বাংলাদেশ, বাংলাদেশের দ্বারা, বাংলাদেশের মত

সাবেক প্রধান  বিচারপতি, বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ও রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ, পাশে শান্তির প্রতিক পায়রার মতন আমাদের মহান নেত্রীদ্বয় সাবেক ও বর্তমান দুই প্রধানমন্ত্রী মাননীয় শেখ হাসিনা ও মাননীয় খালেদা জিয়া । ছবি তিনটির নাম প্রকাশ প্রয়োজন ছিলো না, কেবলমাত্র একেবারেই তরুণ প্রজন্মের জন্যেই নাম বলা। কেননা বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম হয়তো বা কল্পনাও করতে পারে না, ৯০ সাল থেকেই এই দুই নেত্রীদ্বয় আমাদের দেশকে ক্রমান্বয়ে পরিচালনা করে এসেছেন, ব্যতিক্রম কেবল তথাকথিত আর্মি শাসিত দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ।

20191207_195529.jpg

কি চমত্কার ও অমায়িক ছবি  ১৯৯০ সাল। যদিও এই ছবিটি কোনো সম্মান বয়ে আনে বলে মনে করি না ( নিজস্ব মত) । কেননা যে গণতন্ত্রের মন্ত্রে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিলো, সেই সূত্রে বলাই বাহুল্য এই যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশে তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তৈরি হবার কোনো সুযোগই থাকা উচিত ছিলো না । দূর্ভাগাদেশের এই ছবিটিকেই সহনশীলতা, শান্তি, নমনীয়তা, সমঝোতা সর্বোপরি গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার একধাপ এগিয়ে যাওয়ার প্রতিক মনে করা হয়। কেউ ভাবেন না, গণতন্ত্রের রেফারি একজন নয়, সমগ্র দেশের জনগণকে হতে হয়। ভাগ্যের কি পরিহাস, এই দেশে গ্রহণযোগ্য কয়েকটি নির্বাচনের উদাহরণ বলতে গেলে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের নির্বাচনগুলোই উদাহরণ হয়ে সামনে আসে। তারপরেও অনেক কথা, একমাত্র শাহাবুদ্দিন আহমেদ সাহেবের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচন নিয়েই কোনো প্রশ্ন উঠেনি, কোনো মহল থেকেই। অন্যান্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাচনগুলো নিয়ে অবশ্য স্থূল বা নিরব কারচুপির  অভিযোগ তুলা হয়েছিলো। হোক সেটা রাজনৈতিক ফায়দা বা ভিন্ন কারণে ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন ভালো/ মন্দ উদাহরণগুলো তৈরির পিছনে যাদের সবচাইতে বড় অবদান ছিলো , তাঁরা আবার আমাদের সেই রাজনীতিবিদগণেরাই। যারা আমাদেরকে প্রতিনিয়তই পরিচালনা করেন। যারা গণতন্ত্রের লেবাসে গণতন্ত্রকেই হত্যা করেন। যারা সত্যি বলতে গণতন্ত্রের ধার ধারেন না। যারা গণতন্ত্রে কেবলমাত্র নিজেদের ক্ষমতায়নকেই বুঝেন । তাঁরা মূলত গণতন্ত্র নামক মুদ্রার দুই পিঠ মোটেও নয় । রক্তের বিনিময়ে বিজিত দেশের এই মহান রাজনীতিবিদরাই মূলত গণতন্ত্রের উল্টোরথ। এই উল্টোরথের শুরুটা দুঃখজনক হলেও কঠিন সত্য যে, সেটা বঙ্গবন্ধুর মতন ক্যারিস্ম্যাটিক লিডারের আমলেই। যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু এই রাজনীতবিদদের কল্যাণেই গণতান্ত্রিক পথে হাঁটতে পারেন নি। এই স্বাধীন দেশের জন্ম থেকেই, অন্তকাল ধরেই গণতন্ত্রকে বিপথে পরিচালিত করা হয়েছে। আবার অপ্রত্যাশিত হলেও জলের মত সচ্ছ যে , বঙ্গবন্ধুর মতন মহান নেতাও চতুর, স্বার্থানেশি, বিপথগামী, লোভী আর চামচা নামক রাজনীতিবিদদের   জনস্বার্থে দুরে রাখতে সক্ষম হননি। ফলাফল স্বরূপ নিজের সারাজীবনের গণতান্ত্রিক ধারা থেকে অনেকটাই বিচ্যুতি হয়েছিলেন । দুর্ভাগ্য ও আফসোস এই স্বাধীন ভূখণ্ডের, জন্মের পর থেকেই গণতন্ত্রকে সাবলীলভাবে বাড়ার কোনো সুযোগই তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

জল অনেক দুর গড়িয়ে সেই সুযোগটির সৃষ্টি হয়েছিলো বটে, আর সেটাই ছিলো ১৯৯০ সাল। সেই সুযোগটিও হেলায়- ফেলায়, অবহেলায়, অনাকাঙিক্ষতভাবে, গণতন্ত্রের পরিচর্যা না করে ধীরে ধীরে অপমৃত্যুর দিকেই দ্বিতীয়বারের মতন ধাবিত করা হয়েছে, জেনে- বুঝে, লোভ- লালসা আর ক্ষমতা চর্চার মানসিকতা থেকেই। লক্ষণীয় যে, দ্বিতীয়বারেও যাদের মহান কল্যাণে গণতন্ত্রের ধ্বংসাত্মক মিশন শুরু হলো, তা আবার সেই আমাদের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বগণের দ্বারাই। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, যে জনমানুষের ত্যাগের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো, বা যে জনমানুষের অবদানেই ৯০ এ গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছিলো, দুই ক্ষেত্রেই গণতন্ত্রকে পতিত করার ক্ষেত্রে জনমানুষের কোনো সম্পৃক্ততা ছিলো না। এই অসাধ্য কাজটি সুচারুভাবে সাধ্যায়ত্ত করেছেন আমাদের গণতান্ত্রিক (!) রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দগণ।

অথচ ভাববার বিষয়, ৯০ এর পরে এমন দুজন নেত্রীদ্বয়ের হাতে গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব এসেছিলো যা হতে পারতো এই বাংলার ইতিহাসে এক চন্দ্রশিখরের পূর্ণিমা । তাদের একজনের রক্তে বঙ্গবন্ধুর রক্তের প্রবাহ বইছে, আর ভিন্নজন ঘরগিন্নি থেকে উঠে এসে রাজনীতিতে দৃঢ়তার প্রতিক হয়ে উঠা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব । এই বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডে যতগুলো মুসলিম দেশের অবস্থান আছে, প্রায় ক্ষেত্রেই সেই সকল দেশে নারী নেতৃত্বকে কোনোভাবেই উৎসাহীত করে না। অবাক করা বিষয় হলো, বেশিরভাগ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশ কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই ভিন্ন নজির বা উদাহরণ তৈরি করে রেখেছে। যা হতে পারে বিশ্বের জন্য জ্বলন্ত উদাহরণ । এই দেশের জনগণ সেই ৯০ থেকে আজ অব্দি বিনা প্রশ্নে দুই নেত্রীকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করেই যাচ্ছে। পরিতাপের বিষয় হলো, সেই নেত্রীদ্বয় এই জনমানুষের প্রকৃত ভালোবাসাকে কখনোই মূল্যায়ন করতে সক্ষম হননি। তাই বলছিলাম, এতবড় সুযোগ বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডে কোথাও ছিলো না বা নেই। এই সুযোগটি কাজে লাগালে এই নেত্রীদ্বয় নিজেরাই গণতন্ত্রের পিতা আব্রাহাম লিঙ্কনের মত বিশ্বে অনেক উদাহরণ তৈরি করতে পারতেন । পারতেন বিশ্ব মঞ্চে গণতন্ত্রের শিখরের নিজেদের  অবস্থানের  জায়গা করে নিতে। জনগণ, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য , এই  জায়গায় গণতন্ত্রের উৎকৃষ্ট উদাহরণ তৈরি হতে পারতো সেটা গণতন্ত্রের নতুন সংজ্ঞায়নে , ” বাংলাদেশ, বাংলাদেশের দ্বারা, বাংলাদেশের মত ” । সার্বিক বিবেচনায় এতবড় সুবর্ণ সুযোগের দ্বিতীয় উদাহরণ বিশ্বে নেই এবং হবারও কোনো সুযোগ নেই বলেই মনে হয় । তাই বলছিলাম দূর্ভাগাদেশ, দুর্ভাগ্য গণতন্ত্রের ।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডট কম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.