মোনায়েম খান :আজ ক’দিন হয় বিবেকের সাথে প্রচন্ড মল্লযুদ্ধে জড়িয়ে গেছি।সংকীর্ণচিত্ত লোকগুলোর অনৈতিক, অচিন্তনীয় কর্মকাণ্ড অবলোকন করে নিজের অজান্তে প্রবল ঘেন্নায় মন বিদ্রোহে ফুঁসে উঠেছে। বলছিলাম বাংলাদেশের চাউল চোরদের কথা,মহামারি করোনা রোগের ভয়ে কর্ম ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া স্বার্থপর ডাক্তারদের কথা। দুরনিতিগ্রস্থ প্রশাসন;অসৎ,চাটুকার রাজনীতিক আর ধর্মীয় উগ্রপন্থি দানবীয় মতাদর্শের বিবেকঅন্ধ মোল্লা-পুরোহিতদের কথা।
দ্রুত সংক্রামিত করোনা ভাইরাসের প্রকোপে সারা দুনিয়া স্তব্ধ।অধুনা বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানে অভূতপূর্ব সাফল্যের পরও দুনিয়াশুদ্ধ মানবকুল এই মরণ ব্যাধির কাছে নিদারুণ অসহায়।ইহা দৃশ্যমান যে, উন্নত দেশের ডাক্তার, বিজ্ঞানী কেউ বসে নেই , মরণপণ প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছেন কি করে এই বিধ্বংসী প্রকোপ থেকে জনমানুষকে রক্ষা করা যায়।নুন্যতম চিকিৎসার নিশ্চয়তা দেয়া যায়,নতুন কোন উদ্ভাবনীর মাধ্যমে এই ঘাতক রোগকে স্বমূলে পরাভূত করা যায়।তাঁদের নিরলস প্রচেষ্ঠা সফল হোক, এ প্রত্যাশা আতংকিত দুনিয়াবাসীর।
ডাক্তারি একটি মহৎ পেশা,এ পেশার মানুষের দায়িত্ব পাহাড়সম।ইতিমধ্যে করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা পাশায় নিয়োজিত অনেক মূল্যবান প্রাণ ঝরে গেছে অকালে।নিঃসন্দেহে ,এ পেশার মানুষ মানবতার সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধান্বিত হন না এবং তার একটি অনবদ্য উদাহরণ বৃটেনের এই পেশার মানুষগুলো।
করোনা ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করার সাথে সাথে বৃটিশ সরকার অপ্রতুল ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের ধারণ ক্ষমতা তড়িৎ বৃদ্ধির লক্ষ্যে অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার,নার্সদের পুনরায় কাজে যোগদানের জন্য একটি মানবিক আবেদন রাখলে ;দেশের প্রয়োজনে,মানুষের প্রয়োজনে প্রায় বিশ হাজার অবসরপ্রাপ্ত মানবতার কর্মী আশুবিপদ উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বস্ব কাজে ফিরে আসেন স্বগর্বে।সেই সাথে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ স্বেচ্ছাসেবী এগিয়ে আসেন দুঃস্থ মানুষের সেবাদানে।নিঃসন্দেহে মানবতার এক উজ্জল দৃষ্টান্ত বৃটিশ জনগণ আর একবার সৃষ্টি করলো।
পক্ষান্তরে বাংলাদেশের এই মহতি পেশার উল্লেখ্যযোগ্য মানুষ নির্লজ্জ,নির্মম আর কাপুরুষের মত পশ্চাৎপথে পালিয়ে গেছে মহামারি আক্রান্ত অসহায় মানুষের পাশ হতে।খবরে প্রকাশ,অনেক নামী-দামী ডাক্তার নিজের চেম্বার আর ক্লিনিক নামের কসাইখানায় তালা ঝুলিয়ে কেতাদুরস্থ শেয়ালের মত গভীর গর্তে লুকিয়ে গেছেন।এই অমানবিক ডাক্তারদের আধিপত্য দেশ জুড়ে,ক্লিনিক নামের গলাকাটা ব্যাবসার সাথে কোন না কোন ভাবে ওদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।ঘৃণিত এই দোকানগুলোতে চিকিৎসার নামে সাধারন মানুষ প্রতারিত হচ্ছে,এই উপলব্ধি দেশবাসীর।প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন দস্যুবৃত্তি চলছে অথচ কর্তাব্যাক্তিরা কিছু বলার বা প্রতিকার করার কোন অভিপ্রায় দেখাচ্ছেন না।তাদের এই উদাসীনতার মর্মাথ কি,একজন বিবেকসম্পন্ন ব্যাক্তিমাত্রই অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এখন শঙ্কিত মাত্রায় চোর-বাটপারদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।অভূতপূর্ব ত্যাগ তিতিক্ষা আর প্রলম্বিত বীরত্বের জয়গাথার দেশ চাউল চোরদের কলঙ্ক কালিমায় গৌরবজ্জ্বোল অতীত প্রশ্নবিদ্ধ।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে প্রায় প্রতিদিন চাউল চোরদের কুকর্মের কথা জনসমক্ষে উন্মোচিত হচ্ছে।অথচ কর্তাব্যক্তিরা আইনানুগ কোন ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে এক নীরব দর্শকের ভূমিকায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন।
দেশের প্রায় প্রতিটি মহল্লা,গ্রাম,ইউনিয়ন থেকে প্রমাণ সাপেক্ষ সুনির্দিষ্ট ত্রাণের চাল চুরির অভিযোগ আসছে,এবং সর্বক্ষেত্রে চুরির সাথে জড়িতরা হচ্ছেন দেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি,নেতা-নেত্রী ও পাতি নেতা।বিজ্ঞজনের অভিমত,এই মহা দুর্যোগে ত্রাণের চাল চুরির ঘটনা এযাবৎ কালের সবচেয়ে নিন্দিত আর ন্যাক্কারজনক এক কালো অধ্যায় হিসেবে দেশের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে রবে।
আমার অনুসন্ধিৎসূ মনে একটি অতিসংবেদনশীল,স্পর্শকাতর প্রশ্ন প্রচণ্ড ঘূর্ণাবতর সৃষ্টি করেছে।আচ্ছা, এই যে বিষদুষ্ট,বেশরম চাল চোর ওরা কি কোন সভ্য পরিবার ভুক্ত নয়।এদের কি মা-বাবা,ভাই-বোন,ছেলে,মেয়ে নেই।নিশ্চয়ই অতিআপনজন কেউ না কেউ আছেন।চুরির চাল আর পাপক্লিষ্ট অসৎ উপার্জনের মাধ্যমে যাদের ভরণ পোষণ করছেন তারা কি নূন্যতম একটি বারও জিজ্ঞাসা করেন না, চাল আর পয়সার উৎস কোথায়।
সবমিলিয়ে দেশের রাজনীতির ভাগ্যাকাশে একটি অশনি সংকেত প্রজ্বলিত অগ্নিগিরির মত প্রতিভাত হচ্ছে।সমস্যা জর্জরিত দেশে নেতা-নেত্রীর আচার-আচরণ আর বেফাঁস কথাবার্তার তীব্রতা নৈরাজ্যের সুনামী বয়ে নিয়ে এসেছে।সেই সাথে স্বস্ব আখের গোছানোর নিমিত্তে শব্দ চয়নে নেত্রী তুষ্টি আর পদলেহনের নগ্ন প্রতিযোগিতা বর্ধিত রাজনীতির পরিমণ্ডলে বুদ্ধিদুষ্ট বেল্লাপনা পরিদৃষ্ট হচ্ছে।বস্তুত রাজনীতি এখন ব্যক্তি কেন্দ্রিক আর তোষামোদকারীদের পকেট বন্ধি হয়ে পরেছে।দেশের অনাগত ভবিষ্যৎ মেঘাচ্ছন্ন,এতে কোন সন্দেহ নেই।বলা মুশকিল এই পরিস্থিতির আদৌ কোন উত্তরণের পথ রয়েছে কি না?
করোনা মহামারির ছোবলে সারা বিশ্ব থমকে দাঁড়িয়ে গেছে।ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তায় ভুগছে পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় মানুষ।বাংলাদেশেও এ প্রকোপের বৃস্তিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে।এমনি যখন অবস্থা ঠিক তক্ষুনি দেশের কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন মোল্লা,মৌলভী মহামারিকে পুঁজি করে অলিক প্রবচন প্রধানের মাধ্যমে অন্ধবিশ্বাসী অনুসারীদের মধ্যে সরকারের প্রতি ঘৃণার বিষবাস্প ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হচ্ছেন।হুজুরদের অসংলগ্ন,অযৌক্তিক নসিহতে সিক্ত হয়ে আম জনতার এক উল্লেখযোগ্য অংশ সরকার গৃহিত করোনা মোকাবেলা করার বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার মত মূর্খতা বা ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন।
শুধু বাংলাদেশ নয়,পুরো বিশ্ব এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।এক অদৃশ্য শত্রুর সাথে লড়াই করছি আমরা।এমতাবস্থায় সম্মিলিতভাবে সকলের সহযোগিতা অপরিহার্য।সকল মত পার্থক্য ভুলে একই ছাতার নিচে কাজ করা এখন সময়ের দাবী।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য দেশের কিছু মোল্লা মৌলভী উলামা সম্প্রদায়ের মধ্যে দৃষ্টিকটু বিভাজন রেখা টেনে রেখেছেন।দ্রান্ত মোল্লাবাদের বিস্তৃতি লাভ অদূর ভবিষ্যতে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে,ইহা নিশ্চিত।ভিন্ন মত ও পথের জনগুষ্টি নিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে মধ্যযুগীয় উগ্র মোল্লাবাদের পরিব্যাপ্তি প্রতিরোধ করা অপরিহার্য।আর সে দায়িত্ব দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের।
পরিশেষে দেশের দায়িত্বজ্ঞানহীন ডাক্তার,দুর্নীতিগ্রস্থ প্রশাসন,বেহায়া চাল চোর,তোষামোদপ্রিয় নেতা-নেত্রী আর বাগাড়ম্বরকারী মোল্লা মৌলভীর প্রতি আবেদন,দুনিয়ার এই দূরসময়ে সকল প্রকার হীনমন্যতা আর শকুনি স্বভাব পরিত্যাগ করুন।দোহাই,সকল অপকর্মের বিপরীতে স্বীয় বিবেক বিজয়ী করবেন,এ দাবী সকলের।
লেখকঃউপন্যাসিক,কলামিষ্ট।

