করোনা মানেই মৃত্যু নয়

আমরা বীরের জাতি, কেননা যুদ্ধ করে দেশ জয় করেছি, বীর মৃত্যুকে ভয় করে না, মৃত্যুকে অনায়াসেই আলিঙ্গন করে । আমরা মুসলিম ( দেশের বেশিরভাগ ), মুমিন মৃত্যুকে ভয় করে না, কেননা মুমিন মানেই শতভাগ আল্লাহ্রর খাস বান্দা, তাছাড়া তারকাছেই ফিরে যাওয়া, এটাতো গর্বের বিষয়, আনন্দের বিষয় । বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডে আসা যেমন বিধাতার হুকুমে হয়, নিশ্চয়ই যাওয়াতেও তার হুকুম লাগবে । আমরা অভ্যস্ত, শত জঞ্জালের মৃত্যু দেখে, কেননা এই দেশে ঝর/ঝাপটা, বন্যা থেকে শুরু করে এমন কি নাই, যেখানে মৃত্যের মিছিল থাকে না ? এই সবকে প্রতিরোধ করেই আমরা টিকে থাকা মানুষ । আমরা প্রতিদিন দেখছি মৃত্যুর ছড়াছড়ি, কেননা পত্রিকা খুললেই সড়কে মৃত্যু/মৃত্যু আর মৃত্যু ।

আমরা আনন্দ- ফুর্তির জাতি, তুড়ি বাঁজিয়ে অসমেও আকাশকে আলোকিত করতে পারি। আমরা মনে ধারণ না করলেও, মুখে খই ফুটিয়ে বাজিমাত করতে পারি। আমরা শক্তি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দশ হাত দেখিয়ে দিতে পারা জাতি। আমরাই আবার শত বিপদে স্চ্ছোসেবক হয়ে জীবন বাঁজি রেখে লড়তে পারা জাতি। সুতরাং আমরা মৃত্যু ভীতি জাতি কখনোই  না। প্রথম কথা মৃত্যু ভয়ে আতঙ্কিত হলে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে, সবার ভুলের পরিমাণ বেড়ে যাবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত বেশি হবে। নিজেদের দশজনের আতঙ্ক থেকে জাতির ঘাড়ে বেশি বিপদ ডেকে আনা হবে। সুতরাং মৃত্যু ভয়ে আতঙ্কিত হওয়া এই মূহুর্তের জন্য বড় বিপদ। কেননা আতঙ্কিত জনমানুষের দ্বারা সঠিক করণীয়টি হয় না ।

একটু দেখার চেষ্টা করি, কেন মানুষ এতটা আতঙ্কিত হয়ে আছে। ধারণা করি সবার মনে প্রথম ভয়টি যা ঢুকেছে, সেটা হতে পারে, বর্তমানে মৃত্যু মানে লাশের ছতকারটিও ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী সম্ভব হবে না। এমনকি কেউ কবরে নামানোর সাহসী হবে না বা দেশে বর্তমানের প্রচলিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করা  নিয়মে  সেটা সম্ভব নয়। হ্যাঁ কঠিন সত্য হলো বর্তমানে এটাই সত্যি । তাপরেও একটু ভাবুন, কোনটা এই মূহুর্তে বেশি জরুরি ? বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করে বেঁচে থাকার ভাবনা , না মৃত্যুর পরে কি হবে সেটা নিয়ে বেশি ভাবনা ভেবে আতঙ্কিত হওয়া ? সুতরাং কঠিন সত্য হলো, আপনার সঠিক ভাবনাই আপনাকে সুস্থ ও ভালো রাখতে সহায়তা করবে।

ভয়ের ভিন্ন কারণটি হতে পারে, কোথাও চিকিৎসা করে বেঁচে থাকার জন্য চেষ্টা করাটাই বড় সমস্যা । ডাক্তাররা  ভিন্ন কোথাও সাজেস্ট করছেন, নিজেরা করা থেকে বিরত আছেন। না, বিষয়টি মোটেও এমন নয় বলেই মনে করি। মূল বিষয়টি হলো আমাদের দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটাই মূলত দূর্বল । ডাক্তারদের দোষারোপ করা অযথা। ডাক্তার যদি নিজেই সেইফটিতে কাজ না করতে পারে, অবশ্যই একজন ডাক্তার সেটা করবেন না, এটাই স্বাভাবিক । কেননা একজন ডাক্তার অবশ্যই জানেন, এই মূহুর্তে সেইফটিন্যাসটি কতটা জরুরী । ধরুন, একজন ডাক্তার মহানুভবতার কল্যাণে একজন রোগীকে অনিরাপদ অবস্থায় চিকিৎসা করলো, ফলাফল কি হবে ? খুব সহজ। পরবর্তীতে সেই ডাক্তারকে রোগী হতে হবেই এবং বিপদ আরো বাড়বে । এই মূহুর্তে একজন ডাক্তারকে আগে বেঁচে থাকাটাই বেশি জরুরি । আমি / আপনি এই মূহুর্তে মৃত্যুবরণ করলে যে ক্ষতিটা পরিবার বা জাতির হতে পারে, তারচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে একজন ডাক্তারের মৃত্যু হলে । তাহলে কেন একজন ডাক্তার জেনে বুঝে সেই পথে হাটবেন। প্রথমে সেই ডাক্তারকে তো বেঁচে থাকতে হবে, একজনের বদলে দশজনকে বাঁচানোর তাগিদে, তাই নয় কি ? লক্ষ্য করুন, উন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এত ভালো এবং ডাক্তারদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো থাকার পরেও কত শত ডাক্তার ইতিমধ্যেই পরলোক গত হয়েছেন । সুতরাং বিষয়টি সবাইকে অনুধাবন করতে হবে।

আরো ভিন্ন কারণের বড় কারণটি হতে পারে অর্থনৈতিক কারণ। হ্যাঁ এই কারণটি আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষকে ভোগাচ্ছে বলেই মনে হয়। আমরা যত বকবকই করি না কেন, সত্যি বলতে দেশের কিছু ধনীকশ্রেনী ছাড়া, কিছু মধ্যবর্তী ছাড়া, বেশিরভাগই অর্থনৈতিকভাবে টানাপোড়েনেই থাকে। সেটা মেহনতি মানুষদের দেখলে পরিষ্কার বুঝা যায় । তার মাঝে  মধ্যবর্তীদের বিপদটি মনে হয় একটু বেশিই । কেননা এই মধ্যবর্তীদের বাহিজ্যিক মানটি বেশিই থাকে। তারা না পারে হাত পাততে, না পারে অর্থনৈতিক ভাবে সামাল দিতে ! দুইকুল যাবার অবস্থা হয়। আর গরিবশ্রেনীর তো ভরসাই উপরওয়ালা । কেননা তাদের জন্য না আছে সরকার, না আছে সমাজের মানুষ! সুতরাং যা হবার হবে, আসমানের দিকে তাকিয়েই বাঁচার আঁকুতি।

উপরের কথাগুলো বললাম, কেননা আমরা জীবনে বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে থাকি। বাস্তবতাকে লুকিয়ে চলি । যখন অনাকাঙিক্ষত কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হই তখন হিমসিম খাই, খেই হারিয়ে ফেলি এবং আতঙ্কিত হই । এটা কেবল করোনা নিয়ে নয়। খেয়াল করলে দেখবেন , হয় আমরা অতিমাত্রায় খামখেয়ালি করতে ভালোবাসি অথবা আতঙ্কিত হয়ে মূল কাজটি করতে পারি না । ভুলের পরে ভুল করতে থাকি এবং মূল কাজে জগাখিচুড়ি করে ফেলি । আমরা প্রায় সবাই সমাজের বা আত্মীয় সজনদের বা  দশজনকে উপদেশ, আদেশ, পরামর্শ, নির্দেশ এগুলি দিতে বেশ পারদর্শী বটে। তবে নিজে মানতে রাজি নই। আমরা সব বিষয়েই দশজনকে যেভাবে বিশেষজ্ঞের মতন পরামর্শ বিতরণ করায় জ্ঞাণীজন সাজি, অথচ মুলত নিজের ভান্ডার খালি কলসি, সেই খালি কলসির কারণেই বীনা বুঝেই বর্তমানে আতঙ্কিত হচ্ছি।

করোনা মানেই মৃত্যু নয় । এটা নিয়ে কিছু বলেই শেষ করবো। ধরুণ আমার বা আপনার করোনা হয়েছে ( নিশ্চয়ই এটা কামনা নয় ) । তার মানে কি ? খুব সহজ হিসেব। আমি বা আপনি নিজেই ভাইরাস । আমি/ আপনি নিজেই যেখানে ভাইরাস, তাহলে প্রথম কর্মটি নিশ্চিত করা, এটাকে না ছড়ানো। আর না ছড়ানোর পদ্ধতি সবার জানা । এখন বাঁচা মরা নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের উপর। যে ব্যক্তির শরীরে শত রোগ আছে, তাদের জন্য কঠিন সত্য হলো বাঁচাটাই ভাগ্য । হোক সেটা শত ভালো চিকিৎসা দিলেও। লিভার/ কিডনি/ হার্ট/ উচ্চ রক্তচাপ/ রক্তে সুগার ইত্যাদি ইত্যাদি থাকলে আমি /আপনি নির্ভয়ে মৃত্যুর দিকে পথ যাত্রী হতে পারি। এটা আমার কথা নয়, বর্তমান বিশ্বে করোনায় মৃত্যুর জরিপের কথা । এ অব্দি যত মৃত্যু হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই বয়স্ক এবং ভিন্ন রোগে আক্রান্ত পূর্ব থেকেই । এটা স্বাভাবিক যে, বয়সের সাথে সাথে রোগের সংখ্যাও বাড়ে । তবে সবার বাড়ে বিষয়টি নিশ্চয়ই তা নয় । জীবনে পূর্ব  থেকেই নানান অনিয়মে ভরা চর্চাই মানুষ জীবনে নানান রোগের আক্রমণের মূল কারণে থাকে। জানি, আমাদের মতন দেশে জীবন চালাতে অপ্রত্যাশিতভাবেই জীবনে অনেক অনিয়ম চলে আসে, তবে আমাদের খামখেয়ালিও কম দোষি নয়। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, গাও- গ্রামের ভালো বাতাসে একজন কায়িক পরিশ্রমী কৃষক বৃদ্ধ বয়সেও বেশ সবল থাকে। কেন ? সেদিকে আর লিখছি না ।  অনেক বলতে হবে। আমি মূলত যা বলতে চাচ্ছি, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিশ্বে যত মহামারী এ অব্দি এসেছে, তারপরে বিশ্বের প্রতিটি দেশ সেই সকল মহামারী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সঠিক কাজটি ভবিষ্যতের কল্যাণে গ্রহণ করেছে। শুধু আশা করবো আমাদের সরকারগুলোও এই মহামারি শেষে সঠিক কাজটি জনকল্যাণে গ্রহণ করবে। কি কাজ? নিজের ক্ষুদ্র জ্ঞাণে ভবিষ্যতে সেটা অবশ্যই লিখবো।

বলছিলাম মহামারী শেষে। হ্যাঁ এখানেই সেই মৃত্যু ভয়কে জয় করার বিষয় চলে আসে। মহামারী এসেছে এবং এটা শেষও হবে । আমরা কেউ খেয়াল করছি না, যত মানুষ করোনাতে মৃত্যু বরণ করেছে, তার চেয়ে শত হাজারগুণ বেশি সুস্থ হয়ে ফিরেছে । তাহলে এটাকে পজিটিভ নেওয়া জরুরি , কেননা শত হাজারগুণ বেশি সুস্থ হয়েছে। সুতরাং ভয় না পেয়ে সঠিক কর্মটি করে যান।

সঠিক কর্মটি এই মূহুর্তে দেশের জনমানুষের জন্য সরকার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই নির্ধারণ করে দিয়েছে। আপাতত কিছু জরুরি আইন প্রয়োগ করেছে। সুতরাং জীবনের বরাবরের মতন খামখেয়ালিপনা না করে সরকার প্রদত্ত পরামর্শ ও আইন শতভাগ মেনে চলুন। এটাই আতঙ্কিত থেকে বের হয়ে আসার প্রথম কাজ। তাছাড়া নাগরিক হিসেবে সরকার প্রদত্ত আইন মেনে চলা বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে।

তুলনা করছি না, তারপরেও বলছি, ইউরোপে আমি দেখছি সরকার প্রদত্ত সকল আইন কানুন প্রতিটি জনগণ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে, নাগরিকগণ চেষ্টা করছে সব মেনে সরকারকে সহযোগিতা করতে এই মহামারি থেকে মুক্ত করতে। একটি দেশের সরকারকে সঠিক কাজ করতে সময় মত জনগণকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হয় । আপনি যদি এখন সরকারের আইনগুলো সঠিক ভাবে মেনে চলেন, সেটাই হবে প্রথম সহায়তার হাত।  আর মৃত্যু নিয়ে অযথা চিন্তা করে মানসিক চাপ নেওয়া হবে নিজেকে ভিন্ন মৃত্যুর পথে ঠেলে দেওয়া । নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার মতন । বিপদে মানসিকভাবে শক্ত থাকা এবং বিনা আতঙ্কে সঠিক কাজ করাই হলো ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ।

সুতরাং,  মৃত্যুকে সর্বদা স্বরণ করো, পরপারে যেতে হবে, কবরে আজাব হবে, হিসেব দিতে হবে, কঠিন শাস্তি হবে, দোজগে যেতে হবে । এগুলোকে আপাতত ভুলে , বর্তমানের দোজগ থেকে আগে নির্ভয়ে নিজেকে সঠিকভাবে রক্ষা করুন। কেননা পরবর্তীতে বেহেস্ত না দোজগ, আপনি কোনটা পাবেন, সেটা কেউ নিশ্চিত নয় । বেহেস্ত তো সুন্দর বলে আমরা সবাই জানি এবং  দোজগ কঠিন। তবে সেই দোজগ আমাদের ধর্মের এবং রক্ষাও করবেন স্বয়ং বিধাতা । বর্তমানে চোখে দেখা দোজগ থেকে নিজেকে রক্ষা করুন। এই দোজগ থেকে মুক্তির পথ মানুষ এবং বিজ্ঞান । এই মানুষ দ্বারাই বিজ্ঞানের সহায়তায় মুক্তি আসবেই।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.