বিদায়ী ২০১৯ : বিশ্বে স্বৈরশাসন প্রতিরোধের বছর

অ্যাডভোকেট আনসার খান:বহুমুখি কারণে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার নীতি উপেক্ষিত এবং লংঘিত হচ্ছে। তবে বিশ্বের দেশে দেশে রাষ্ট্র শাসনে অধিষ্ঠিত স্বৈরতান্ত্রিক একনায়কবাদী শাসকদের কারণে- তাদের নিজস্ব শাসন কর্তৃত্ব দীর্ঘায়িত ও শক্তিশালী করার স্বার্থে মৌলিক মানবাধিকার নীতি ব্যাপকভাবে লংঘন করে চলেছে এবং এসব স্বৈরশাসকদের মানবতা বিরোধী সংবাদ বা ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের বিষয়গুলো মাঝে মাধ্যেই বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়ে আসতেও দেখা যায়।
তবে, এটা সত্য যে, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের নিয়ামক ও রক্ষক হিসেবে স্বীকৃত জনগণও শক্তি অর্জন করে চলেছে এবং এ সকল জনপ্রিয়তাবাদী জনশক্তি স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়ে থাকে এবং এসব ক্ষেত্রে কোনো কোনো প্রতিবাদ আন্দোলন জয়যুক্ত হতে দেখা গেছে- স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের পতন ঘটতে দেখা গেছে। এভাবেই বিগত বছরগুলোতে বিশ্বের অনেক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনাধীন দেশে স্বৈরশাসক তথা মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন হরণকারীদের বিরুদ্ধে জনগণের একটা পাল্টা গতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠতে দেখা গেছে।
গতানুগতিক স্বৈরশাসকের বিপরীতে, বর্তমান সময়কালের শাসক, যারা স্বৈরতান্ত্রিক শাসক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত বা চিহ্নিত করেছে, তাদের উত্থান কিন্তু ঘটেছে গণতন্ত্র থেকেই। অর্থাৎ এসকল স্বৈরশাসক গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে পর্যায়ক্রমে নিজেদের একক হাতে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে গণতন্ত্রকে পদদলিত করে গণতন্ত্রের ওপর নিজেদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কায়েম করে। বেশির ভাগই গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ন করার জন্য দুটি-কৌশল অবলম্বন করে। প্রথমেই নিজেদের জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় করে তুলতে সচেষ্ট হয়। শাসকের নিজের অস্বাভাবিক ক্ষমতা প্রদর্শন করে জনগণের মধ্যে ভীতিকর আবহ সৃষ্টি করে এবং অতঃপর- মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ভিত্তি- যেমন একটা স্বাধীন বিচার বিভাগ, মুক্ত গণমাধ্যম এবং শক্তিশালী নাগরিকগোষ্ঠীর সুরক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয় সরকারি ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব কায়েমের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যকে দুর্বল করে তোলে। এভাবেই রাষ্ট্র ক্ষমতার ওপর একনায়ক শাসক নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও কায়েম করে।
স্বৈরতান্ত্রিক শাসকরা তাদের ক্ষমতার উত্থানের ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য যে সমস্যাগুলোর বিষয়ে উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে, সেগুলোর খুব কমই সমাধান করতে পারে; তবে এরা নিজেদের শাসনের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে এগুলোর অপব্যবহার করে সুচতুরভাবে। এসব অদায়িত্বশীল সরকার যেখানে নেতৃত্বে দেয় সেখানে জনগণের ওপর দমননীতির কঠোরতা যেমন দেখা যায়, তেমনি দুর্নীতি এবং অপব্যবস্থাপনার ঝুঁকি থাকে। অনেকে দাবি করেন, এসকল কর্তৃত্ববাদী সরকার দক্ষতার সাথে শাসনকার্য সম্পন্ন করে থাকে। তবে এরা নিজেদের ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে বলে জনগণের ক্ষতি হয়ে থাকে বহুলাংশে। যেমন- ভেনেজুয়েলার অত্যাধিক মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে ব্যাপক জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’- নামে ফিলিপাইনসে বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড বা চীনের উইঘুর মুসলমানদের ওপর নির্যাতন ও আটক করে রাখা ইত্যাদি ঘটনাগুলো মানবাধিকার নীতির লংঘন। একইভাবে হংকংয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টিতে রয়েছে। লক্ষ লক্ষ ছাত্র-জনতা গণতন্ত্র আদায় করার জন্য, মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করে চলেছে এবং এ আন্দোলন নৃশংসভাবে দমন করে চীনা কর্তৃপক্ষ। তা সত্ত্বে¡ও আন্দোলন চূড়ান্তভাবে দমন করা সম্ভব হয়নি, চীনা একনায়ক সরকারের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন একটা প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।
স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলো জনগণের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে এবং এ ধরণের প্রতিরোধ আন্দোলন অমানবিকভাবে দমন করে কেবলমাত্র ক্ষমতার ওপর তাদের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব বজায় রাখার জন্য। নিজেদের ক্ষমতা অব্যাহত রাখার জন্য জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব বহাল রাখার লক্ষে স্বৈরসরকারগুলো বিভিন্ন প্রকারের দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। রাজপথের আন্দোলনকে প্রশাসনিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে, এমনকি, হত্যা, গুম, জেল-জুলুম ইত্যাদি অমানবিক কায়দায় সরকার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করে থাকে এবং অন্যদিকে, জনগণের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে শাসকের প্রতি আনুগত্য আদায়ের জন্য হেন কোনো পদ্ধতি নেই যা ব্যবহার করা হয়নি, সব পদ্ধতি যেমন- শারীরিক অত্যাচার-নির্যাতন, বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড, ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখে ভীতিকর আবহ সৃষ্টি করে আন্দোলন দমন করে সরকারের স্থায়িত্ব অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে বিশ্বের স্বৈরশাসকগুলো।
স্বৈরশাসকগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো; এ ধরণের সরকার জাতীয়ভাবে রাষ্ট্রের অন্তর্গত সকল বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ইত্যাদি বহুমুখি প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দিয়ে সকল কিছুর ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েম করেন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও কর্তৃত্ব আরোপ করে থাকে। এ ধরণের সরকার আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দুর্বল করার এবং নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মানকে ক্ষণ্ন্ন করার চেষ্টা করে। উদাহরণ স্বরূপ, জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন মিয়ানমার, সৌদি আরব, ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ বাড়াতে কখনো কখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পদক্ষেপ নিয়েছিলো, এসকল স্বৈরশাসক এগুলো উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও ক্ষমতা ক্ষুণ্ন করেছে।
স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ সত্ত্বেও স্বৈরশাসনের শক্তি বেড়েই চলেছে। উদাহরণ স্বরূপ, ব্রাজিলের স্বৈরশাসক কর্তৃক জনগণের ওপর নির্যাতন বেড়েছে। পুলিশের নির্যাতনে মানুষ হত্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশি অত্যাচারে হত্যাকান্ডের শিকার আকাশ ছোঁয়া। প্রতিবছর প্রায় ষাট হাজার মানুষ হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে। শাসন ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য এসব অত্যচার, নির্যাতন ও হত্যাকান্ড মৌলিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী।
প্রতিষ্ঠিত স্বৈরশাসক ও তাদের পদলেহি প্রশংসকরা মৌলিক অধিকারের প্রতি তাদের অবজ্ঞা অব্যাহত রেখছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি স্বাধীন কণ্ঠস্বর এবং জনগণের আন্দোলনকে স্তব্ধ ও নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবি দলগুলোকে নিঃশব্দ করতে এবং তাদের অনুসারী রাজনৈতিক সমর্থকদের লোকজনের ওপর নির্মম অত্যাচার করে এবং হাজার হাজার লোককে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলো এবং এখনো সরকার বিরোধীদের মুখ বন্ধ রাখতে নিরবে-সরবে অত্যাচার করে চলেছে। এজন্য জেল-জুলুম, খুন, গুম, নির্যাতন ইত্যাদি নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করে চলেছে দেশ দুটির সরকার।
অন্যদিকে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে হাঙ্গেরীর প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান গণতন্ত্রের প্রকৃত পথ থেকে সরে এসে তাঁর নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘অনুদারগণতন্ত্র’ প্রয়োগ করেন দেশের মানুষের মতামত উপেক্ষা করে। আর পোল্যান্ডের শাসক জারোসোও কাকাসিস্কি তার দেশের আদালতকে তার পছন্দের বিচারকদের দ্বারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন বিরোধী রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে তার বিরোধী মত দমনের জন্য নানান হিংস্র পথ গ্রহণ করেছিলেন। আর-চীনে একনায়ক শাসকের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ বিরোধীতার সকল সম্ভাবনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকার বিরোধিতার চেষ্টা করা হলে তা দমন করা হয় অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে।
জবাবদিহিহীন স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলো- যারা জনগণের অধিকার অস্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে দেশে দেশে তীব্র গণআন্দোলন সংঘটিত হয়েছে অতীতের বছরগুলোতে। এর ফলে কোনো কোনো স্বৈরাশসকের পতন ঘটেছে। আন্দোলনের মুখে পতন ঘটেছে আর্মেনিয়ান স্বৈরশাসক সারভী সারকিসিয়ান সরকারের। অন্যদিকে, তীব্র গণবিক্ষোভে বলিভিয়ার শাসক ইভো মোরালেস, লেবাননের প্রধানমন্ত্রী চাঁদ হ্যারিরিকে পদত্যাগ করতে হয়েছেন। চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজবাবিজ তার সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগে গণবিক্ষোভের মুখে পড়েছেন।
জনগণের ব্যাপক গণবিক্ষোভ ও প্রবল প্রতিরোধের মুখে যেমন, স্বৈরশাসকদের পতন ঘটেছে বা ক্ষমতা থেকে পদচ্যুত হয়েছে; নির্বাচনের মাধ্যমেও স্বৈরশাসকের পতন ঘটেছে অনেকগুলো দেশে- এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মালয়েশিয়ার নাজীব রাজাক। তাঁর বিরুদ্ধে প্রবল গণআন্দোলন সংঘটিত হয়েছে এবং নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় নাজীব সরকার। নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন নাজিব রাজাক। তেমনিভাবে মালদ্বীপের জনগণ ভোটের মাধ্যমে একনায়ক শাসক ইয়ামিন আবদুল্লাহ গাইয়ুমকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছিলেন।
রাষ্ট্রের অন্তর্গত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক সময় স্বৈরশাসকদের ক্ষমতার লাগামহীন স্বৈরক্ষমতার উচ্চাভিলাষ হারিয়ে দিতে ভূমিকা পালন করে থাকে। এর একটা উদাহরণ হলো, পোল্যান্ড। পোল্যান্ডের স্বাধীন বিচার বিভাগের জজ (বিচারক) পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী কাসজিনাস্কির একটা ইচ্ছা বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বিচারকদের চাকুরী থেকে অপসারণের চেষ্টা করেছিলেন, বিচারকরা স্বাধীন হওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাস্তবায়ন হয়নি; বিচারকরা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিলেন। ইউরোপীয়ন কোর্ট অব জাস্টিস পরবর্তীতে বিচারকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
গণতন্ত্রের বিকাশ ও শক্তিশালীকরণের জন্য শাসকের ক্ষমতার মেয়াদ নির্ধারিত হলে নির্বাচিত শাসকদের উচ্চাশা অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং ফলে শাসকের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের মনোবৃত্তি দূর করে গণতন্ত্রের বিকাশকে গতিশীল রাখা সম্ভব বলেই মনে করা হয় বিধায় আমেরিকাসহ কোনো কোনো দেশে শাসকের ক্ষমতার মেয়াদ দুটি-টার্মে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রজাতন্ত্রগুলোতেও ক্ষমতার মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে অনেকগুলো দেশ এ অবস্থান থেকে সরে আসে। বিশেষ করে ক্ষমতালোভী শাসক ক্ষমতায় থেকে জনমতের বাইরে গিয়ে টার্ম মেয়াদ উঠিয়ে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো, বলিভিয়ার ইভো মোরলেস। ক্ষমতার দুটি টার্ম নির্দিষ্ট থাকা সত্ত্বেও মোরালেম এর ব্যত্যয় করে চার টার্মে এসে নির্বাচন করেন দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য। তবে তিনি উচ্চাশা চরিতার্থ করতে পারেননি জনগণের প্রবল প্রতিরোধের মুখে। এক পর্যায়ে তাঁকে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে বিদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিলো।
এমনি এক প্রবল প্রতাপশালী স্বৈরশাসক ছিলেন সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর বিন বশির। রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করে জনগণের ওপর তীব্র দমন নীতির মাধ্যমে বছরের পর বছর তিনি রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে সুদানকে নিজের পারিবারিক সম্পদে পরিণত করেছিলেন; রাষ্ট্রের সম্পদ লুটপাট করে তিনি নিজে, তাঁর পরিবার সদস্য, স্বজন ও পাশের চাটুকাররা কোটি কোটি টাকা মালিক হয়ে ছিলেন। পক্ষান্তরে দেশের জনগণ নিঃস্ব হতে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। আইন, বিচার, প্রশাসন প্রায় সকল ক্ষেত্র থেকে সাধারণ জনগণ ছিলেন বঞ্চিত। অবশেষে সুদানের জনগণ জেগে ওঠে প্রেসিডেন্টের স্বৈ-শাসনের বিরুদ্ধে। তীব্র গণআন্দোলনে তিন সপ্তাহের মধ্যেই ওমর-আল বশির পদত্যাগ করেত বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও আন্দোলনে শত শত জীবন বলি দান হয়েছিলো। তবে বশিরের পতনের মধ্য দিয়ে ‘পিপলস পাওয়ার’- যে কতো শক্তিশালী সেটা সুদানে প্রমাণিত হয়েছিলো। এখন বশিরকে জেলের ঘাটি টানতে হচ্ছে।
বিশ্বের সকল দেশের স্বৈরশাসকদের চরিত্র প্রায় একই। এরা নিজেদের হাতে বা কর্তৃত্বে এবং নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে নিয়ে আসে। রাষ্ট্রের তথ্য প্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। বিরোধী মতকে কঠোরভাবে দমন করে, পাশাপাশি সরকার বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলকে কোনোভাবেই গ্রহণ করে না। ওয়াশিংটন ভিত্তিক নাগরিক সমাজ উদ্যোগ ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রকল্পের সর্বশেষ ‘আইন সূচকের নিয়মে’- উদ্বেগ প্রকাশ করে সমীক্ষায় বলা হয়েছে- স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোতে স্বাধীন বিচার বিভাগ, মুক্ত মিডিয়া, আইন সভা ইত্যাদি বহুত্ববাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। মূলতঃ এসকল প্রতিষ্ঠান অকেজো করে রাখা হয় এবং আইন শৃংঙ্খলা বাহিনী সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়। অর্থাৎ আইনের শাসনের অবনতির ফলে আইন সভা সহ সকল লিগ্যাল প্রতিষ্ঠানগুলো অকেজো হয়ে পড়ে- এসব প্রতিষ্ঠানগুলো স্বৈরশাসকের মুখাপেক্ষি হয়ে থাকে সর্বক্ষণ এবং এজন্য জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় মারাত্মকভাবে। ডাব্লিউ.জে.পি’র নির্বাহী পরিচালক এলিজাবেথ এন্ডারসন বলেন, এ ধরণের শাসনে আইনের শাস হাইজ্যাক হয়ে যায় শাসকের অনুকূলে; ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য ধ্বংস হয়ে যায়। তবে, ব্যক্তি স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদিতা ও আইনের শাসনের এই বিপর্যয় সত্ত্বেও বিশ্বের স্বৈরশাসকরা তাদের দেশের জনগণ ও নাগরিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ২০১৯ সালে ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যাপক প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছে, গণতন্ত্রের জন্য এটাই আশার বিষয়।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.