ইতালিয়ান ফটো জার্নালিস্ট লেখক স্টেফানো রোমানো। বাংলাদেশ বাংলা ভাষা বাঙালীর প্রতি তার আগ্রহ সব সময়ের। ইতালির রোমের বাসিন্দা তিনি। পড়ালেখা শেষে কাজ শুরু করেন রোমে বসবাসরত অভিবাসীদের নিয়ে। বিশেষ করে রোম প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে। বিগত দশ বছর ধরে নিবিড়ভাবে দেখেছেন বাংলাদেশকে। পরিচিত হয়েছেন বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে। উৎসাহিত হয়েছেন বাংলাকে জানতে। চেষ্টা করেছেন বাংলা ভাষা শিখতে।
বাংলার প্রতি তার এই টান ফেব্রুয়ারি ও একুশকে ঘিরে আরও প্রবল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে তিনি দীর্ঘদিনের স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন এবারের ফেব্রুয়ারিতে। এসেছেন বাংলাদেশে। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ফটোগ্রাফির উপর লেখা তার ইংরেজিতে অনুদিত বই Sweet Light. বইটির প্রকাশক আগামী প্রকাশনীর জনাব ওসমান গনি।

শুদ্ধস্বর: বাংলাদেশে এসে আপনার কেমন লাগছে?
স্টেফানো রোমানো: বহু বছর ধরে আমি ঢাকার ছবি কেবল দেখেছি জনপ্রিয় ফটোগ্রাফার স্টিভ ম্যাককারির তোলা ছবিতেই। কিন্তু, এখন আমি নিজেই ঢাকাকে নিয়ে বলতে পারি, কারণ আমি এখানে।
গত তিন সপ্তাহে আমার ধারণা ঋদ্ধ হয়েছি, যা কিনা আমি আমার পরবর্তী লেখায় বলতে পারবো।
আমার মতে এই শহরের বিশেষত্ব হলো বিপরীত রঙের বৈচিত্র! ধূসর অট্টালিকা, ধোঁয়া ছাওয়া আকাশ। কিন্তু এখানকার বসবাসকারীদের বাহারি রঙয়ের উজ্জ্বল পোশাক এক অপরূপ বৈপরীত্য। এখানকার নারীরা তাদের উজ্জ্বল পোশাকের সাথে যেন লড়াই করে ধূসরতার। আমি ঢাকার মতো কোথাও দেখিনি, রঙগুলো প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলে সমস্যা সংকুলিত ধূসর জীবনের সাথে।
শুদ্ধস্বর: আপনার ভাবনার ঢাকার সাথে নিজে দেখা ঢাকার কি পার্থক্য দেখতে পান?
স্টেফানো রোমানো: যখন আমি ঢাকার উদ্দেশ্য রওয়া হই আমার কোনো প্রত্যাশা ছিল না। শুধু জানতাম কিছু মুখ দেখতে পাবো, দেখতে পাবো কিছু রঙের মিশ্রণ। রোমে বসবাসরত আমার বাংলাদেশি বন্ধুরা বলতেন, দেখবে ঢাকার মানুষ ভিন্ন, এটা সত্য। এখানে আমি অনেক মানুষ দেখেছি, অনেক রমণীকে দেখেছি শাড়িতে। যারা গ্রাম হতে আসা বা শ্রমিক তাদের শাড়ির ভিন্নতা দেখেছি। রোমে এমন মিশ্র মানুষ নেই। আমি রওনা হয়েছিলাম একটি শূন্য পাত্রের মতো, চাইছিলাম এই সফর আমাকে পরিপূর্ণ করুক। আমি শুধু দু’চোখ ভরে দেখতে চেয়েছি।

শুদ্ধস্বর: বাঙালিদের কোন কোন দিক সবচেয়ে ভাল লেগেছে?
স্টেফানো রোমানো: নিশ্চিতভাবে বলতে পারি ভদ্রতা! তারা সবসময় হাসি মুখে সম্ভাষণ জানায়। এখানে আমি মুখে মাস্ক ব্যবহার করি না। আমার ইতালিয়ান বন্ধুরা আমার উপর ক্ষিপ্ত হন। আমি ভালবাসি মানুষের হাসিমুখ ও চোখের গভীরতা। হাসির গুরুত্ব অনেক এটি শব্দের আগে আসে। সবচেয়ে বেশি হাসিমুখ এখেছি রিকশা চালকদের। ট্রাফিক জ্যামে লাইন ধরে আটকে থাকে। কিন্তু যখনই তাদের চোখে চোখ পড়ে দেখা যায় মুখে বিস্তৃত লাল হাসি (পান হাসি)।
শুদ্ধস্বর: বইমেলায় আপনার বই প্রকাশ হয়েছে? বইটি কোন বিষয়ে? কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
স্টেফানো রোমানো: Sweet Light বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী। বইটি কয়েক বছর আগে ইন্দোনেশিয়ায় প্রকাশিত হয়। বইটি আমার ফটোগ্রাফির দৃষ্টিভঙ্গি, বিগত দশ বছর যাবত রোমে বসবাসকারী অভিবাসীদের নিয়ে কাজ সম্পর্কে আলোচনা করেছে। ফটোগ্রাফি একটি উচ্চ মাত্রার দর্শন যা আমাকে বহু কিছু শিখিয়েছে, আমার জীবনেও। উচ্চ শিক্ষা ও বইয়ের সাথে আমি বহু বছর কাটিয়েছি কিন্তু আমি জেনেছি মানুষ সবচেয়ে বড় বইয়ের ভাণ্ডার।
আমার বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ এ দেশে হয়েছে, আমি বিগত দশ বছর ধরে ছবি তুলি, আমার ছবির বিষয় বাংলাদেশি নারীদের সৌন্দর্য্য ও পোশাক। আমার কাছে তারা অনন্য সুন্দর, তাদের রঙিন পোশাক আমার ভালো লাগে। আমি রঙিন ভালবাসি। কখনো তাদের গভীর কালো চোখ আমার কাছে বাংলাদেশ, আমি কৃতজ্ঞতা বোধ করি।
সুইট লাইট ভালো বিক্রি হচ্ছে। ধন্যবাদ জানাই আগামী প্রকাশনীকে। সেই সাথে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও পত্রিকার সাংবাদিকদের। যারা বইটির প্রচারনায় সার্বিক ভূমিকা রেখেছেন। বইমেলায় বইটির প্রথম মুদ্রণ শেষ।

শুদ্ধস্বর: অমর একুশে বইমেলা আপনার কেমন লাগলো?
স্টেফানো রোমানো: আমি ভীষণভাবে উপভোগ করেছি একুশে বইমেলা। বিশেষ করে খোলা মাঠে মেলা আমাকে আনন্দিত করেছে। আমি আমার জীবনে বড় কিছু বইমেলা দেখেছি, রোম, ফ্রাঙ্কফুর্ট, কুয়ালালামপুর ও জাকার্তায়। তবে ঢাকার এই বইমেলা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একুশের সম্মানার্থে ইংরেজি বই হয়ত কম, তবুও আমি সকলকে বলবো মেলায় আসতে। মেলাটি অনেক সময় লোকারণ্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শুদ্ধস্বর: আপনি তো বিশ্বের অনেক দেশ ঘুরেছেন। সেসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের কোন বিষয়গুলো আপনার বেশি ভাল লেগেছে অথবা খারাপ লেগেছে?
স্টেফানো রোমানো: অনেক ক্ষেত্রেই ঢাকা আমাকে জাকার্তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। একই ট্রাফিক, বিশৃঙ্খল ও দূষিত জীবন। তবে বড় পার্থক্য যা আমি আগেই বলেছি রঙ, রঙের বৈচিত্র ও বৈপরীত্য। যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন কেন আমি বাংলাদেশ সফর করেছি, তবে আমি বলবো রঙয়ের জন্য। এ যেন ইতালিয়ান কবি সিজার পাভেসির কবিতার দু’লাইন, “প্রতি নতুন সকালে আমি রাস্তায় নেমে রঙ খুঁজেছি।”
বিশ্বের অন্যতম ফটোগ্রাফার আলেক্স ওয়েব সাদা কালোয় ক্লান্ত হয়ে কুবাতে তিন সপ্তাহ থেকেছেন, রঙিন সব ছবি তুলেছেন। ঢাকা ঠিক তেমন, বাংলাদেশ তেমন। এখানে রঙিন ও চিত্তাকর্ষক মানুষের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করুন আপনি সব ভুলে যাবেন।
শুদ্ধস্বর: আপনার তো দীর্ঘদিনের ইচ্ছে ছিল একুশে ফেব্রুয়ারির দিন শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। সে ইচ্ছাটা এবার পূরণ করতে পেরে কেমন লাগছে?
স্টেফানো রোমানো: অনেক বছর ধরে আমি রোমে আন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনে আংশ গ্রহণ করছি। রোমে আমাদের একটি শহীদ মিনার আছে। ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্য ফুল দিতে পেরে নিজেকে সবসময় সম্মানিত মনে হয়েছে। যেমন আমি রোমে আমার সকল শিক্ষার্থীদের বলি, যদি সমস্ত পৃথিবী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করে। ভাষার উপর পড়া নিজ ভাষাকেই সম্মানিত করা। যা এসকল কিছু ভাষা শিক্ষার্থীদের জন্য সম্ভব হয়েছে।

শুদ্ধস্বর: আপনার এবারের ঢাকা ভ্রমণ কি পরবর্তীতে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট কোনো কার্যক্রমে সহায়ক হবে?
স্টেফানো রোমানো: নিশ্চিতভাবেই আমি একটি ফটোগ্রাফি এক্সিবিশন করবো। গত তিন সপ্তাহে আমি প্রায় ২৫০০ ছবি তুলেছি। হয়তবা আমিও এলেক্স ওয়েব ও তার কিউবার মতো ছবির বই করবো “আমার ঢাকা” “La Mia Dhaka”
ইটালিয়ান ভাষায় সাক্ষাতকার গ্রহন এবং অনুবাদ করেছেন শুদ্ধস্বর ডটকমের সহকারী সম্পাদক আইরিন পারভীন ।

