নরেন্দ্র মোদী ও ভারতের উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বিপদ

অ্যাডভোকেট আনসার খান :বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে স্বীকৃত ভারত প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অতি সাম্প্রতিক সময়কালে সংকটের মধ্যে পড়েছে বলে মনে করছেন সচেতন রাজনৈতিক মহল। বিশেষ করে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের শাসনাধীনে ভারতের গণতন্ত্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং গণতান্ত্রিক শাসনের ওপর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন জেঁকে বসার সুস্পষ্ট আলামত পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ওঠতে শুরু হয়েছে ভারতের গণতন্ত্র কী বিপন্ন হতে চলেছে। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে ভারতের গণতন্ত্র অব্যাহতভাবে চলমান থাকাবস্থায়ই বিজেপি নেতৃত্বাধীন নরেন্দ্র মোদীর সরকারের অধীনে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের একাধিপত্য স্থাপনের প্রচেষ্টা, হিন্দুত্ববাদী ভারত রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষ্যে যে সকল কর্মসূচী বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছে, তা থেকে ভারতের দীর্ঘদিনের গণতন্ত্র এবং তথায় বসবাসরত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা মারাত্মক বিপদে বলেই মনে করা হচ্ছে।
একজন লোকরঞ্জনবাদী নেতা হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর উত্থানের কারণেই মূলতঃ ভারতের গণতন্ত্র হুমকির মধ্যে পড়েছে। কারণ, রাজনীতি বিজ্ঞানের পন্ডিতেরা মনে করেন, যেখানেই লোকরঞ্জনবাদী (পপুলিজম) নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে, সেখানেই রাষ্ট্রের স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো পার্লামেন্ট, জুডিসিয়ারী, স্বাধীন-মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো-ইত্যাদির ওপর আঘাত আসে শাসক মহলের পক্ষ থেকে। কোনো না কোনো ভাবে এ সকল প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা খর্ব হয় রাজনৈতিক লোকরঞ্জনবাদী (পলিটিক্যাল পপুলিজম) নেতৃত্বের কারণে, এতে করে গণতন্ত্র তথা উদারনৈতিক গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্বাভাবিকভাবেই তখন অনুদার গণতন্ত্রের চর্চা হতে দেখা যায়। ভারতেও তাই ঘটেছে দু’বার দু’জন রাজনৈতিক লোকরঞ্জনবাদী নেতৃত্বের উদ্ভবের কারণে। এর একজন হলেন-ইন্দিরা গান্ধী এবং অন্যজন হলের নরেন্দ্র মোদী।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান “ভেরাইটিজ অব ডেমোক্র্যাসি (ভি-ডেম) তাদের বার্ষিক এক প্রতিবেদনে বলেছে-ভারতের গণতন্ত্র বড় ধরণের বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে-হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের উদ্ভবের ফলে সংখ্যালঘু মুসলমান সহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘাত উৎসাহিত করা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সিভিল লিবার্টিজ, আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ করে এগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করা-এসব কিছুই লিবারেল গণতন্ত্রের জন্য প্রতিকূল। ডানপন্থার লোকরঞ্জনবাদী শাসক মোদীর শাসনে লিবারেল ধরণের গণতন্ত্রের ওপর অনুদার গণতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র আরোপের জন্যই সকল প্রতিষ্ঠানের ওপর হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।
উল্লেখ করা আবশ্যক যে, দ্য লিবারেল কম্পনেন্ট ইনডেক্স (এল.সি.আই) এর অভিমত অনুযায়ী লিবারেল গণতন্ত্রের জন্য শাসন বিভাগের ক্ষমতার লিমিটেশন অপরিহার্য্য এবং এজন্য ব্যক্তির ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা অবশ্যক। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও শাসকের স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতার কবল থেকে এদের রক্ষা করা সম্ভব হবে। সাংবিধানিকভাবেই সিভিল লিবার্টিজ, কার্যকর শক্তিশালী আইনের শাসন, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং কার্যকর ক্ষমতার ভারসাম্য নীতি থাকা জরুরী। ভারতের সংবিধানে এগুলোর নিশ্চয়তা দিলেও মোদী শাসনে এগুলো তেমন কার্যকর নেই। এছাড়া নতুন নতুন আইন করে বা সংবিধান সংশোধন করে সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে মোদীর শাসনে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো যে, মোদী শাসনে ভারতে রিলেজিয়াক্স জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু মেজরিটারিয়ানিজমের উদ্ভব হয়েছে-সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নিরাপত্তাহীন অবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছেন।
মোদী শাসনের অধীনে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দুর্বল এবং অকেজো হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মোদী ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠের তথা কর্তৃত্ববাদী হিন্দু আধিপত্যবাদী শাসন কায়েমের লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছেন। কারণ মোদীর শিকড় অনেক গভীরে। তিনি সর্বোপরি, বিজেপির নেতা। আর বিজেপি এমন একটা সংগঠন যা ইসলাম ফোবিয়ার বহু বছরের পুরানো এজেন্ডাসহ এক বিশাল আধিপত্যবাদী নেটওয়ার্কের অন্তর্গত। মোদী হচ্ছেন হিন্দু আধিপত্যবাদী নেটওয়ার্কের শীর্ষ নেতা এবং তিনি পর্যায়ক্রমে, দল, রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থায় তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ সুসংহতকরণ করে চলেছেন, রাজনৈতিক শত্রুদের অন্যায্যভাবে শাস্তি দিচ্ছেন এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শিক লক্ষ্য পূরণে আরো দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন।
বিজেপি-আর.এস.এসের সাথে যুক্ত-যার হিন্দু আধিপত্য প্রচার করে এমন অনেক সংগঠনের সাথে আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ রয়েছে। আর.এস.এস সম্পর্কে ভারতে বসবাসরত দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার খ্যাতিমান বৃটিশ লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পল লন্ডনের দ্য নিউ স্টেটসম্যানের এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘লেবাননের ফ্যালাঞ্জের ন্যায় আর.এস.এস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অনুকরণে এবং ১৯৩০ এর দশকের ফ্যাসিস্ট মডেলের মতো-এটি আজো খাকি ড্রিল ও সামরিক বাহিনীর সালাম দেওয়ার ন্যায় প্রতিদিনের প্যারেডিং করে।’
রাজনৈতিক চিন্তকদের মতে, ভারতের কোনো ও রাজনৈতিক দল যদি আক্রমণাত্মক হিন্দু জনগণকে সংযত করার ক্ষমতা রাখে তবে সেটা কেবল আর.এস.এস-ই পারে। আর এ ধরণের একটা ডানপন্থী ভাবধারার সংগঠনের শীর্ষেই রয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। তিনি আর.এস.এস-এর বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে ওঠে এসেছেন। তিনি কেবল আর.এস.এস-এর সৃষ্টি নন-দীর্ঘদিন ধরেই এর অন্যতম কট্টরপন্থী হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। আর.এস.এস-এর আদর্শ হলো ভারতকে হিন্দু অধ্যুষিত বিশ্ব শক্তিতে পরিণত করা।
মোদীর মানসিকতা স্পষ্টতঃই বিভাজনমূলক পরিচয়ের রাজনীতির আকার ধারণ করেছে এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকেই ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা ভিত্তিক বিভাজন ভারতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছিলো এবং এ কারণে মোদী শাসনে ভারতে সাম্প্রদায়িক ও হেইট ক্রাইম আরও বেড়েছে। ভারতে ঘৃণ্য অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে ‘ম্যালোভ্যালেন্ট রিপাবলিক’ বইয়ের লেখক কে এস. কোমিরেদী বলেছেন ‘মোদীর অধীনে ভারত একটা নৃশংস প্রজাতন্ত্র’-এর রূপ নিয়েছে।
মোদী স্বৈরাচারী ঝোঁকযুক্ত নেতা হিসেবে সংখ্যালঘুদের ঘৃণা ও সমাজে সাম্প্রদায়িকভাবে বিভাজনকে শক্তিশালী করে নিজের ঘাঁটিকে সংহত করতে চান। বিশিষ্ট সাংবাদিক আরফা খানুম শেরওয়ানী সম্প্রতি যুক্তি দেখিয়েছেন-মোদীর অবস্থান ক্রমশঃ আগ্রাসী হয়ে ওঠছে। জাতীয় সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত নিছক কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে একটা বিশেষ মর্যাদাসহ একটি রাজ্য থেকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরকে ডাউনগ্রেড করা এমন এক প্রতিক্রিয়া-যা হিন্দু আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীকে খুশী করে। আসামের নাগরিকত্বের মুসলিম জনগণকে অস্বীকার করা একই উদ্দেশ্য সম্বলিত।
রাষ্ট্র চিন্তকরা মনে করেন, মোদী একজন ডানপন্থী ক্যারিশম্যাটিক নেতা-যিনি বিভিন্নভাবে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে সাদৃশ্যপূর্ব। তবে দু’জনের মধ্যে মোদী আসলে আরও বিপজ্জনক সম্ভাবনাময় স্বৈরশাসক। ফ্যাসিবাদের অশুভ সকল সমান্তরালের অনুরূপ রাষ্ট্রের সকল কিছুর ওপর নিজের কর্তৃত্ব আরোপ করতে চান মোদী। উল্লেখ্য যে, ফ্যাসিবাদের অশুভ সমান্তরালগুলোর একটা হলো-শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী ও এর অফিস, একটা দুর্বল আইন সভা, একটা আইনী বিচার ব্যবস্থা-যা উভয় ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর প্রভাবের অধীনে কাজ করবে।
এটা এখন স্পষ্ট যে, ভারত কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোতে যোগ দিয়েছে-যেখানে স্বৈরাচারিত্ব প্রকাশ পাচ্ছে এবং গণতন্ত্র বিশেষ করে উদারনৈতিক চেতনার গণতন্ত্র বিলুপ্তির মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। গত দশকে ভারতের গণতন্ত্রের স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষতঃ বাক স্বাধীনতা ও তথ্যের বিকল্প উৎস, নাগরিক সমাজ, আইনের শাসন ও কিছু নির্বাচনী দিক এক বিভ্রান্তিকর দিকে ধাবিত হচ্ছে। মিডিয়া ক্রমশঃ সেন্সর করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটা নতুন প্রবর্তিত আইন বাকস্বাধীনতাকে বাধা দিচ্ছে, সেন্সরশীপ অর্থাৎ সেলফ-সেন্সরশীপকে উৎসাহিত করছে। সাংবাদিকদের নানাভাবে হয়রানী করা হচ্ছে বলেও নানাসূত্রে জানা গেছে। ‘ক্ষমতাসীন দলের কর্মকান্ড নিয়ে সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশ করায় অনেক সাংবাদিককে গুরুতর হুমিক দেওয়া হয়েছে।’
নরেন্দ্রমোদী ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রিয় একজন নেতা এবং এ জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে তিনি রাষ্ট্রের যাবতীয় ক্ষমতার ওপর নিজের ব্যক্তিগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় তৎপর রয়েছেন। ক্ষমতার এই ব্যক্তিগতকরণ প্রচেষ্টা ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়-এটা গণতন্ত্রের জন্য বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে-ভারতের সুপ্রীম কোর্টের চারজন বিচারপতি সম্প্রতি এমন মন্তব্য করেছিলেন যে, গণতন্ত্র বিপদে আছে। মোদীর এমনতরো ক্ষমতার আকাক্সক্ষা, হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ইত্যাদি কারণে শেষ অবধি ভারত এমন একটা দেশে পরিণত হয়েছে-যা নির্মমভাবে মেজরিটারিয়ান অনুশীলন করছে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবাধ ও মুক্ত চিন্তার শ্বাসরোধ ও মতভিন্নতাকে দমিয়ে রয়েছে। ভারতের হিন্দুত্ববাদ বিরোধীরা দেশ বিরোধী বলে অভিহিত হচ্ছেন।
মোদী শাসনে ভারতের গণতন্ত্র যে, বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে তা তিনটা দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যেমন ঃ
১. গণতন্ত্রের জন্য বিশেষ করে জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীন কতকগুলো প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। ভারতের জাতির পিতারা দেশের সংবিধানে এমন কতকগুলো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা রেখেছিলেন যা গণতন্ত্রকে মজবুত ও নিরাপদ করবে। কিন্তু মোদীর অধীনে দেশের এই সকল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যত সম্পর্কে উদারপন্থীরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। সুপ্রীম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো সহ বেশ কয়েকটা প্রতিষ্ঠান, যেগুলো সাংবিধানিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সম্প্রতি রাজনৈতিক কার্যনির্বাহীদের হস্তক্ষেপ ও প্রভাবের কারণে এ সকল প্রতিষ্ঠান স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে না পারায় এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে-এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও পারফরম্যান্সে স্বচ্ছতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
২. অন্যান্য বড় আশংকা হলো-হিন্দুত্ববাদের উত্থান ও এর রাজনৈতিক উপাদান বিজেপির উত্থানের ফলে ভারতের বহুত্ববাদী ও অর্ন্তভুক্তিমূলক রাজনীতি হুমকির সম্মুখীন হয়েছে, অন্যদিকে বিজেপির শক্ত হিন্দুত্ববাদের বিপরীতে কংগ্রেসের ‘নরম হিন্দুত্ববাদ’-এর অনুসরণ এ ধরণের উদ্বেগকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। ভারতের সবচেয়ে পুরানো রাজনৈতিক দলের আদর্শে দৃশ্যমান রূপান্তর উদারবাদীদের অনেককে গভীরভাবে চিন্তিত করেছে।
৩. দেশে জনবহুল ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতাগুলোর বোধগম্য বুদ্ধি-যা ভারতকে কেবলমাত্র একটা প্রক্রিয়াজাত গণতন্ত্রে অবনমিত করার হুমকি সৃষ্টি করেছে-যা কেবল নির্বাচনী গণতন্ত্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবার ক্ষমতাসীন পার্টির এজেন্টদের ভোটারদের ভয় দেখানো, হয়রানী করা, ঘুষ দিয়ে ভোট স্বপক্ষে নিয়ে আসার প্রচেষ্টার কারণে ভোটারদেরকে স্বাধীনভাবে অবাধে ভোট দিতে বাধা দেয়’-বিধায় নির্বাচনী ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষয় ও ক্ষমতা হ্রাস, মেজরিটারিয়ানবাদের উত্থান এবং কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোর প্রতি অধিকাংশ ভোটারই উদ্বিগ্ন। ভারতের বহুত্ববাদী ধারণার ক্ষয়ে দেশের উদারপন্থী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আশংকিত হয়ে পড়েছেন। এসব ভারতের শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য ভালো কিছু নয়। পর্যায়ক্রমিক নির্বাচনের আকারে কার্যনির্বাহী গণতন্ত্র বহাল থাকলেও সংবিধানের স্বীকৃত উদারপন্থী গণতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
একটা গণতান্ত্রিক সমাজ হলো বহু অংশের সমষ্টি। কিন্তু মোদীর ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ক্রসেড যা ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে রুপান্তরিত করবে-তা বহুত্ববাদী সমাজ ও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। তাঁর সাংস্কৃতিক পূর্ণজাগরণের লক্ষ্য হলো মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কোনঠাসা করা এবং তাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করার পাশাপাশি সেক্যুলার রাজনীতিকে ধ্বংস করা। সেক্যুলার রাষ্ট্রের স্থলে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র কায়েম করা। যদিও বিখ্যাত ভারতীয় লেখক অরুন্ধুতি রায় বলেছেন-‘ভারত বাস্তবে কখনো নিরপেক্ষ ছিলো না। এটা সর্বদাই উচ্চবর্ণের হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করে আসছে।’
অন্যদিকে, লেখক পংকজ মিশ্র লিখেছেন ‘ভারত একটা নির্মম অসমসমাজ’ বেশিরভাগ ভারতীয় চকচকে গণতান্ত্রিক আদর্শ ও অগণতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ব্যবধানে বাস করতে বাধ্য, দীর্ঘদিন ধরে আঘাত, দুর্বলতা, হীনমন্যতা, অবক্ষয়, অপর্যাপ্ততায় ও হিংসার গভীর অনুভূতি সংরক্ষণ করছে, পরাজয় বা অপমান থেকে এ কান্ডটা কঠোর শ্রেণীবদ্ধের তুলনায় নিজের চেয়ে উচ্চতর মর্যাদার লোকদের হাতেই ভুগছিলো। এসব সত্বেও এটা সত্য যে, ভারতে মন্দের ভালো একটা গণতন্ত্র বিরাজমান ছিলো-মোদীর শাসনে তাও লন্ডভন্ড হতে চলেছে-মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ে বিভাজিত হয়ে পড়েছে।

লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.