চীন-রাশিয়া-ইরানের অক্ষ শক্তি

অ্যাডভোকেট আনসার খান:চীন, রাশিয়া ও ইরানের সমন্বয়ে বিশ্বব্যবস্থায় একটা নতুন অক্ষ শক্তির উদ্ভবের সম্ভাবনার ফলে বিশ্ব ব্যবস্থা একটা নতুন মাল্টিপুলার (বহুত্ববাদী) ওয়ার্ল্ড অর্ডারের দিকে এগিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান এককেন্দ্রীক বিশ্বব্যবস্থার স্থলে বিশ্বশক্তির ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করে বহুত্ববাদী বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাশিয়া ও চীনা উদ্যোগের সাথে ইরানের ক্রমধর্বমান ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে বিশ্বব্যবস্থায় নতুন ভূরাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক বিরোধের সমান্তরাল হয়েছে চীন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন আবার সামরিক শক্তিতেও বলিয়ান হয়ে ওঠেছে। এ অবস্থায় চীন আমেরিকা দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠার সামগ্রিক ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আমেরিকার একক শক্তি ও ভূমিকার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে একটা বহুত্ববাদী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পূর্ণগঠন প্রক্রিয়ার লক্ষ্যে চীন-আমেরিকার শত্রু দেশগুলোর সাথে হাত মেলাচ্ছে, সম্পর্ক স্থাপন করছে, এর একটা হলো ইরান, অন্যটা হলো রাশিয়া।
অভূতপূর্ব যৌথ সামরিক মহড়া, অনুশীলন, বৈচিত্র্যের মাধ্যম হিসেবে অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সহযোগিতা, কৌশলগত অংশীদায়িত্ব এগুলো ইউরেশিয়ায়-বিশেষত রাশিয়া, চীন ও ইরানের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় হয়ে ওঠেছে, এ তিন অক্ষ শক্তির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত জোরদার হতে দেখা গেছে। প্রকৃতপক্ষে, তেহরান, বেইজিং ও মস্কোর মধ্যে যে কৌশলগত ত্রিভূজ উত্থিত হয়েছে, এর দ্বারা তারা প্রতিবেশী সমস্ত দেশগুলোকে একটা বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে আকৃষ্ট করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শীতল যুদ্ধ পরবর্তী বর্তমানের একুশ শতকের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হলো পশ্চিমা বিরোধী রাষ্ট্রগুলোর ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী হয়ে ওঠা। রাশিয়া, চীন ও ইরান বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত হয়ে বিশ্ব নেতৃত্বের পূর্ণনির্মান ও পূর্ণগঠনের জন্য প্রতিনিয়ত প্রস্তুতি অব্যাহত রেখেছে। আমেরিকা ও পশ্চিমা বিরোধী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামরিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও মৈত্রীবন্ধন জোরদার করে একটা নতুন বিশ্বব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে যেটাকে “মাল্টিপুল ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বহুত্ববাদী বিশ্বব্যবস্থা” হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
আমেরিকার একক বিশ্বব্যবস্থার স্থলে বহুত্ববাদী বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাশিয়া ও চীনের সাথে ইরানের গড়ে ওঠা সম্পর্ক বহুত্ববাদী বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাবনার দ্বার তৈরীতে সহায়কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রাজনৈতিক মতবিনিময় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি থেকে সামরিক সহযোগিতা পর্যন্ত বিষয়গুলোতে “ট্রিপল অক্ষ” এর মধ্যে ঘনিষ্ট সহযোগিতা আমেরিকার স্বার্থের জন্য এবং কয়েক দশক ধরে চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকা পশ্চিমা উদারনীতির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলবে বলে অভিমত আন্তর্জাতিক রাজনীতির পন্ডিতদের।
চীন ইতোমধ্যেই ইরান ও রাশিয়ার সাথে শীর্ষ স্থানীয় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটের চীনা গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ট্র্যাকারের পরিসংখ্যান অনুসারে- ২০০০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রাশিয়ার সাথে চীনের বিনিয়োগ ও বিনিয়োগ চুক্তি ছিলো ৪৭.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে জ্বালানী খাতে ২৬.৬ বিলিয়ন ডলার, ধাতু খাতে ৫.৮ বিলিয়ন ডলার এবং পরিবহন খাতে ২.১ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে চীন-ইরানে বিনিয়োগ করেছে ২৭ বিলিয়ন ডলার যার মধ্যে জ্বালানী খাতে ১১.৮ বিলিয়ন ডলার এবং পরিবহন খাতে ৬.৩ বিলিয়ন ডলার।
চীন ২০০০ সালের গোড়া থেকেই ইরানের অপরিহার্য অর্থনৈতিক অংশীদার ও তেল গ্রাহক হয়ে ওঠেছে। আর ১৯৮৬ সাল থেকেই চীন ইরানের একটা প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃত। জানা যায়, ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র কর্মসূচির উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে চলেছে চীন। অন্যদিকে, “সামরিক ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সহযোগিতায় নিবিড় সহযোগিতা” শীর্ষক অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে চীন-ইরান উভয় দেশ ২০১৬ সালের নভেম্বরে একটা প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে উভয় দেশের মধ্যে সামরিক-প্রতিরক্ষা খাতে আরো সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে।
চীন-ইরানের বৃহৎ তেল আমদানীকারক দেশ। বর্তমানে চীনের বার্ষিক তেলের চাহিদার ১১% শতাংশই ইরান থেকে আমদানী করে থাকে চীন। নগদ মূল্যে বা বাটার পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ করে ইরান। চীন যে শুধু মাত্র তেল আমদানীকারক তা নয়; একই সাথে ইরানের তেল-গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর আধুনিকায়ন ও উন্নয়নেও অন্যতম সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে চীন।
ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে- চীন-ইরানের ৩টা বৃহৎ তেল-গ্যাস ক্ষেত্রের উন্নয়নের সার্বিক সহযোগিতা করছে। এগুলো হলো; ১. দ্য সাউথ পারস্য গ্যাস ফিল্ড (এটা বিশ্বের বৃহৎ তেল ক্ষেত্র এবং কাতারের অংশীদারিত্ব রয়েছে এ গ্যাস ফিল্ডে)। ২. দ্য ইয়াদাবারান তেল ক্ষেত্র (এটা ইরাক সীমান্তে অবস্থিত)। এবং ৩. দ্য জাস্ক তেল টার্মিনাল,-এটা হরমুজ প্রণালীর পূর্বে অবস্থিত।
এভাবেই চীন-ইরানের গ্যাস পরিশোধন ও তেল অবকাঠামোর উন্নীতকরণের দ্বারা ইরানের জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা করে চলেছে। অন্যদিকে, তেল-গ্যাস ইরান থেকে আমদানী করে চীনও লাভবান হচ্ছে। আর উভয় দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে, যা বিশ্বব্যবস্থায় নেতৃত্বের পরিবর্তনে সহায়ক হচ্ছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
২০১৬ সালে চীন ও ইরান একটা বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলো, এবং ২০১৯ সালের আগস্টে এ চুক্তিকে আরো বর্ধিত করা হয়। মূলত: ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার আরোপিত অবৈধ নিষেধাজ্ঞা ও ব্যবস্থাগুলোর প্রতিবাদ হিসেবে চীনের সাথে ইরানের সম্পর্কের অধিকতর পরিমাণে বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে গত আগস্টে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জাভেদ জারিফ বেইজিং সফর কালে দেশ দুটি বর্ধিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। একদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াংলি স্বাক্ষরিত চুক্তিতে পরিবর্তিত সম্পর্কের একটা মূলচিত্র এতে প্রতিফলিত হয়েছে; উপস্থাপিত হয়েছে।
বর্ধিত এ চুক্তির আওতায় চীন-ইরানের তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতকে উন্নত করতে ২৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার অঙ্গীকার করেছে। ইরানের অবকাঠামো বিশেষত: পরিবহন খাতকে আধুনিকায়ন ও উন্নত করতে আরও ১২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এসব বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য অর্থ প্রদান করা হবে চীনের বাণিজ্য উদ্ধৃত্ত থেকে। তবে এসকল অর্থ এককভাবে মার্কিন ডলারে পরিশোধ করা হবে না। অর্থ্যাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলার ব্যতীত অন্যান্য বিকল্প গ্রহণ করবে এবং বিকল্প ব্যবস্থার প্রতি দ্রুত আকৃষ্ট হবে অন্যান্য দেশগুলোও এমনটাই আশা করছে চীন।
২০১৬ সালের জানুয়ারীতে তেহরানে রাষ্ট্রীয় সফরকালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিয়াং ইরানে চীনা সহযোগিতা বৃদ্ধির আশ্বাস দেন এবং উভয় দেশ পরবর্তী দশ বছর মেয়াদে বাণিজ্যকে ৬০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে সম্মত হয়। বাণিজ্য ছাড়াও চীন ইরানের বাজারে শীর্ষ বিনিয়োগকারী। প্রায় ১০০ প্রধান চীনা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান ইরানের মূল অর্থনৈতিক খাতগুলোতে বিনিয়োগ করে চলেছে। উদাহরণস্বরূপ; চীনের জাতীয় পারমাণবিক কর্পোরেশন ২০১৫ সালে ইরানের পারমাণবিক চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের আবাক আই, আর ৪০ ভারী জলের চুল্লিতে নতুন করে ডিজাইন করে স্টোর আধুনিকায়নে সহযোগিতা করেছে।
চীন সরকার ইরানের বাঁধ, বিদ্যুৎ জেনারেটর, রেললাইন, ইত্যাদি অন্যান্য অবকাঠামোর উন্নয়ন ও নির্মাণে অব্যাহত ভাবে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে এবং এসব খাতে ব্যয় করছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ। ২০১৮ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ সংস্থা সিআইটিআইসি গ্রুপ ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে রেল লাইন নির্মাণ করেছে এবং আরো ১৫ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তেহরান ও মাশহাদ শহরের মধ্যে সহজ প্রবেশাধিকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শহর তেহরান ও মাশহাদের মধ্যে ৯০০ কিলোমিটার রেলযোগাযোগকে বিদ্যুতায়িত করার জন্য ইরান-চীনের সাংহাই কর্পোরেশনের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তেহরান-মাশহাদ রেল যোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্প এমন একটা প্রকল্প যা কেবল রেল পরিবহন সংযোগ সরবরাহ করার ক্ষেত্রেই নয়, এটা চীনের পূর্বে ‘স্ট্যান্স’ এর মাধ্যমে তেল ও গ্যাস সরবরাহের ও একটা মাধ্যম যেটা পশ্চিমে তুরস্কের মাধ্যমে ইউরোপেও পৌঁছেছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ‘স্ট্যান্স’ এর ঐতিহাসিক সংযোগের পাশাপাশি চীনের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বের মধ্য দিয়ে রাশিয়া এই উন্নয়নের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
চীনা পরিকল্পনাকারীরা ইরানকে তার বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)এর মাধ্যমে এশিয়াকে ইউরোপের সাথে যুক্ত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই বিআরআই উদ্যোগের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, বৈশ্বিক ব্যবসায়ের নিয়ম এবং নিয়োগের পদ্ধতিগুলোকে চীনের অনুকূলে রূপান্তর করা বা নিয়ে আসা। ইউরেশিয়ায় চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করাও বিআরআই এর লক্ষ্য। গোটা বিশ্বের অধিক সংখ্যক বিআরআই এর সদস্যপদ নেওয়ায় চীনের সমর্থক রাষ্ট্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে-চীনের শক্তি বেড়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে আমেরিকার চিরকালীন বন্ধু দেশের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। বিআরআই এবং এশিয়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ইউরেশিয়াকে চীনা পণ্য ও বিনিয়োগের জন্য একটা বড় বাজারে রূপান্তরিত করার পাশাপাশি কয়েক বিলিয়ন ডলারের রাস্তা, রেললাইন, আশ্রয় প্রকল্প, হাসপাতাল, তেল-গ্যাস ইত্যাদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় গোটা ইউরেশিয়া অঞ্চলকে প্রভাবিত করেছে, ফলে গোটা অঞ্চলে বেইজিংয়ের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইস্টার্ণ ইকনোমিক ফোরাম ও আমেরিকার ক্ষমতা হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। রাশিয়ার শহর ভøাদিভোস্টকে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এই ফোরামের বৈঠকে আমেরিকার অনুগত রাষ্ট্র জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে অংশ নিয়েছেন। এছাড়াও ৬৫ দেশের ৮৫০০ এরও বেশি প্রতিনিধি এ বৈঠকে অংশ নেওয়ায় তা নতুন ওয়ার্ল্ড অর্ডারের ইঙ্গিত বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
আমেরিকার অনুগত রাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়া ও জাপান চীনের সাথে সার্বিক সম্পর্ক জোরদার করেছে। চীন হলো- এদুটি রাষ্ট্রের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। চীন বিদেশী পর্যটকের বৃহত্তম দেশ। বিদেশী শিক্ষার্থীদের বৃহত্তম আকর্ষণীয় দেশ ও বিদেশী বিনিয়োগের তৃতীয় বৃহত্তম উৎসও চীন। একারণে আমেরিকান বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে।
ইরান ও ৫- জাতির মধ্যেকার পারমাণবিক চুক্তি থেকে ২০১৮ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের এক তরফাভাবে বের হয়ে যাবার কারণে এর প্রভাব পড়েছে ভূ-রাজনীতিতে। চুক্তি থেকে আমেরিকার বের হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্বব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমেরিকা-ইরান চুক্তি মেনে চলছে না অজুহাতে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অন্যান্য মিত্ররাষ্ট্রগুলো আমেরিকাকে অনুসরণ করবে বলে আশা করেছিলো আমেরিকা। কিন্তু আমেরিকার বিশ্বস্ত মিত্র তুরস্ক আমেরিকাকে অনুসরণ করেনি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান-ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এর পূর্ণগঠন প্রক্রিয়ায় ক্রমবর্ধমান পদক্ষেপ নিয়েছে। রাশিয়া ও চীনের সকল উদ্যোগের প্রতি সমর্থন দিয়ে চলেছে তুরস্ক।
সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক চীনের সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) এর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের পদক্ষেপ নিয়েছে। এসসিও হলো ভৌগোলিকভাবে চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত দেশ সমূহের বাণিজ্য ও অন্যান্য ব্যবস্থা যা আমেরিকার ইচ্ছার সরাসরি বিরোধীতা করে। আমেরিকার ইচ্ছার বিরোধীতা করা তুরস্কের পক্ষে এই কিছুদিন আগেও অকল্পনীয় ছিলো।
এদিকে, তুরস্ক-চীন, রাশিয়া ও ইরানের সাথে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরো জোরদার করছে। ইতোমধ্যে, তুরস্ক-আমেরিকার নিষেধ অমান্য করে রাশিয়ান এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মিসাইল ক্রয় করে তার দেশে মোতায়েন করেছে। রাশিয়ার সাথে অন্যান্য বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক চুক্তি সম্পাদন বাড়িয়ে দিয়েছে তুরস্ক।
অন্যদিকে, তুরস্ক এখন চীনা বিনিয়োগের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপ ও আফ্রিকার প্রবেশ দ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে এমন একটা লজিস্টিক হাব হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তুরস্ক এখন চীনের নিকট আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেছে। চীনা বিনিয়োগ সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে সেখানে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ সময়কালের মধ্যে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। এর মধ্যে বিদ্যুৎ (পাইপ লাইন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ) খাতে ৯.৫ বিলিয়ন এবং পরিবহন খাতে ২.৩ বিলিয়ন ডলার। আরও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
স্বার্থ সর্বদা একটা শক্তিশালী প্রেরণাদায়ক উপাদান এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান সংখ্যক দেশ সাম্প্রতিক সময়ে তাদের স্বার্থ ও স্বাধীনতা সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হয়ে ওঠেছে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। আমেরিকাকে উপেক্ষা করেই ইউরোপীয় দেশগুলোসহ বিশ্বের ১৫২ দেশ চীনের বেল্ট এন্ড রোড (বিআরআই) উদ্যোগে অংশ নিতে চীনের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এখন গোটা বিশ্বকে পরিবেষ্টন করে। এসব দেশগুলোর অনেকটারই রাশিয়া ও ইরানের সাথে রয়েছে বেশ সুসম্পর্ক ও নানা ধরনের বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক চুক্তি।
পরিশেষে, এটা বলা যায় যে, পূর্বে চীন থেকে ইরান হয়ে রাশিয়ার পশ্চিম এবং এর ইউরোপীয় প্রতিবেশি দেশগুলো এখন আমেরিকার বিকল্প খুঁজে পেয়েছে যা আমেরিকার বিশ্ব নেতৃত্বের ভবিষ্যতকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমেরিকার বিপরীতে, চীন-রাশিয়া ও ইরানের-“তিন অক্ষ শক্তির” নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যবস্থার (নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার) উদ্ভব ও বিকাশের সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.