আতিকের মৃত্যু

 

আতিকের সঙ্গে প্রথম আমার কবে দেখা হয়েছিলো তা আর এখন বলতে পারবো না। ১৯৭৩ সালের সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে আমি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলাম। তখন আতিকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেটা অনেকের সঙ্গে দেখা হবার মতো। আলাদা করে কিছু নয়। আতিককে ভালো করে চিনতে শিখলাম যখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলন শুরু হলো তখন। নয় বছর ধরে চলা আন্দোলনের প্রতিটা ছত্রেই আতিক উপস্থিত থাকতো। অনেক দীর্ঘ হয়েছিল সে আন্দোলন। এরমধ্যে ১৫ দল ভেঙেছিলো। গঠিত হয়েছিলো ৫ দল। আতিক ৫ দলের সহকারি সমন্বয়ক নির্বাচিত হয়েছিলো। ঢাকা মহানগরে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী যে আন্দোলন তা গড়ে তোলার পেছনে তার অবদান ছিল অপরিসীম। তখন ৫ দলের নেতা নির্মল সেন বলতেন, এক আতিক থাকলে আমাদের আর কোন কিছু লাগেনা। কারণ যে কোন কাজ, যত কঠিনই হোক, আতিককে দায়িত্ব দিলে সে কাজ সে করে আসবেই। এই নির্ভরতা জোটের অন্যান্য নেতা খালিকুজ্জামান, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন সহ প্রায় সবারই ছিলো। জোটের আন্দোলন চলাকালে বাসদ ভেঙেছিল। আতিক আমাদের অংশে যোগ দিয়েছিলো। আজ আতিক চলে যাবার পরে হিসাব করে দেখি স্বাধীনতার পর থেকেই এতগুলো বছরে প্রতিটা উত্থান-পতনে, ভাঙ্গা-গড়ায় আতিক আমার সাথে ছিলো। এমনকি আমি যখন রাজনীতিতে থেকেও ব্যবসা করতে নিলাম, গার্মেন্টস কারখানা করলাম তখনো আতিক আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল এবং যতদিন আমি ব্যবসায় ছিলাম ততদিন পর্যন্ত আমার সাথেই ছিলো।

৪ এপ্রিল বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলে আতিকের স্ত্রী এবং পুত্র তাকে বাইরের হাসপাতালে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। আতিক তখনও স্ত্রী-পুত্রকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে এটা কিছু নয়, সামান্য ব্যথা। সেরে যাবে। কিন্তু স্ত্রী পুত্র শোনে নি। তারা তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করিয়েছে। ইনস্টিটিউট দুইদিন তাকে আইসিইউতে রেখেছে। দুইদিন ওয়ার্ডে রেখেছে। তারপর ছেড়ে দিয়েছে। ইনস্টিটিউট একটা এনজিওগ্রামও করেনি। কেন তা জানি না। বাড়ি ফিরে এসে দুইদিন পর যখন আবারো প্রচন্ড ব্যথা হয়েছে তখন আর হৃদরোগ ইনস্টিটিউট তাকে ভর্তি করেনি। সে তখন মিরপুর হার্ট ফাউন্ডেশন এবং ইউনাইটেড হসপিটালে চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা তাঁকে ভর্তি করেনি। তাকে যেতে হয়েছে ইব্রাহিম কার্ডিয়াকে সেখানে এনজিওগ্রাম করবার পর একটিতে ১০০ ভাগ , একটিতে ৯০ ভাগ এবং আরেকটিতে ৮০ ভাগ ব্লক ধরা পড়ে। ডাক্তার বলেছে ইমিডিয়েটলি ওপেন হার্ট সার্জারি করতে হবে। তাই করা হয়েছিলো। সে সুস্থ হয়ে উঠছিল সেজন্য তাকে আইসিইউ থেকে ওয়ার্ডে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গতকাল বিকেল থেকে তার প্রেসার পড়ে যেতে থাকে। তখন আবার তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। আতিকের ছেলে প্রত্যয়’কে ডাক্তাররা বলেছেন চিন্তার কিছু নেই। প্রেসার নরমাল হয়ে গেলে তাকে আবার ওয়ার্ডে দিয়ে দিব। উনি বাড়ি যেতে পারবেন। আজ সকাল ৭ টায় টেলিফোনে জেগে শাহিনের কাছ থেকে আমি আতিকের মৃত্যু সংবাদ পাই।
আজ সারাদিন একটা ঘোরের মধ্যে আছি। কিভাবে আতিকের বাড়িতে গেছি, তার জানাজায় অংশ নিয়েছি, এগুলো কিছুই ভালো করে ভাবতে পারিনা। সাথে আমাদের সমন্বয়কারী শহীদুল্লাহ ছিলেন, জিন্নূর চৌধুরী দীপু ছিলেন। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সবকিছু হয়েছে। আমি একবার সরাসরি লাশবাহী ভ্যানের মধ্যে উঠেছি। শেষ দেখা একবার আতিক কে দেখবো বলে।

৫০ বছর একসাথে ছিলাম। সকাল বেলার একটা টেলিফোন সবকিছু কেমন লন্ডভন্ড করে দিলো। এতোদূর চলে গেলো আতিক যেখান থেকে আর কোনদিন ফিরে আসতে পারবেবনা। এখন যে প্রচন্ড ফ্যাসিবাদ চলছে, রাস্তার মধ্যে একটা পোস্টার পর্যন্ত লাগাতে দেয় না, সেই সময় আতিককে পোস্টার লাগাবার দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিত থাকতে পারতাম। জানতাম সকালবেলা আমি সবগুলো পোস্টার ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন জায়গায় দেখতে পাব।
একটা মানুষ কোনদিন বক্তৃতা করতে দাঁড়ায়নি, কোনদিন পত্রিকায়, টেলিভিশন এমনকি ফেসবুকেও নিজের ছবি দেবার চেষ্টা করেনি, পত্রিকায় পার্টির নামে কোনো বিবৃতি পাঠালে বলত আমার নাম কিন্তূ দেবেন না‌; হায় সেই আতিককে আর কোনদিন ফিরে পাবো না।

গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি আমাদের প্রিয় সাথী নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আতিকুর রহমানের প্রতি।

মাহমুদুর রহমান মান্না
আহবায়ক, নাগরিক ঐক্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.