শহীদ ডা. তাহসিন খ্রিসাত। করোনা মহামারির চলমান মহাযুদ্ধে আমাদের ইতালিতে অভিবাসীদের মুখ উজ্জ্বল করা আরেক দুঃসাহসী যোদ্ধা। ভয়ংকর জীবাণু কোভিড-১৯ সংক্রমণের শিকার রোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজেই শাহাদাত বরণ করলেন উত্তর ইতালির লোম্বারদিয়া বিভাগে বাংলাদেশি অধ্যুষিত অন্যতম প্রভিন্স ব্রেশা’র এই খ্যাতিমান পারিবারিক ডাক্তার (জিপি)। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে উচ্চশিক্ষার্থে ইতালি এসেছিলেন সেদিনের মেধাবী তরুণ তাহসিন। পাদোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়াশোনা শেষ করে ইতালিতেই ব্রেশা প্রভিন্সে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। ৬৮ বছর বয়সে মৃত্যুর ঠিক আগের দিনও অসুস্থ মানুষের সেবায় নিবেদিত ছিলেন প্রবল আত্মত্যাগী চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ভিন্ন মেজাজের এই মানুষটি।
ডা. তাহসিনের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কন্যা দানিয়া জানান,”করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর বাবা তাঁর রোগীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে খুব কাছ থেকে সেবা দিতেন। সেফটি মাস্ক এবং গ্লাভস ব্যবহার করলেও হয়তো বয়সের কারণে বাবার জন্য তা পর্যাপ্ত ছিলো না। বাবা যাঁদের বাসায় নিয়মিত যেতেন তাঁদের কয়েকজন কোভিড-১৯ পজিটিভ ছিলো”।
দানিয়া খ্রিসাত আরও জানান,”বাবার মধ্যে যখন করোনার লক্ষণ প্রকাশ পায় তখনও রোগীদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেননি। আমরা বলা সত্ত্বেও নিজের চিকিৎসা নেননি। বাবা আসলে একটু অন্য মেজাজের ছিলেন। নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিজে নিতে দেখেছি তাঁকে আজীবন। গত ১৯ মার্চ খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে বাবাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায় আমার বড়ভাই ওমর। এম্বুল্যান্স থেকে নামাবার পর বাবা জ্ঞান হারাবার আগে চিকিৎসকরা কয়েকটি প্রশ্ন করারই সুযোগ পেয়েছিলেন। খুব দেরিতে হাসপাতালে আসায় কারো কিছু করার ছিলো না। বাবা চলে গেলেন আমার মায়ের কাছে”। উল্লেখ্য, মাত্র দু’বছর আগে মা’কে হারান দানিয়া। পেশায় নার্স ছিলেন ডা. তাহসিনের স্ত্রী। পেশাগত কর্মস্থলে পরিচয় থেকে প্রণয় এবং ধর্মান্তর৷
ডা. তাহসিন ব্রেশা প্রভিন্সে স্থানীয় ইতালিয়ানদের কাছে ছিলেন তুমুল জনপ্রিয় একজন ডাক্তার। কারণ ঔষধ লিখে দেয়ার আগে কৌতুক হাস্যরসের মাধ্যমে রোগীকে মানসিকভাবে সুস্থ করে তুলতেন তিনি। ৪০ বছর ধরে ব্রেশাতে আর্তমানবতার সেবা করে গেছেন তিনি। অভিবাসীদের যে কোন বিপদে খুব আপন ছিলেন পরোপকারী এই মহান চিকিৎসক। দানিয়া আরও জানান,”সাবধানে থেকে নিজের যত্ন নেয়ার জন্য জীবনের শেষ দিনগুলোতে বাবাকে যখনই কিছু বলেছি, বাবার একটাই উত্তর, মানুষের পাশে থাকার জন্য আমি চিকিৎসক হয়েছি। মহামারির সময় আমাকে দ্বিগুণ কাজ করতে হবে”।
মহামারিতে দ্বিগুণ কাজ করতে গিয়ে মহাকালের অনন্ত অসীমে চলে যাওয়া শহীদ ডা. তাহসিন খ্রিসাত স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির কাছে ছিলেন ‘ভয়েস অব ইসলাম’। ব্রেশা নগরীর ইসলামিক কালচারাল সেন্টারের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন। মরহুমের জানাজা এবং দাফন গত ২২ মার্চ স্থানীয় মুসলিম গোরস্থানে সম্পন্ন হয়। যুদ্ধের ময়দানে জীবন উৎসর্গকারী অকুতোভয় এই চিকিৎসকের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি আমরা। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা আমাদের। শহীদানদের মৃত্যু নেই, তাঁরা অমর।
◾ মাঈনুল ইসলাম নাসিম ◾
(ইতালি প্রবাসী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক)

