বঙ্গবন্ধুর ভাষণ : মুক্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠান ৩১ জানুয়ারি, ১৯৭২ ঢাকা স্টেডিয়াম । বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন তার সারাংশ। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেন , সত্য কথা বলতে কি, যখন আপনাদের আমি দেখি, যখন আপনাদের চেহারা আমি … আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন সত্যিকারের বলতে গেলে বলতে হয়, আমি বক্তৃতা ভুলে গেছি। যাবার বেলায় আপনাদের আমি কিছু দিয়ে যেতে পারি নাই। আপনাদের দিয়েছিলাম আমার শুভেচ্ছা, আমি দিয়ে গিয়েছিলাম আমার আদর্শ, আপনাদের দিয়ে গিয়েছিলাম এক নীতি যার ওপর ভিত্তি করে পাষণ্ড পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্য বাহিনীর বিরুদ্ধে আপনারা মোকাবেলা করেছেন। আমি যা বলেছিলাম, আপনারা তা করেছেন।

আমি বলেছিলাম- এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমি বলেছিলাম- আপনাদের কাছে কিছু নাই আমি জানি, কিন্তু আমি জানি যে জাতির মনোবল বেড়ে যায়, যে জাতি সংঘবদ্ধ হয়, যে জাতি রক্ত দিতে শেখে, সে জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারে না। তাই আমি বলেছিলাম যে, তোমাদের হাতে যা কিছু আছে ঘরে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো, আমি না-ও থাকতে পারি তোমাদের হুকুম দেবার জন্য। তোমরা তা করেছো। তোমাদের আমি যদি আজ ধন্যবাদ জানাই সেটা অন্যায় করা হবে। তোমাদের ধন্যবাদের চেয়ে অনেক বেশি পাওনা, যেটা দেবার মত ক্ষমতা আমার নাই। আমার আছে প্রাণ ভরা ভালোবাসা, আমি তোমাদের সেই প্রাণ ভরা ভালোবাসা দিলাম, আর কিছু দেবার নাই। তোমাদের এই বাহিনীর ইতিহাস আছে, যে ইতিহাস অনেকেই জানে না, সেই ইতিহাস যেদিন লেখা হবে সেইদিন তোমরা জানতে পারবা। গণবাহিনী, মুজিব বাহিনী, যে সমস্ত বাহিনী বাংলাদেশের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে, যে ভাইরা আমার শহীদ হয়েছে, আত্মোৎসর্গ দিয়েছে, সকলকে আমি আমার অন্তরের শুভেচ্ছা জানাই। স্বাধীনতা পেয়েছি বটে কিন্তু অত্যন্ত … এতো রক্ত কোনো জাতি কোনো দিন দেয় নাই। মানুষ যে এতো নৃশংস হতে পারে, মানুষ যে এতো নীচু হতে পারে, মানুষ যে এতো পশু হতে পারে … তা যা পাকিস্তানের সৈন্য বাহিনী দেখিয়েছে, দুনিয়ার ইতিহাসে কেউ তা দেখায় নাই। লক্ষ লক্ষ গ্রাম পোড়ায় দিয়েছে, লক্ষ লক্ষ মা-বোনকে হত্যা করেছে, লক্ষ লক্ষ মা-বোনকে অত্যাচার করে শেষ করেছে, আমার মা-বোনের উপর পাশবিক অত্যাচার করেছে … চিন্তা করলে আমি শিহরিয়া উঠি। কিন্তু তোমরা যে শৃঙ্খলা দেখিয়েছ, তোমরা যে ব্যবহার দেখিয়েছ, দুনিয়ার কাছে বাঙালি যতদিন বেঁচে থাকবে মাথা উঁচু করে থাকবে। না হলে যেভাবে আমাদের এমন কোনো আমার ছেলে নাই যারা এখানে সংগ্রামের পরে সংগ্রাম করেছে, যারা গণবাহিনীতে সংগ্রাম করেছেন, সৈন্য, পুলিশ বা অন্যান্য ইপিআর যারা ছাত্র, যুবক যুদ্ধ করেছেন তাদের ফ্যামিলির উপর অত্যাচার করা হয় নাই, তার ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় নাই, তার মা-বোনদের উপর অত্যাচার করা হয় নাই। তবুও যে ধৈর্য আপনারা দেখিয়েছেন বা তোমরা দেখিয়েছ তা দুনিয়া দেখে … একবার দেখে যাক যে বাঙালি বিনা অস্ত্রে সশস্ত্র সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মোকাবেলা করতে পারে, অস্ত্র কেড়ে নিয়ে সংগ্রাম করতে পারে, বাংলার স্বাধীনতা … বাংলা মাকে মুক্ত করতে পারে, সে জাতি দেখাতে পারে ধৈর্য কি জিনিস। তাই এতো বড়ো সংগ্রামের পরেও কোনো রকমের হত্যাকাণ্ড হয় নাই। কেউ যদি মনে করে থাকেন এটা আমার যুবকদের দুর্বলতা তারা ভুল করেছেন। দুর্বলতা নয়, এটা হলো মহানুভবতা।
তাই তোমাদের কাছে আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ রইলো … যে ডিসিপ্লিন তোমরা দেখিয়েছ আমি গর্বে মাথা উঁচু করে দুনিয়ার কাছে কথা বলতে পারি। আমি যদি এই মূহুর্তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী, ভারতের জনসাধারণ, ভারতের সামরিক বাহিনী, কলকাতার জনসাধারণ, পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণ, ত্রিপুরার জনসাধারণ, মেঘালয়ের জনসাধারণকে মোবারকবাদ না জানাই তাহলে অন্যায় করা হবে। তাদের আমি আপনাদের পক্ষ থেকে সাত কোটি দুখী বাঙালির পক্ষের থেকে ধন্যবাদ জানাই। এক কোটি লোকেরে তারা আমার খাবার দিয়েছে, এক কোটি লোককে তারা আমাকে স্থান দিয়েছে, এক কোটি লোককে তারা আমার বসবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আমি যদি রাশিয়া সরকার, রাশিয়ার জনসাধারণকে ধন্যবাদ না জানাই অন্যায় করা হবে, যখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন আমার সৈন্যবাহিনী, যারা আপনারা মুজিব বাহিনী, গণবাহিনী এগিয়ে আসছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য করেছিলেন ভারতের সৈন্য বাহিনী, চেষ্টা করেছিল যাতে এই বাংলাদেশের বুকে পশ্চিম পাকিস্তানের ঘাঁটি রাখতে পারে। কিন্তু রাশিয়ার ভেটোতে তা পারে নাই। সেজন্য রাশিয়াকে আমি মোবারকবাদ জানাই।

আমি দুনিয়ার … ব্রিটিশ, ফ্রান্স, জার্মানি … এমনকি সাংবাদিক এবং তাদের নেতাদের আমি ধন্যবাদ জানাই, কিন্তু অ্যামেরিকার সরকারকে আমি ধন্যবাদ দিতে পারি না। তারা জানে তাদের খবর আছে যে বাংলাদেশে কী করে মানুষকে মারা হচ্ছে, … তারা জানে যে গ্রামকে গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করছে, … সেই মূহুর্তে অ্যামেরিকার নিক্সন সরকার অস্ত্র দিয়েছে পাকিস্তান সৈন্য বাহিনীকে আমার মা-বোনকে হত্যা করার জন্য। কিন্তু অ্যামেরিকার জনসাধারণের কাছে আমার শুভেচ্ছার বাণী পৌঁছিয়ে দিতে চাই, অ্যামেরিকার সাংবাদিকদের কাছে আমি শুভেচ্ছা বাণী পৌঁছিয়ে দিতে চাই, কেনেডির কাছে আমার শুভেচ্ছা বাণী পৌঁছিয়ে দিতে চাই, সিনেটের কাছে আমি শুভেচ্ছা দেবার চাই। বাংলার জনসাধারণ কোনো মানুষের বিরুদ্ধে নয়, বাংলার জনসাধারণ জালিমের বিরুদ্ধে – সে যেখানেই পয়দা হোক না কেন। ভায়েরা আমার, আপনারা যদি মনে করে থাকেন স্বাধীনতা নিয়ে এসেছেন, আপনাদের কাজ খতম হয়ে গেছে, সেটা ভুল করা হবে। স্বাধীনতা রক্ষা … স্বাধীনতা পাওয়া যেমন কষ্টকর, স্বাধীনতা রক্ষা করাও তেমন কষ্টকর। ষড়যন্ত্র চলছে, কিন্তু তারা জানে না বাংলাদেশের মানুষকে, তারা জানে না আমআমার গণবাহিনীর লোকদের, তারা জানে না আমার মুজিব বাহিনীর লোকদের, তারা জানে না আমার এই বাংলার জনসাধারণকে। কী করবে? আমার স্বাধীনতা হরণ করার চেষ্টা করবে? ষড়যন্ত্র করবে? ভুলে যাও। সাত কোটি মানুষ গুণে গুণে জান দিবে, বাংলার স্বাধীনতা কেউ নেবার পারবে না। আমি আমার সহকর্মীরা যারা আমার অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব দিয়েছে তাদেরও আমি মোবারকবাদ জানাই। তারা যে শৃঙ্খলার প্রমাণ দিয়েছে, তাতে ধন্যবাদ না দিয়ে পারি না, আওয়ামী লীগের কর্মীদের, আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে। বাংলার জনসাধারণকে আমি বলে দিতে চাই এবং তাদেরও আমি বলে দিতে চাই যে এমন কোনো বাংলার ঘর নাই যে ঘরে মুজিবুর রহমানকে ভালবাসে না। তারা আমাদের কাছে খবর পৌঁছিয়ে দিবেন যে কার কাছে অস্ত্র আছে সে অস্ত্র কেমন করে আনতে হয় সেটা জানি। টাকা নাই, পয়সা নাই, চাইল নাই, ডাইল নাই, রাস্তা নাই, রেলওয়ে ভেঙে দিয়ে গেছে, সব শেষ করে (কি যেন কয়) ফেরাউনের দল সব শেষ করে দিয়ে গেছে। কিন্তু আছে আমার মানুষের একতা, আছে তাদের ঈমান, আছে তাদের শক্তি।

এই মনুষ্য শক্তি নিয়েই এই বাংলাকে নতুন করে গড়ে তুলতে চাই। তাদের কাছে আমি চাই যেভাবেই, যদি আরো দুমাস লাগতো কি তিন মাস লাগতো স্বাধীন হতে; তো তোমরা যুদ্ধ করতা না? (সবাই সমস্বরে, ‘হা’)। যদি এক বৎসর লাগতো, যুদ্ধ করতা না? (সবাই সমস্বরে, ‘হা’)। তোমরা শত্রুর মোকাবেলা করতা না? (সবাই সমস্বরে, ‘করতাম’)। গুলি খেয়ে মরতা না? (সবাই সমস্বরে, ‘মরতাম’)। এই এক বৎসর তোমাদের সর্বস্ব ত্যাগ করে আমার দেশের গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ তোমাদের করতে হবে। করবা? (সবাই সমস্বরে, ‘করবো’)। আমি জানি, তোমরা করবা। যখন আমি ছিলাম না, তখন আমার কথা মতো তোমরা করেছো, নিশ্চয়ই করবা। এ বিশ্বাস না থাকলে আমি বাঁচতে পারতাম না। আর তোমরা যদি আমার সংগ্রাম না করতা, তাহলে বোধহয় আমি গণবাহিনী, মুজিব বাহিনী, আমার আওয়ামী লীগের কর্মীরা, আর সমস্ত দল যারা আমাকে সমর্থন করেছেন, এই সমস্ত দলের কর্মীরা যদি সমর্থন না করতেন বোধহয় পশ্চিম পাকিস্তানের থেকে আমি আসতে পারতাম না। আরেকটা কথা বলতে চাই, ভুট্টা সাব বড়ো নারাজ হয়ে গেছে। তিনি যে আমায় রিকগনিশন দেয় তার সঙ্গেই তিনি কাট করে দেন। আমার মনে হয় শেষ পর্যন্ত … হারাধনের একটি ছেলে কাঁদে ভেউ ভেউ, মনের দুঃখে বনে গেল রইলো না আর কেউ। বোধ হয় শ্রীমানের সেই অবস্থাই হবে। সুখে থাকো, সুখে থাকো, আমি তোমাদের আশীর্বাদ করি সুখে থাকো ভুট্টা সাহেব। তোমার লোকের বিরুদ্ধে আমার কিছুই নাই। তোমার জালেমদের বিরুদ্ধে আমার যথেষ্ট বলার রয়েছে। তেইশ বৎসরে আমার মা-বোনের রক্ত শুষে নিয়েছে, তেইশ বৎসর পরে আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, তেইশ বৎসর পরে আমার মা-বোনকে গুলি করে হত্যা করেছো, তেইশ বৎসর পরে তুমি আমার মা-বোনের উপর পাশবিক অত্যাচার তোমার সৈন্যরা করেছে। তবুও আমি চাই যে তোমরা সুখে থাকো। আমাদের সুখে থাকতে দাও। তোমাদের সঙ্গে কোনো সম্মন্ধ আমাদের হতে পারে না। তুমি রিয়্যালিটি মাইনে নেও, তুমি রিয়্যালিটি মাইনে নেও, এদিক চিন্তা-ভাবনা না করে নিজের মানুষকে বাঁচাও, কারণ তোমার অর্থনৈতিক অবস্থা আমি জানি, ১২টা তোমার বেজে গেছে। সাত কোটি লোকের বাজার আর তোমার নাই। সাত কোটি লোকের কলোনি আর তোমার নাই। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার অবস্থাও তোমার নাই। সৈন্য বাহিনীতে শতকরা সত্তর টাকা খরচ করো … আনপ্রোডাক্টিভ এক্সপেন্ডিচার … ঐ দিকে নজর দাও বন্ধু, এই দিকের চিন্তা করো না। নিজের কথা ভাবো, পরের জন্য চিন্তা করে তোমার লাভ নাই। ভাইরা আমার, তাই তোমাদের আমি ধন্যবাদ জানাই এবং নিশ্চয়ই তোমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে, আমি জানি তোমরা কি কষ্ট করেছো, আমি বুঝতে পারি। আমি নিজেও ভুক্তভোগী, পাহাড়ের মধ্যে থেকেছো, না খেয়ে কষ্ট করেছো, দুমাস তিন মাস পরে মধ্যে তোমরা মাছ-মাংস খেতে পারো নাই, তোমাদের গায়ে একটু কাপড় পর্যন্ত ছিল না, তাই নিয়ে তোমরা শত্রুর মোকাবেলা করেছো, জাগায় জাগায় সৈন্যদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়েছো, তোমাদের আমি কী দিয়ে, কী তোমাদের আমি আমার ভালবাসা জানাবো বুঝোও। তোমরা জানো, তোমাদের আমি ভালোবাসি, আর আমিও জানি তোমরা আমাকে ভালোবাসো। তোমাদের কাছে আমার একটা অনুরোধ রইলো, যেদিন তোমরা যদি সন্দেহ করো যে আমার ভালোবাসার মধ্যে কোনো কৃপণতা আছে সেদিন আমায় বলে দিও আমি চিরদিন তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাবো। আমি সব ত্যাগ করতে পারি, তোমাদের ভালোবাসা আমি ত্যাগ করতে পারি না।
মনিরুজ্জামান খান, লেখক এবং রাজনীতি বিশ্লেষক ।


