আমরা কবে বুক চিতিয়ে দাঁড়াব সুন্দরবন বাঁচাতে…!

  অনেকদিন পর সুন্দরবন আবার আমাদের আলোচনায় এসেছে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আঘাত হানার পর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মূল ধারার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে মানুষের আড্ডায়-আলোচনায় এখন সুন্দরবন। আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি সুন্দরবনের বাঁধায় দুর্বল হয়ে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হেনেছিল ‘বুলবুল’। বুক চিতিয়ে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন। সুন্দরবনের গাছপালায় বাধা পেয়ে ঘুর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ২০ কিলোমিটার কমে যায়। এতে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে কিছুটা দেরিতে ও দুর্বল অবস্থায় প্রবেশ করে ঘূর্ণিঝড়টি। জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতাও কমে আসে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের উপকূল ঘেঁষে প্রথম আঘাত হানার পর ‘বুলবুল’ প্রায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে আসছিল। কিন্তু বুলবুলের পূর্ব এবং পশ্চিম দুদিকেই তিন কোনার মতো অবস্থানে ছিল সুন্দরবন। সুন্দরবনের গাছপালার কারণে ঘূর্ণিঝড়টি বেশ দুর্বল হয়ে যায়। ‘বুলবুল’ বাংলাদেশে আঘাত হানার সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত। তবে অল্প সময়ের মধ্যে এই গতি ৮০ কিলোমিটারের মধ্যে নেমে আসে। চলতি বছর যতগুলো ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, তার অধিকাংশই সুন্দরবনকেন্দ্রিক হওয়ায় রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশ। এর মূল কারণ সুন্দরবন অতিক্রম করে ঘূর্ণিঝড় বেশিদূর এগোতে পারে না। তার আগেই ঘূর্ণিঝড়গুলো দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু একই ঘূর্ণিঝড় যদি বরিশালকেন্দ্রিক হতো তাহলে বাংলাদেশের জন্য বড় দুর্যোগ বয়ে আনত। সুতরাং, একথা বলা অনস্বীকার্য যে সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অতীতেও সুন্দরবন বহুবার নিজে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে রক্ষা করেছে দক্ষিণ জনপদকে। সাম্প্রতিক সময়ে ২০০৭ সালের সিডর ও ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার গতি-শক্তিও অনেকটাই কমে গিয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনের কারণে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘণ্টায় ২২৩ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা সিডরে প্রাণ হারান ৩ হাজার ৪০৬ জন। আহত হন প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ। এছাড়া ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, ফসল নষ্টসহ কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রায় ৮৯ লাখ মানুষ। পরে আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় জানানো হয়, সিডরের সময় সুন্দরবন না থাকলে অন্তত ৪৮৫ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলার বা ৩ হাজার ৮৮২ কোটি ৩২ লাখ টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হতো। ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩৩৯ জন। জলোচ্ছ্বাসে ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিলেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ। সেবারও সুন্দরবনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। পৃথিবীর আবহাওয়া এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বনভূমির ভূমিকা মূখ্য। অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং শিল্পায়নের ফলে প্রতিনিয়ত বনভূমির পরিমাণ কমছে আশংকাজনক হারে। যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এমনকি আমাদের নিজেদের জন্য অশনি সংকেত। ২০১০ থেকে ২০১৫, পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বনভূমি কমেছে ১৩ হাজার হেক্টর। বন অধিদপ্তরের ‘বাংলাদেশ ফরেস্ট্রি মাস্টারপ্ল্যান ২০১৭-২০৩৬’ শীর্ষক খসড়া মতে, “দেশে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের মধ্যে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা সুন্দরবন ছাড়া বাকি প্রায় সবগুলোই বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বিদ্যমান প্রাকৃতিক বনের প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশই ধ্বংসের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।” এটি সরকারি পরিসংখ্যান। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রায় পাচ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি উজাড় করা হয়েছে। গত ২৬ জুলাই পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ থেকে প্রকাশিত বিশ্বের বনভূমি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৩ লাখ ৭৮ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে, যা দেশের মোট বনভূমির প্রায় ৮ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু ২০১৭ সালেই দেশে সর্বোচ্চ, প্রায় ৭০ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে। আর গত পাঁচ বছরে উজাড় হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৩ একর বনভূমি। বন বিভাগের হিসেব অনুযায়ী, গত দুই বছর চার মাসে দেশের প্রায় ১১ হাজার একর বনভূমি বেদখল হয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব বনভূমি অবৈধভাবে দখল করেছে। দখলকারীরা বেশির ভাগই প্রভাবশালী। তারা বনভূমি ধ্বংস করে বসতি ও শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছে। ছাদ বাগান কেটে ফেলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ ভাইরাল হলেও দেশের বনভূমি ধ্বংসের ভিডিও বা তথ্য ভাইরাল হয় না। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল আমাদের প্রশাসনও কোন ব্যবস্থা নেয় না। আমাজনকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। সে হিসেবে সুন্দরবনকে আমরা বাংলাদেশের ফুসফুস বলতে পারি। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, প্রাণ বৈচিত্রের আধার ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষাকারী সুন্দরবনের অস্তিত্ব প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট নানা দুর্বিপাকে বিপন্ন। সম্প্রতি সরকার সুন্দরবনের আশেপাশে ৩২০ টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কারখানা করার অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে ১৯০ টির অবস্থান সুন্দরবন থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বলে জানিয়েছে খোদ পরিবেশ অধিদফতর। তার উপরে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মিতব্য ১৩২০ মেগাওয়াট রামপাল কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদুৎ প্রকল্প। দেশের ভেতরে প্রবল জনমত, দেশি-বিদেশী বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, ব্যক্তি ও সংগঠনের আপত্তি স্বত্বেও বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি) এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাতীয় তাপবিদ্যুৎ কর্পোরেশনের (এনটিপিসি) যৌথ উদ্যোগের এই প্রকল্প থেকে সরে আসেনি সরকার।
যে ভারতীয় এনটিপিসি বাংলাদেশে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে চাচ্ছে, সেই ভারতেরই পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ইআইএ গাইড লাইন, ২০১০ এ স্পষ্ট বলা আছে- “নগর, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা ইত্যাদির ২৫ কিমি সীমার মধ্যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এড়িয়ে চলতে হবে।” অথচ রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা থেকে সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দূরত্ব মাত্র ১৪ কিলোমিটার৷ রামপালে ৬৬০ মেগাওয়াটের দু’টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে চার বছর৷ এই দীর্ঘ সময়ে নির্মাণ কাজের ফলে সুন্দরবনের পরিবেশের উপর প্রভাব পড়বে৷ নির্মাণ সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদী পথে পরিবহন করার ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নিঃসরণ ইত্যাদি কারণে সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রামপালের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে যার ফলে পরিবেশ আইন ১৯৯৭ এ বেধে দেয়া পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার সীমার (প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রাম) তুলনায় এইসব বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা অনেক বেশি হবে(প্রতি ঘনমিটারে ৫৩ মাইক্রোগ্রামের বেশি) যার ফলে এসিড বৃষ্টি, শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি সহ গাছপালা জীবজন্তুর জীবন বিপন্ন হবে। সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে যেমন ১৪ কিমি দূরত্বের কথা বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা চলছে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফায়েত্তি কাউন্টিতে ১৯৭৯-৮০ সালে ১২৩০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সময়ও স্থানীয় মানুষকে এভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে এর ক্ষমতা বাড়িয়ে ১৬৯০ মেগাওয়াটে উত্তীর্ণ করা হয়। কিছুদিন পর ৬৬ থেকে ১৩০ ফুট উচু বিশালাকৃতি পেকান বৃক্ষগুলো একে একে মরতে শুরু করে। ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের হিসেবে ফায়েত্তি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নি:সৃত বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস বিশেষত সালফার ডাই অক্সাইডের বিষক্রিয়ায় পেকান, এলম, ওক সহ বিভিন্ন জাতের গাছ এবং বাগান ধ্বংস হয়। এই ক্ষতিকর প্রভাব বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৪৮ কিমি দূর পর্যন্ত পৌছে যায়। ফায়েত্তি থেকে বছরে গড়ে ৩০ হাজার টন সালফারডাই অক্সাইড নি:সরণের ফলে সালফার ও এসিড দূষণে ৪৮ কিমি পর্যন্ত যদি এই অবস্থা হতে পারে; তবে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরকারি হিসেবেই দৈনিক ১৪২ টন হারে বছরে প্রায় ৫২ হাজার টন সালফার ডাইঅক্সাইড নি:সৃত হলে মাত্র ১৪ কিমি দূরে অবস্থিত সুন্দরবনের কি অবস্থা হবে – তা সহজেই অনুমেয়। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ‘ফ্লাই অ্যাশ’ ও ২ লক্ষ টন ‘বটম অ্যাশ’ উৎপাদিত হবে৷ এই ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনীভূতি ছাই বা স্লারি ব্যাপক মাত্রায় সুন্দরবনের পরিবেশ দূষণ করবে৷ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পোড়ানোর জন্য হাজার হাজার টন আমদানীকৃত কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পরিবহন করা হবে৷ যে কারণে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রায় সারা বছর ধরে কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল করে গোটা সুন্দরবনের পরিবেশকে ক্ষতাগ্রস্ত করবে৷ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সমুদ্র পথে যে কয়লা আমদানী করা হবে, সেগুলো সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজের মাধ্যমে পশুর নদীর বিভিন্ন এলাকায় খালাস করার কারণে প্রচুর কয়লা সরাসরি নদীতে পড়তে পারে, যা সৃষ্টি করবে ভয়াবহ দূষণের৷ কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ থেকে কয়লা, তেল, ময়লা আবর্জনা, দূষিত পানিসহ বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নিঃসৃত হয়ে নদী-খাল-মাটিসহ গোটা সুন্দরবন দূষিত হবে৷ এছাড়া জাহাজের ঢেউয়ে দু’পাশের তীরের ভূমি ক্ষয় হবে, রাতে জাহাজ চলাচল করলে সার্চ লাইটের আলো মারাত্বক প্রভাব ফেলবে বন্যপ্রাণীদের জীবনচক্রের উপরও৷ উৎপাদিত বর্জ্য ছাই সিমেন্ট কারখানা, ইট তৈরী ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা সরকারি ইআইএ রিপোর্টে বলা হলেও আসলে কোন কারখানায় এর ব্যবহার হবে এরকম কোন নিশ্চিত পরিকল্পনা করা হয়নি। বড় পুকুরিয়ায় মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত ছাই এর উপযুক্ত ব্যবহার বাংলাদেশে হচ্ছে না। সিমেন্ট কোম্পানিগুলো ফ্লাই অ্যাশ ব্যবহার করতে আগ্রহী নয়, বরং অনেক কোম্পানি ফ্লাই অ্যাশ মুক্ত সিমেন্টের বিজ্ঞাপনও প্রচার করে। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত দৈনিক ৩০০ মেট্রিকটন বর্জ্য ছাই কোন সিমেন্ট কারখানায় ব্যবহারের পরিবর্তে ছাই এর পুকুর বা অ্যাশ পন্ডে রাখা হচ্ছে যা মারাত্নক পরিবেশ বিপর্যয় আনবে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যে ছাইয়ের পুকুরের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় ঝুকি হলো এটি পশুর নদীর ঠিক তীরেই তৈরী করা হবে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে আরো বিভিন্ন ধরণের দূষণকারী শিল্প কলকারখানা গড়ে উঠছে। চলছে অবৈধ ভূমি অধিগ্রহণ। এরকমই একটি প্রকল্প হলো সুন্দরবন থেকে মাত্র ১২ কিমি দূরে ওরিয়ন গ্রুপের ৫৬৫ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র। সব নিয়মনীতি ভঙ্গ করে, পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআইএ অনুমোদন ও সাইট ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই জনগণকে অনেকটা অন্ধকারে রেখে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে ওরিয়ন গ্রুপ। রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো ওরিয়নের ৫৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও সুন্দরবনের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। ওরিয়ন গ্রুপের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সুন্দরবনের আরো কাছে হওয়ায় ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই বিষাক্ত ও ক্ষতিকর সালফার ও নাইট্রোজেনের গ্যাস, বিষাক্ত ভারী ধাতু ও ছাই, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, পানি দূষণ ইত্যাদি ঘটানোর মাধ্যমে সুন্দরবনের ধ্বংসকে আরো তরান্বিত করবে। রামপালের ১৩২০ ও ওরিয়নের ৫৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র একসঙ্গে যখন চলবে, তখন এর প্রভাবে সুন্দরবনের অবস্থা কোথায় দাঁড়াবে – তা কল্পনা করাও কঠিন। আগেই উল্লেখ করেছি, সুন্দরবনের আশেপাশে এরকম অনুমোদন পাওয়া শিল্পকারখানার সংখ্যা ৩২০ যার মধ্যে ১৯০ টি সুন্দরবন থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে।
এতকিছুর পরও রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে। এর আশেপাশে আরও ৩২০ টি শিল্পকারখানাও অল্পদিনেই হয়তো গড়ে উঠবে। নেটিজেনরা এই মহাবিপর্যয়ের ভিডিও (তথ্য) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করবে না। তা ভাইরালও হবে না। নেয়া হবে না কোন ব্যবস্থাও। ধীরে ধীরে আক্রান্ত হবে আমাদের ফুসফুস। ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে পড়বে দেশের সামগ্রিক পরিবেশে। তখন কোন কেমোথেরাপি দিয়েও আর ঠেকানো যাবে না সংক্রমণ। সুন্দরবন যেভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় আমাদের আর মহাদূর্যোগ, মহাবিপর্যয়ের মাঝখানে দেয়াল হয়ে; আমরা যে কবে সেভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়াব সুন্দরবনকে বাঁচাতে, নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে!
লেখকঃ  সাকিব আনোয়ার
রাজনীতিবিদ, কলামিস্ট mnsaqeeb@gmail.com

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.