বীরের হাতে ভিক্ষার ঝুলি, জাতির কাছে উত্তর নেই !

নাম বলেই বা কি হবে ? তারপরেও হৃদয়ের গহীন কোণ থেকে শতভাগ সম্মানের সেথে নাম উচ্চারণ করছি , ” মুরাদ আলী “। এই নাম বা ছবির চেয়েও বড় হচ্ছে, এই নামের মানুষটি একজন মুক্তিযোদ্ধা । এখন বয়স ৭০ , কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা ইউনিয়নের, অঞ্জনগাছী গ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের সব ডকুমেন্ট আছে, নেই শুধু মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম। তালিকায় নাম ওঠানোর বহু চেষ্টা বৃথা হয়েছে । পেট চালাতে ভিক্ষা করেছেন। এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ভিক্ষাকালিন সময়ে তাঁর উপর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো। পরবর্তীতে ঢাকার একটি সংগঠন  ” জেগে আছি ” নামের মাসিক ভিত্তিতে একটু সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, সংগঠনটি কয়েকবছর সহায়তা চালিয়ে গেলেও আমাদের রাষ্ট্র রাষ্ট্রিয়ভাবে তাঁর কোনো খোঁজ খবর নেয়নি। নিচে বীর মুক্তিযোদ্ধা মুরাদ আলীর ছবিখানা দেখলেই আর কিছু বলার প্রয়োজন হয় না। কেননা ছবি কথা বলে ।

78951239_10220816965557756_7751267714068381696_n.jpg

আমার লেখার উদ্দেশ্য একজন মুরাদ আলীই নয়। কেননা এমন হাজারো বীর মুরাদ আলী আমাদের দেশে চারিদিকেই আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যাদের জীবনে নুন আনতেই পান্তা ফুরিয়ে যায় । আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে হাটে/ঘাট/মাঠে/ বন-জঙ্গলে জীবন বাজি রেখে যে কৃষক/শ্রমিক/মেহনতি মানুষেরা বঙ্গবন্ধুর এক হুকমে রক্ত দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেন নি, যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশে সেই মেহনতি মানুষের দলের মুক্তিযোদ্ধারাই সব চাইতে বেশি অবহেলিত ও নিগৃহীত হয়েছেন। প্রায়শই পত্রিকার পাতায় ছোটো ছোটো খবর আসে, খবর আসা পর্যন্তই শেষ, সমাধান কিছুই আসে না। সুতরাং বলাই যায়, এক বীর মুরাদ আলীর কথা বললে, অন্য হাজার বীরেরা নিজেদের বর্তমান জীবন দর্পণে হয়তো বা ধোঁয়াসাই দেখবেন।

একটি যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশ জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের আশা করে না- কর্নেল তাহের। এই কথাটির একটি ভিন্ন অর্থ বা তাৎপর্য আছে। এই কথা দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মুক্তিযোদ্ধাদের এক করা কঠিন হবে ( নিজস্ব মত)। কেননা আমরা পার্শবর্তী দেশের সহয়তায় অল্পদিনের মধ্যেই দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিলাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হতো তাহলে এর ইতিহাসও নিশ্চিত ভিন্ন হতো, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র, সাম্য, মানবতা সর্বোপরি গণতন্ত্র সবকিছুই একটা ভিন্ন মাত্রা পেতো। সেটা ভিন্ন ও বড় আলোচনা ।

তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটা ভিন্নমাত্রা আছে। সেই সময়ে পূর্ব বাংলার জনমানুষের হাতে দা- বটি ছাড়া হাতে কিছুই ছিলো না। তারপরেও রাজনৈতিক নানান বেড়াজালে একপ্রকার বাধ্য হয়েই আমাদের নেতাদের সঠিক সিদ্ধান্ত ও বঙ্গবন্ধুর ক্যারিস্ম্যাটিক তাৎপর্যেই খালি হাতে সকল মেহনতি মানুষ দেশ স্বাধীন করতে ঝাঁপিয়ে পরে। ফলাফল এই বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডে একখণ্ড স্বাধীন দেশ। দেশ স্বাধীন হলো বটে, তবে সেই স্বাধীনতার ফল কিন্তু সেই মেহনতি জনমানুষের ভাগ্য কমই জুটলো। দালাল, চাটুকার আর চতুর কিছু মানুষ দেশ স্বাধীনের প্রথম থেকেই সব নিজেদের করে নিতে উঠেপড়ে লাগে এবং বেশ সফলই হয়।

একবার ভাবুনতো, হাতে গোনা দু- চারজন মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া দেশে সত্যিকার অর্থে মেহনতি জনমানুষের মুক্তিযোদ্ধারা কি সত্যি কোনো ভালো অবস্থানে আছে ?  সেদিন যদি এই মেহনতি জনমানুষেরা জীবন বাজি না রাখতো, ভারতের শত সহায়তায়ও কি এ দেশ স্বাধীন হবার সম্ভাবনা ছিলো ? উত্তর হচ্ছে সরাসরি না । এটা হবার ছিলো না । যেখানে মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ছিলো সাম্য, সেই সাম্যেকেই সুবিধাবাদিরা অনায়াসে ও খুব সহজভাবেই গিলে খেয়েছে। একটি সদ্য স্বাধীন দেশে এখানেও আবার সেই রাজনৈতিক নেতাদের ক্যারিস্ম্যাটিকতার মারাত্মক অভাব ছিলো এবং সেটা আজ অব্দি লক্ষণীয় হয়। আর সেটার ফলাফলই বীর মুক্তিযোদ্ধা মুরাদ আলীদের হাতে ভিক্ষার বাঁটি ।

মুরাদ আলীদের হাতে ভিক্ষার বাঁটি, এই লজ্জা কি মুরাদ আলীদের ? এই বীরদের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন দেশে কত ফন্দিফিকির করি ! কত উন্নয়ন করি ! কত বেহাল্লাপনা করি ! কত অন্যায়/অবিচার/ অত্যাচার করি ! রাজনীতির নামে ক্ষমতার ব্যবসা করি ! সাধারণ জনমানুষের উপর রাজনৈতিক খড়গ ঝুলিয়ে রাখি, মাথার উপর দাপটের ছড়ি ঘুরাই ! দিনকে দিন এই কর্মগুণ বেড়েই চলছে। পতিত হচ্ছে অল্পকিছু বেঁচে থাকা বীরেরা অথচ বটগাছের মত বড় হচ্ছে ৭১ এর বিভাজিত, বিবর্জিত, কুলাঙ্গার, পাকিস্তান প্রেমিক, বিবেকেহীনা নস্টেরা। যাদের এই রক্তের  বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে কোনো অধিকারই থাকার কথা ছিলো না, তাঁরাই। আর সে কারণেই জাতি আজ বীরদের নিয়ে লজ্জিত হয় না, কেননা জাতির কাছে নেই কোনো সঠিক উত্তর । হে বিব্রত জাতি বিবেকের ঘরে ধূপ দাও, একদিন এই বীরেরা থাকবে না। কিন্তু তাদের দীর্ঘশ্বাস এই জাতিকে ভুগতে হবে। হে বীরেরা তোমারাই এই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, তোমাদের হাতে ভিক্ষার ঝুলি, জাতি লজ্জিত না হলেও, আমরা সাধারণ জনগণ লজ্জিত । তোমরা তোমাদের মহান হৃদয় থেকে এ জাতিকে ক্ষমা করে দিও।

[ ব্রিঃদ্রঃ এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ছবিটি শফি আহমেদ (শফি ভাই) এর ওয়াল থেকে ওনার অনুমতিক্রমেই নিয়েছি ]

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডট কম ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.