চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেল এবং ফেডারেল রাষ্ট্রসমূহর সকল প্রিমিয়ার মিনস্টারগণ দেশব্যাপী কারফিউ মওকুফ করে এর পরিবর্তে জনগনের দৈনিন্দিন চলাফেরা এবং যোগাযোগের উপর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে করোনার ভাইরাসের বিস্তার কমিয়ে আনার জন্য সোমবার থেকে জার্মানি জুড়ে দু’জনের বেশি প্রকাশ্যে মিলিত হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পারিবারিক সদস্য এবং সপরিবারে বসবাসকারী লোকদের এই নিয়ম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা শুরুতে দুই সপ্তাহের জন্য বলবৎ করা উচিত বলে ঘোষণা কর হয়।
এই বৈঠকের আগে বারোটি রাজ্যের নেতারা দেশে যোগাযোগের উপর নিষেধাজ্ঞার জন্য মূল পয়েন্টগুলিতে একমত হয়েছেন। অন্যদিকে বাভারিয়া, সারল্যান্ড এবং স্যাক্সনি সুদূরপ্রসারী ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞাগুলি ঘোষণা করেছে – বাভারিয়ায়, উদাহরণস্বরূপ, কেবলমাত্র যারা একটি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত তারাই একসাথে বাইরের মুক্ত বাতাসে পায়চারী করতে বেরোতে পারবেন। করোনার ভাইরাস: আগামীকাল সোমবার থেকে জার্মানিতে “সংক্রমণ সুরক্ষা আইন।” প্রযোজ্য হবে। যার ফলে বদলে যাবে সামাজিক এবং বেক্তিগত জীবনযাত্রা। কারা বাইরে যেতে পারবে এবং কাদের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা ? সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হচ্ছে। এর লঙ্ঘনের কারণে জরিমানাও হতে পারে।
এক নজরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উত্তর :
দৈনন্দিন জীবনে কঠোর পদক্ষেপগুলি বলতে কী বোঝায়?
সত্যিই এখন কি করণীয় ?
কখন বাসা থেকে বের হতে পারবেন ?
শিশু, পোষা প্রাণী এবং আউটডোর খেলাধুলা বা যদি শুধু বাইরে একটু মুক্ত বাতাসে পায়চারি করতে চান ?
অন্য কোন কোন স্টোর বা দোকানপাট বন্ধ হচ্ছে?
যোগাযোগের নিষেধাজ্ঞার ফলে দরিদ্র, প্রবীণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের উপর কী প্রভাব পড়বে ?
জনগণের পরিচিতি পরীক্ষা বা নিষেধাজ্ঞা কে নিয়ন্ত্রণ করবে ?
কি ধররণের জরিমানা সম্ভব?
আর “সংক্রমণ সুরক্ষা আইন।” আওতায় এই বাধা কতদিন থাকবে ?
ফেডারেল এবং রাজ্য সরকারগুলির মতে, ” বিপদের ঝুঁকি বাসস্থান ছেড়ে বাইরে যাওয়ায় নয়, বিপদটি হচ্ছে নিকটবর্তী এবং প্রত্যক্ষভাবে লোকদের সাথে সামাজিক যোগাযোগ,” উত্তর রাইন-ওয়েস্টফালিয়ার প্রধানমন্ত্রী আর্মিন লাশেট বলেছেন “আরও আনুপাতিকভাবে, আরও উদ্দেশ্যমূলক এবং আরও ভালভাবে ” সংক্রমণের চেইন কে বাধা দেওয়ার জন্য এখন দু’জনের বেশি লোকের সাথে যোগাযোগের উপর নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন।
ফেডারেল রাজ্যগুলির প্রধানমন্ত্রীরা এবং ফেডারেল সরকারের জন্য একটি বিষয় নিশ্চিত: এটি জীবন ও মৃত্যুর বিষয়। সুতরাং, ফেডারেল প্রজাতন্ত্রের সকল ব্যক্তিকে এতে অংশ নিতে হবে – এবং মূল পরিবার এবং তাদের আত্মীয়স্বজনের বাইরে সমস্ত সরাসরি ব্যক্তিগত ও সামাজিক যোগাযোগ বন্ধ করতে হবে।
এক অনলাইন সাক্ষাত্কারে বার্লিন এর “Charite ” হসপিটালের ভাইরোলজির পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান ড্রসটেন বলেছেন, “ভাইরাসটির বিস্তারকে ধীর করে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:” আমাদের এখন রুগীদের সংখ্যা হ্রাস করতে হবে। অন্যথায় আমরা এটি কন্ট্রোলে আন্তে পারবো না, ” এর অর্থ কী তা বর্তমানে ইতালির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যেখানে রোগীদের যত্ন নেওয়ার জন্য হাসপাতালের অপর্যাপ্ত পরিমানে বিছানা এবং নিঃশ্বাস নেয়ার সরঞ্জাম এবং নার্সরা তাদের শারীরিক সক্ষমতার বাইরেও কাজ করে যাচ্ছে। যা আমরা পরিহার করতে করতে প্রতিজ্ঞবদ্ধ ।
আজ অবধি ফেডারেল প্রজাতন্ত্র জার্মানের ইতিহাসে কখনও সাধারণ কারফিউ দেয়া হয়নি যার অর্থ নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের উপর একটি বিস্তৃত হস্তক্ষেপ । সাংবিধানিক আইনজীবিরা এমনকি এই পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী কারফিউগুলি আইনতভাবে সম্ভব এবং ন্যায়সঙ্গত বলে বিবেচনা করেছেন । করোনার মহামারীর ক্ষেত্রে এর আইনি ভিত্তি হ’ল “সংক্রমণ সুরক্ষা আইন।”
মুখোশ (মাউথগার্ড) – কেনাকাটা করার সময় কি আমার মুখোশ পড়া উচিত?
করোনার মহামারীতে এখন অনেকে মুখোশ পরছেন। কোন মুখোশগুলি সত্যই সুরক্ষা দেয়, কেনার আগে ভালো কোরে দেখে নেয়া উচিত। যোগাযোগের নিষেধাজ্ঞাকে গৃহবন্দী করা নয়: জার্মানিতে নাগরিকদের এখনও বাসস্থান ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়, উদাহরণস্বরূপ কর্মস্থানে যাওয়ার এবং ফিরে আসার জন্য। এর মধ্যে প্রয়োজনীয় সভা, এবং পরীক্ষায় অংশ নেওয়াও অন্তর্ভুক্ত।বিধিমালা ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে ফেডারেল রাজ্যগুলির মধ্য ভিন্নমত আছে I বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন হিসাবে, বার্লিনে এটি নিষিদ্ধ, উদাহরণস্বরূপ, আপনি পার্কের বেঞ্চে বসে একা বই পড়তে চান বা পার্কে ঘাসের উপর কম্বলে একটি দম্পতি রোদ পোহাতে চান। বার্লিনের পুলিশ প্রধান বার্বারা স্লোইক বলেছেন, যে কোনও ব্যক্তি যদি পার্কে তোয়ালে বিছিয়ে দীর্ঘস্থায়ীভাবে অবস্থান করেন, তাকে শাস্তি দেয়া হবে। এবং ফাইন ও করা হবে। জনগণের মুক্ত বাতাসে পায়চারি করতে কোনো বাধা নাই ; তবে সেটা সীমিত হতে হবে।
যোগাযোগের নিষেধাজ্ঞার উপরও ব্যতিক্রম রয়েছে। যেসব বাবা-মা তাদের সন্তানদের থেকে পৃথক থাকেন তাদের সাথে দেখা করা উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নাই। একই দম্পতি যারা একসাথে থাকেন না তাদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। মৃত্যু এবং জন্মগ্রহণের কারণে আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা করার অনুমতি রয়েছে।
কেনাকাটা; ফার্মেসী এবং চিকিত্সকদের দর্শন এখনও অনুমোদিত; অর্থ উত্তোলন, অভাবীদের সাহায্য করতে বা পোষা প্রাণীর যত্ন নিতে বাসা থেকেও বেরোতে পারবেন। ডাকঘর, সুপারমার্কেট, ওষুধের দোকান এবং চিকিত্সা সরবরাহের দোকানগুলি খোলা থাকবে, যেমন চিকিত্সা বিশেষজ্ঞ, শ্রবণ যন্ত্র পেশাদার এবং ফিজিওথেরাপিস্ট দের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি খোলা থাকবে । তথাকথিত কিছু বিশেষজ্ঞদের নিষেধাজ্ঞারা অব্যাহতিপ্রাপ্ত, যেমন চিকিৎসক, নার্স, এছাড়া উদাহরণস্বরূপ, ফায়ার সার্ভিস এবং দুর্ঘটনা – উদ্ধারকর্মীরা।
যেমন , ইতালি এবং ফ্রান্সের মতো, যেখানে প্রতিবার বাড়ি থেকে বেরোন, তখই, আপনাকে একটি স্ব-মূল্যায়নের জন্য, বেরোনের কারণটি লিখতে হবে, তবে জার্মানিতে এই ধরণের ফর্মটি সাথে রাখার প্রয়োজন হবে না।
তবে কিছু কিছু শহরে অবশ্য আইডি বহন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, উদাহরণস্বরূপ বার্লিনে। অধ্যাদেশ অনুসারে, যে সব লোকেরা, যারা শহরের বাইরে থাকে, তাদের অবশ্যই একটি পরিচয়পত্র বা অন্যান্য অফিসিয়াল ফটোসহ আইডি এবং বাইরের ঠিকানা সহ একটি সার্টিফিকেট সাথে রাখতে হবে। এইসব ডকুমেন্ট চেক করার অধিকার পুলিশের থাকবে।
শিশু, পোষা প্রাণী এবং খেলাধুলার বিষয় থেকে একটু অবসর নিতে চান?
যেহেতু স্কুল এবং ডে কেয়ার সেন্টারগুলি কয়েক দিনের জন্য বন্ধ ছিল, তাই পরিবারের বিশেষভাবে খেয়াল রাখার প্রয়োজনটি খুব বেশি। তবে, তাদের অল্প সময়ের জন্য বাইরে যেতে এবং ফেডারেল রাজ্যগুলিতে বাইরে যাওয়ার উপর অপেক্ষাকৃত কঠোর নিষেধাজ্ঞাগুলি প্রয়োগ করা হবে, সেখানে তাদের নিজের বাড়ির ছেড়ে কোথাও যেতে দেওয়া হবে না। এক পরিবারের সাথে অপরিচত পরিবারগুলির সাথে মেলামেশা না করাই উচিত এবং তাদের নিজের বাড়ি থেকে বাইক চালিয়ে দূরে কোথায় ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। তবে, দু’জনের বেশি লোক একসাথে বাইরে থাকতে পারবেনা – যদি না তারা একই পরিবারের সদস্য হয়। সুতরাং আপনি হাঁটতে যেতে বা বন্ধুর সাথে জগিং এ যেতে পারেন – তবে তিনজন নয়। যেখানেই সম্ভব, অন্য সকলের থেকে ন্যূনতম দূরত্বটি কমপক্ষে ১,৫ মিটার রাখুন।
তবে জনগণকে নিজের বাগান, উঠানে বা বারান্দা ব্যবহার করার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। যে কোনও ক্ষেত্রে, নিম্নলিখিতটি প্রযোজ্য: আপনার অন্যান্য ব্যক্তির সাথে যতটা সম্ভব বেশি দূরত্ব বজায় রাখুন।
যে সব অনুশীলনী নিজেদের স্বাস্থগত উন্নতি কাজে লাগে, সেইসব অনুশীলন যা নিজেরাই করতে পারেন সেগুলি অনুমোদিত: যেমন আপনি জগিং বা সাইকেল চালাতে যেতে পারেন – তবে খুব বেশি দূরে বা কোনও দলের সাথে না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনি যাদের সাথে বাস করেন তাদের সাথে অথবা আপনার যদি কুকুর থাকে তবে আপনি অ্যাপার্টমেন্টটি ছেড়ে কুকুরকে বাইরে নিয়ে বেড়াতে যেতে পারেন। পশুচিকিৎসক এর সাথে দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
যে সমস্ত প্রাণী যেমন অন্যান্য মধ্যে যদি কেউ ঘোড়ার মালিক হন – তাহলে পশুদের যত্ন নেওয়ার জন্য বাসস্থান ত্যাগ করার অনুমতি আছে।
অন্য কোন স্টোর এখন বন্ধ হচ্ছে?
ব্যক্তিগত পরিষেবাগুলির ক্ষেত্রে হেয়ার সেলুন, নেইল ফ্যাশন সেলুন এবং অন্যান্য সমস্ত সুবিধাও সোমবার থেকে বন্ধ থাকবে। কারণ এইসব সেবা দেবার সময় গ্রাহকদের সাথে সরাসরি শারীরিক স্পর্শের সম্ভাবনা খুব বেশি। সমস্ত রেস্তোঁরাও বন্ধ থাকবে। একমাত্র ব্যতিক্রম হ’ল ডেলিভারি পরিষেবা যার ফলে খাবার সংগ্রহ করে ঘরে বসে খাওয়ার উপযোগীI
যোগাযোগের নিষেধাজ্ঞার ফলে দরিদ্র, প্রবীণ এবং অসহায় ব্যক্তিদের উপর কী প্রভাব পড়বে ?
বহিরাগত রোগীদের চিকিৎসা-সংস্থাগুলো তাদের কাজ চালিয়ে যাবে। করোনার মহামারী এবং সীমান্ত বন্ধ হওয়ার কারণে অনেক পূর্ব ইউরোপীয় নার্স তাদের পুরো পরিবার সহ নিজেদের দেশে ফিরে গেছেন। নার্সিং অ্যাসোসিয়েশন সতর্ক করে দিয়েছে যে “কর্মীদের সংকট আরও বেড়ে যেতে পারে।„ তারপরে, বিশেষত যারা আশেপাশে বাস করেন তাদের স্বজনদের দীর্ঘমেয়াদী সেবার প্রয়োজন তারা নিজেরাই তাদের সেবার দায়িত্ব নিতে পারেন, অথবা নিজেরাই তাদের সেবক খুঁজে নিতে পারেন। অনেক জায়গায় আশেপাশের সাহায্যের জন্য বিভিন্ন ধরনের সংস্থা স্থাপন করা হচ্ছে।
আবাসিক এবং গৃহহীন মানুষেরা এই বিধিনিষেধের ফলে বিশেষভাবে কঠোর ভুক্তভুগি হবেন। সেখানে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে তবে এখানে প্রায়শই প্রচুর লোকের সমাগম ঘটছে ।

মাহাবুবুল হক, শুদ্ধস্বর ডটকমের বিশেষ প্রতিনিধি ।

