের, সকল শ্রেণী- পেশার মানুষের জন্য সলিডারিটি স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা । আপাতত সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই বীমা চালু করতে পারলে, দেশের যে জনসংখ্যা রয়েছে, তাতে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বীমা তহবিলকে, অর্থ সঙ্কটের পরিবর্তে উধৃত্ব বাজেটে রূপান্তরিত করা সম্ভব হবে। আমি জানি, বাংলাদেশের জন্য এটি একটি কঠিন কাজ। বিভিন্নমূখী অবকাঠামো উন্নয়ন, ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করা, ইত্যাদি বিশাল কর্মযজ্ঞ এর সাথে জড়িত। কিন্তু আজ না হয় কাল, একদিন তা শুরু করতেই হবে। এখনও দেশের যে অর্থনৈতিক অবস্থা আছে, তাতে অসম্ভবের কিছু নেই। এই অবস্থা ভবিষ্যতে তো আরও খারাপ হতে পারে। আজ চিকিত্সার অভাবে, দেশে সর্বস্তরের মানুষের, এই দুরবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে, উন্নত স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করে স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।
আমি বাংলাদেশকে নিয়ে চিরদিনই একজন আশাবাদী মানুষ। আমাদের অর্জন অনেক। স্বাধীনতার মাত্র পঞ্চাশ বছরের মধ্যে আমরা কোথা থেকে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছি, তা ভাবতে অবাক লাগে। ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট একটি দেশে, আমরা যখন মাত্র সাত বা সাড়ে সাত কোটি মানুষ বসবাস করতাম, তখনও আমাদের সুন্দর ভাবে খেয়ে পরে বাঁচার উপায় ছিল না। দুর্ভিক্ষে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে, অনাহারে- অর্ধাহারে এবং চিকিত্সার অভাবে আমাদের দেশে হাজার হাজার মানুষ মারা যেত। আজ আমাদের সেই ভূখন্ড আরও সংকীর্ণ হয়ে এসেছে; নদী ভাঙ্গনে, সমুদ্র গভীরে হারিয়ে যাওয়া ভূমি; যা আবার সমুদ্র বুকে জেগে ওঠা ভূমির চেয়ে অনেকগুন বেশি। তাছাড়া, ব্যাপক ভাবে শিল্পায়ন ও আবাসনের কারণেও আমাদের চাষাবাদ যোগ্য জমির পরিমাণ অনেকটা কমে গেছে। অথচঃ জনসংখ্যা, সরকারি পরিসংখ্যানের অনেক উর্ধে। অর্থাৎ, আমার মতে বিশ কোটির কম নয়। কিন্তু গর্বের বিষয় হলো, যদি আজকের করোনা প্যান্ডামিক অবস্থাকে বাদ দিয়ে বলি, তাহলে আমার জানা মতে বাংলাদেশে এখন মানুষ আর না খেয়ে, বিনা চিকিত্সায় মারা যায় না। অনেকেই হয়তো আমার এই মতামতের বিপক্ষে অবস্থান নেবেন। এই কয়েক মাস আগেও, আমি একটানা প্রায় দুই বছর বাংলাদেশে ছিলাম। সুতরাং, আমি যা বলছি, তা জেনেশুনেই বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকেই বলছি। বিভিন্ন কাজে- অকাজে দেশের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ঘুরে দেখেছি। গ্রামে- গঞ্জে, যেখানেই গিয়েছি, মানুষের সার্বিক উন্নয়ন চোখে পড়েছে। আমি বলবো না, যে আমাদের দেশে এখন আর কোন দরিদ্র নেই, আর কোন অভাব অনটন নেই। হ্যাঁ আছে। তবে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমার দেখা বাংলাদেশের সাথে তুলনা করলে, তাতে আকাশ পাতাল পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে। গত পনেরো ষোল বছর ধরে ৬-৮% একটানা জিডিপি গ্রোথ, বিশ্বব্যাপী বিরল উদাহরণ।

কিন্তু, আজকের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। অনেকেই ভাবতে পারেন, বাজেট সমালোচনায় আমার পূর্বের বক্তব্যটি সাংঘর্ষীক। না, তা নয়। আমি বাস্তবতার নিরিখেই কথাগুলো লিখছি। যেখানে বিশ্বের সেরা উন্নত দেশগুলি, তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে করোনা প্যান্ডামিক সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে, সামঞ্জস্য খোঁজার চেষ্টা করছে, সেখানে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা তো অন্য কোন গ্রহের কেউ নয়। জার্মানির মত দেশ, তাদের জিডিপি গ্রোথ মাইনাস -৬,৬% ধার্য করেছে। এভাবে স্পেন -১১,১%, ইতালি -১১,৩%, ফ্রান্স -১১,৪% এবং বিশ্বের সেরাদের মধ্যে অর্থনৈতিক দেশ আমেরিকা -৭,৩% মাইনাস হারে তাদের জিডিপি গ্রোথের কথা বলছে। এমন কি চায়না পর্যন্ত মাইনাস -২,৫% হারের কথা ঘোষণা দিয়েছে। সেখানে আমাদের দেশের অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের যাদুর কাটির উৎস কোথায়, তা জানার আগ্রহ আমার অনেক বেশি।

ফজলুর রহমান
আউগসবুর্গ, জার্মানি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.