ড: কানন পুরকায়স্থ: ভাইরাসজনিত মহামারী নতুন কোন বিষয় নয় | গত দুই হাজার বছরের মহামারীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ইতঃপূর্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে | বর্তমানে বিশ্বের ২১০ টি দেশে করোনাভাইরাসের একটি ধরন SARS-COV-২ এর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে | তন্মধ্যে প্রায় 2 লক্ষ মানুষ মারা গেছে, প্রায় নয় লক্ষ সুস্থ হয়ে উঠেছে এবং প্রায় ১৯ লক্ষ অসুস্থ অবস্থায় রয়েছে | শতকরা হিসেবে মৃত্যুবরণ ও নিরাময়ের হার যথাক্রমে ২০ ভাগ ও ৮০ ভাগ।
লক্ষ্য করা যায় যে সমস্ত অঞ্চলে বায়ু দূষণ বেশি সেইসব অঞ্চলে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর হার বেশি | যেমন যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহর অথবা ইতালির উত্তরাঞ্চলে, বায়ু দূষণের পরিমাণ বেশি এবং সেখানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর হার বেশি | বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অথবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী প্রতিদিনের ঘর হিসাব অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম-১০ (particulate matter) এর মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম এর বেশি হলে সেই বায়ুকে দূষিত বায়ু হিসেবে চিহ্নিত করা হয় | পিএম-২.৫ এর ক্ষেত্রে এই মাত্রা প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ২৫ মাইক্রো গ্রাম | এখানে উল্লেখ্য পিএম-২.৫ এবং পিএম-১০ হচ্ছে যথাক্রমে ২.৫ মাইক্রো মিটার এবং ১০ মাইক্রোমিটার ব্যাসের বায়ু কণা | এক মাইক্রোমিটার হচ্ছে ১ মিটার এর দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ | তুলনামূলক ভাবে বলা যায় মানবদেহের রক্তে লোহিত কণিকার ব্যাস ১০ মাইক্রোমিটার, যা পিএম-১০ এর ব্যাসের সমান | একইভাবে বায়ুতে অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থের সহনশীল মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে | যেমন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের মাত্রা প্রতি ঘণ্টায় ২০০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার বাতাসে | বাৎসরিক হিসেবে এইমাত্র প্রতি ঘনমিটারে ৪০ মাইক্রোগ্রাম |
ইতালির বলোগ্না বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিওনার্দো শেটি ও তার দল ইতালির উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন শহর ও শিল্পাঞ্চলের বায়ুর নমুনা পরীক্ষা করে সেখানে করোনা ভাইরাসের জিন শনাক্ত করেছেন | গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ থেকে ২৯ শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ সাল পর্যন্ত ইতালির বিভিন্ন প্রদেশের বায়ুর নমুনায় বিদ্যমান পিএম-১০ এর পরিমাণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে এতে সহনীয় সীমার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় পিএম-১০ রয়েছে | গবেষকদল জানিয়েছেন যে সংগরোধ অবস্থা বাস্তবায়নের পূর্বে ইতালির উত্তর অঞ্চলের বায়ু দূষণের মাত্রা অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি ছিল | ওই অঞ্চলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর হার বেশি | পরিসংখ্যানগত ভাবে শেটির গবেষক দল দেখান ইতালির যে সমস্ত প্রদেশে বায়ু দূষণের পরিমাণ কম, সেখানে প্রতি ১০০০ জনে ০.০৩ জন সংক্রমিত হয়েছে, কিন্তু যে সমস্ত প্রদেশে বায়ু দূষণের পরিমাণ বেশি সেখানে প্রতি ১০০০ জনে ০.২৬ জন সংক্রমিত হয়েছে | ইতালির উত্তর অঞ্চলের ৪১ টি প্রদেশের
মধ্যে ৩৯ টি প্রদেশের বায়ুতে উচ্চমাত্রার পিএম-১০ পাওয়া গেছে এবং ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে ৬৬ টির মধ্যে ৬২ টি প্রদেশেই নিম্নমাত্রায় পিএম-১০ পাওয়া গেছে | শেটির গবেষণা থেকে আরও জানা যায়, যে অঞ্চলের বায়ু দূষণের পরিমাণ যত বেশি সে অঞ্চলে করোনাভাইরাস এর জনন হার (Reproductive rate) ততবেশি | তিনি উল্লেখ করেন বায়ুদূষণ ভাইরাসকে বহনের সহায়ক তার ভাষায়- ‘The pollution particle is like a micro-airplane and the passengers are the droplets.’ শেটি এবং তার গবেষক দল মনে করেন রোগ বিস্তারের মডেলে শুধুমাত্র শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত বিন্দু কনা এবং সামাজিক দূরত্বের কথা ভাবলেই হবে না |
গত ৬ এপ্রিল ২০২০ সালে ইতালির ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত গবেষক মারিও কোশিয়ার প্রতিবেদন থেকে জানা যায় কোন ভাইরাসের সংবহন দু’ভাবে হতে পারে |এক, বায়ু দূষণ থেকে মানুষে সংক্রমণ, দুই, মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ | কোশিয়ার গবেষণাপত্র থেকে আরও জানা যায় যে মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংবহন এর ক্ষেত্রে বায়ুদূষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে | কারণ কোন শহরের বায়ুতে যদি বছরের ৫০ দিনের বেশি সময় পিএম-১০ এবং ওজোনের মাত্রা সহনীয় পর্যায় থেকে বেশি হয় অর্থাৎ পিএম-১০ এর ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম এর বেশি এবং ওজোনের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটারে ১০০ গ্রামের বেশি হয় তাহলে সেই শহরে ভাইরাসের বিস্তার বেশি হবে | কোশিয়া এবং শেটির গবেষণা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে রোগ বিস্তারের মডেলে বায়ুর মাধ্যমে ভাইরাসের সংবহন কে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি | কারণ বায়ু দূষণ করোনাভাইরাসের সংবহনে সহায়তা করে |
গত ১৫ এপ্রিল ২০২০ সালে নেচার গ্রুপের জার্নাল ‘এস এন্ড কম্প্রিহেনসিভ ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’ এ লুইগী ও পাওলোর গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় ২০০২ সালে চীনে যখন সাস ভাইরাসের সংক্রমণ হয় তখন এই ভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের কারণ হিসেবে বায়ু দূষণ কে সনাক্ত করা হয় | চীনের পাঁচটি প্রদেশের বায়ু দূষণের সূচক বা API এর সাথে সাস ভাইরাসের হারের মধ্যে সরলরৈখিক সম্পর্ক পাওয়া যায় | তাছাড়া ইতোপূর্বে ২০০৭ সালে ‘ইনহেলেশন টক্সিকোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত জ্যাসপার ও সিনসিভিসির গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় যে শ্বসনে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ এর সাথে বায়ুতে উচ্চমাত্রার পিএম-১০ সম্পর্কযুক্ত | তাছাড়া বায়ুতে ভাইরাসের সংবহন এর সাথে বায়ুদূষণ ছাড়াও বায়ুর আদ্রতা এবং তাপমাত্রার সম্পর্ক যুক্ত | গবেষণায় দেখা যায় বায়ুর তাপমাত্রা এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি হলে ভাইরাসের সংবহন তুলনামূলক হারে হ্রাস পায় | শেটি উল্লেখ করেন যে ০.১-১মাইক্রন এর বায়ু কনা (droplets)যখন দূষিত বায়ু কনা যেমন পি এম-২.৫ এর সাথে মিশে তখন তা দ্বারা ভাইরাসের সংবহন অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে | আমার প্রাক্তন সহকর্মী বৃষ্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জনথন রিড জানিয়েছেন, ক্ষুদ্র বালুকণা যখন বাতাসে ভাসমান অবস্থায় থাকে তখন তা ভাইরাসের বহনকারী হিসেবে কাজ করতে পারে | তবে এ নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে |
প্রশ্ন হচ্ছে করোনাভাইরাস দেহকোষে প্রবেশ করার পর যেভাবে বিস্তার করে দেহের বাইরে অন্য ভাবে বিস্তার করে | ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল এক পরীক্ষায় দেখেছেন যে যাদের ডায়াবেটিস, হূদরোগ বা হাইপার টেনশন রয়েছে, তাদের দেহকোষে ACE 2 প্রোটিন কোষ বেশি | এই প্রোটিন দেহকোষে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে | কারণ এই ভাইরাস ACE 2 প্রোটিন কোষের সাথে এক ধরনের বন্ধন তৈরি করে, যা থেকে মুক্ত হতে অনেক সময় লাগে এবং রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ দ্রুত কমে যায় | মানব দেহ কোষে এই প্রোটিন কে সংদমন করার জন্য ড্রাগ তৈরীর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন |
সর্বোপরি যে সমস্ত অঞ্চলে বায়ু দূষণের পরিমাণ বেশি সেখানে করোনাভাইরাস এর বিস্তার রোধ কল্পে শুধুমাত্র সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পরাকৌশল গ্রহণ করলে সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না | আগামী দিনে ভাইরাসজনিত রোগের বিস্তার রোধ করতে বায়ু দূষণের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে ।
লেখক: ড: কানন পুরকায়স্থ, যুক্তরাজ্যে কর্মরত পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা এবং অধ্যাপক।

