একদিন ছুটি হবে—–

একদিন ছুটি হবে—–

করোনা আতংকে চারদিকে একটি দমবন্ধ পরিবেশ বিরাজ করছে।সারাদেশ অচল হয়ে আছে।সরকারি বেসরকারি সকল অফিস বন্ধ।মানুষ বেশ আতংকিত। হবারই কথা।কেননা এর কোনো গ্রহণযোগ্য ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা পদ্ধতি এখনে আবিষ্কৃত হয়নি।তাইতো করোনা আক্রান্ত ব্যাক্তির কাছে কোনো স্বজনরাও যেতে সাহস পাচ্ছেনা, লাশ নেওয়ার মতো কেউ নেই, লাশের গোসল, জানাজা কিংবা কবর- সবকিছুই হচ্ছে সংক্ষিপ্ত আকারে, নিভৃতে নিরবে, বিশেষ ব্যবস্থায় কোনো আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতি ছাড়াই! পৃথিবীজুড়ে অনেক চিকিৎসক- নার্সও এরই মধ্যে সেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, মারাও গিয়েছেন অনেকে। কি ভয়াবহ অবস্থা।কিন্তু এই দুঃসময়েও একজন নার্স হিসেবে আমাকে সকল ঝুঁকি মাথায় নিয়েও রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যেতে হচ্ছে।বাংলাদেশে সরকার ঢাকার যে কটি হাসপাতালকে করোনা ভাইরাস বা কোভিট-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া জন্য নির্ধারন করেছে আমার কর্মক্ষেত্রটি তার মধ্যে অন্যতম।তাই সংগত কারনেই এখানে কাজ করা মানেই সর্বোচ্চ ঝুঁকি নেওয়া।

শুধু আমি নই, আমার মতো অনেকেই বিভিন্ন হাসপাতালে এভাবে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। জানি আমি যে পেশায় আছি অর্থাৎ নার্সিং একটি থ্যাংকসলেস জব! মানুষকে সেবা করাই যেহেতু আমাদের দায়িত্ব তাই আমাদের কাজকে কেউ আলাদা ভাবে মূল্যায়ন করেনা।ডাক্তারদের সাথে যদিও আমাদের কাজের তুলনা হয়না কিন্তু আমরা কি তাদের চেয়ে কম ঝুঁকি নেই? কম পরিশ্রম করি? কম আন্তরিকতার সহিত কাজ করি? কিন্তু তবুও আমাদের কাজের মূল্যায়ন কতটা হয় তা সেটা সকলেরই জানা! নার্সরা সবসময়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।ডাক্তারদের মহানুভবতা নিয়ে কত কবিতা, গল্প, উপন্যাস আছে কিন্তু নার্সদের সেবা কারো মনেই সম্ভবত দাগ কাঁটেনা। এই সমাজ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সময়েও সম্ভবত গ্রেড হিসেব করে! যাই হোক আজ ৩ দিন যাবৎ হাসপাতালে ডিউটি করছি।পুরো সপ্তাই এখানে থাকতে হবে।বাহিরে যাওয়া যাবেনা। খাওয়া ঘুম সবকিছুই হাসপাতালের অভ্যন্তরে। ৭দিন পরে ডিউটে শেষ হলে আবার বাসায় ফিরবো। এগুলো আসলে সবার নিরাপত্তার জন্যই করা হয়।এর বিকল্পও নেই।

নিজের কর্তব্য ও রোগীদের অসহায়ত্বের কথা চিন্তা করে সারাদিনের পরিশ্রম, আতংক, মৃত্যুভয়, নিঃসঙ্গতা সবকিছুকে জয় করতে পারলেও যখনই সন্তানের কথা মনে পরে তখনই পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে।এই ৭টি দিনকে মনে হচ্ছে যেনো অনন্তকাল।ওদের ছেড়ে থাকা প্রতিটি সেকেন্ডকে মনে হয় যেনো একটি বছর, মিনিটকে মনে হয় যুগ আর ঘন্টাকে মনে হচ্ছে শতাব্দীর মতোই দীর্ঘ!

সকল কর্মজীবী মায়েদের মতো আমার সন্তানও আমাকে তুলনামূলক কম কাছে পায়। এতে আমার সন্তান যেমন কষ্টপায় মা হিসেবে আমিও তেমন অতৃপ্ত থাকি।তবুও সন্তানের নিরাপদ ও স্বচ্ছল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বুকের ভিতরের সব কষ্ট পাথরচাপা দিয়েই নিয়মিত অফিস করতে হয়।বিভিন্ন সময় ট্রেনিং সহ প্রয়োজনীয় কাজে সন্তানদের ছেড়ে কিছু সময়ের জন্য দূরে থাকতে হয়েছে কিন্তু তখন শুধু দূরত্বের জন্য সাময়িক কষ্ট পেলেও এমন বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সম্মুখীন কখনো হইনি।শুধু আমি কেনো, আমাদের প্রজন্মের কাউকেই সম্ভবত কখনো মৃত্যভয় এভাবে গ্রাস করেনি! যিনি ফাঁসির আসামি তিনিও হয়তো ফাঁসি কার্য্যকরের কয়েকদিন আগেই তার মৃত্যুর দিনক্ষণ জানতে পারেন।কিন্তু এই করোনা আতংকে সকলেই এতটাই ভিত যে আমরা জানিনা কার ভাগ্যে কখন কি ঘটে! নিজের সম্ভাব্য মৃত্যুতে যতটা না ভয় তার চেয়ে বেশি ভয় সন্তানকে নিয়ে!

তবুও বিশ্বাস করি মানুষ সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ভাইরাসকে রুখে দিতে পারবে। শিগিরই হয়তো করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হবে। তখন হয়তো আবার আমরা দলবেধে বাহিরে ঘুরতে বের হবো, সন্তানের আবদার মেটাতে কোনো বাবা হয়তো গভীর রাতে অনেক খুঁজে দূরের কোনো দোকান থেকে আইসক্রিম নিয়ে আসবে, কেউ হয়তো রিকশায় প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে গলায় ঠান্ডা লাগিয়ে ফেলবে, কেউ হয়তো বিষণ্ণ সন্ধ্যায় নিজের অতীতস্মৃতি রোমন্থন করে চোখ ভেজাবে, সামনের ছুটিতে পাহাড়ভ্রমন নাকি সমুদ্রমন্থন- এটা নিয়ে হয়তো কোনো কোনো পরিবার দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে তুমুল ঝগড়ায় লিপ্ত হবে…..। হ্যা, এমনটাই ঘটবে। তাই হতাশা ছুড়ে ফেলে আমাদের সবাইকে সতর্ক হতে হবে।

বিশ্বাস করুন, শুধু আপনাদের কথা ভেবেই আমরা সবকিছু ভুলে বাসার বাহিরে এসে সমস্ত ঝুঁকি মাথায় নিয়েই রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি।আপনিও আমাদের ও আমাদের সন্তানের কথা ভেবে একটু বাসায় থাকুন। মাত্রতো কটা দিন, দেখবেন সতর্ক থাকলে সফলতা আসবেই!

আসমা আকতার

সিনিয়র স্টাফ নার্স, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.