অ্যাডভোকেট আনসার খান :রোয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কাগামাকে এক পশ্চিমা সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন-আপনার সমর্থকের সংখ্যা বর্তমানে কত শতাংশ হতে পারে বলে আপনি মনে করেন? প্রতি উত্তরে মি: কাগামী বলেন ৮০% শতাংশ। ২০% শতাংশ লোক আমার বিরোধী পক্ষে রয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে বিরোধী পক্ষের ঐ ২০% শতাংশও কিন্তু আমাকে ভয় পায় বিধায় একদম নিশ্চুপ হয়ে গেছে, আমার বা আমার শাসনের বিরুদ্ধে টু-শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস তাদের নেই।’
একুশ শতকের পৃথিবীতে কর্তৃত্ববাদী শাসন ও শাসকের চরিত্র কেমন, সেটা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে মি: কাগামীর বক্তব্য থেকে। “আমার বিরোধী হওয়া সত্বেও আমার ভয়ে আমার বিরুদ্ধে টু-শব্দটি পর্যন্ত করে না”, এমন বক্তব্যের মধ্যেই কর্তৃত্ববাদী শাসনে জনগণের সর্বপ্রকার অধিকারহীনতার স্বীকৃতি রয়েছে।
যুগে যুগে কর্তৃত্ববাদী শাসকের আবির্ভাব হয়েছে পৃথিবীতে, এটাও যেমন সত্য তেমনিভাবে এটাও সত্য যে, কর্তৃত্ববাদী শাসকের নির্মম পতনও প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। তা সত্বেও কর্তৃত্ববাদী শাসকরা শিক্ষা নেয়নি কখনো। বরং নতুন নতুন অবাস্তব আদর্শ প্রচার করে এবং জনগণের কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিতের দোহাই দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সমকালীন বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসন জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসকরা রাষ্ট্র শাসন করে গেছে বা বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায়ও তেমন ধরনের শাসকরা জনগণের ওপর কর্তৃত্ববাদ চাপিয়ে দিয়ে দেশ শাসন করে চলেছে।
তবে বর্তমান যুগের শাসক ও ঊনিশ-বিশ শতকের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যে চরিত্রগত কিছুটা তারতম্যও রয়েছে। একনায়ক বা কর্তৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা গেলেও এসব শাসকদের মৌলিক চরিত্র প্রায় একই। সর্বকালের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের মূল চরিত্রই হলো, জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে দেওয়া, বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ সকল প্রকারের মৌলিক এবং মিডিয়ার স্বাধীনতার অধিকার সমূহ খর্ব করে দিয়ে রাষ্ট্রের অন্তর্গত সকল বিষয়গুলোর ওপর শাসকের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা এবং সর্বক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী শাসকের সার্বভৌমত্ব কায়েম করা। যা কিছু হচ্ছে, তা ঐ কর্তৃত্ববাদী শাসকের বদৌলতেই হচ্ছে, এমনটা প্রচার করে শাসককে ইহজাগতিক প্রভুতে পরিণত করার এক প্রচেষ্টা এ ধরনের শাসনে লক্ষ্য করা যায়।
জনগণ জেনে-বুঝেও শাসকের প্রতি এক প্রকারের আনুগত্য প্রকাশ করে বলে মনে করা হলেও মূলত: জনগণ ভয়ের মধ্যে থাকে বলেই শাসকের বিরুদ্ধে টু-শব্দটি পর্যন্তও করে না। কেননা, শাসক তার প্রতি আনুগত্য আদায় করার জন্য জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে গোটা রাষ্ট্র যন্ত্রকে অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগ করে জনগণকে অত্যাচার-নির্যাতন ও জেল জুলুমের ভয় দেখিয়ে ভিন্নমত দমন করে শাসকের প্রতি জনগণের আনুগত্য আদায় করার জন্য সচেষ্ট থাকে এবং মি: কাগামীর মতানুযায়ী বিরোধী মতের লোকেরা শাসকের প্রতি টু-শব্দটি পর্যন্ত করে না, ঐ ভয়ের কারণেই।
গণতান্ত্রিক সমাজ হলো মুক্ত সমাজ, যেখানে থাকে মানুষের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি এবং সমাজে প্রতিটি মানুষের সমতার নীতির স্বীকৃতি দেওয়া হয় এ ধরনের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়। মানুষ কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়াই স্বাধীনভাবে তার মতামত প্রকাশ ও প্রচার করতে সক্ষম হয় এবং একইভাবে মানুষ তার পছন্দের সরকার ও প্রতিনিধি নির্বাচন করার অবাধ স্বাধীনতা লাভ করে। এ ধরনের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ব্যক্তির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়ে থাকে।
পক্ষান্তরে-কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত এক শাসন ব্যবস্থা, যেখানে মানুষের সকল প্রকার মৌলিক অধিকারের ওপর এক ধরনের ঘোষিত এবং অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়ে থাকে বলে মানুষের মৌলিক অধিকার বিপন্ন হয়ে পড়ে। সর্বদাই শাসকের গুণগান করা কর্তৃত্ববাদী শাসনের এক মৌলিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। শাসকের বিরুদ্ধে যায় এমন ধরনের সর্ব প্রকারের মত প্রকাশ ও প্রচারের অধিকার নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত থাকে বলে এ ধরনের শাসনাধীন সমাজকে ‘বদ্ধ সমাজ’ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
বিংশ শতকে গণতন্ত্রের জোয়ার বয়ে গিয়েছিলো বিশ্বব্যবস্থায়। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ছিলো উন্নয়ন মডেলের একটি মৌলিক উপাদান। এর মধ্যেই জনগণের প্রকৃত মৌলিক অধিকারের বিষয়টি খোঁজা হয়েছিলো। তাই দেশে-দেশে ছিলো গণতন্ত্রের জয়জয়কার।
তবে একুশ শতকের পৃথিবীতে গণতন্ত্রের বিপরীতে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থাকে একটি উন্নয়ন মডেল হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। ‘আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র’ এমন একটি প্রচারণা সামনে নিয়ে আসা হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। ফলে বিশ্বের দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে এবং পক্ষান্তরে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ছে এবং ‘বদ্ধ সমাজ’ ব্যবস্থার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
কর্তৃত্ববাদী শাসনে মানুষকে জোরপূর্বক বাকহারা করার চেষ্টা করা হচ্ছে উন্নয়নের নামে। এসব দেশগুলোতে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে একজন মাত্র শাসকের পদতলে নিয়ে এসে সকল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ক্ষুদ্র একটি পরিবার ও চক্রিদলের হাতে কেন্দ্রীভূত করে গণতন্ত্রের কফিনের ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে আধুনিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের মিনার। আর এখানে মানুষের সকল অধিকার অস্বীকার করে শাসন ব্যবস্থার মিনারের চূড়ায় বসে থাকা শাসকের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে জনগণের ওপর। এতে জনগণের সমর্থন আছে কি-নেই সে সম্পর্কে ভ্রক্ষেপ করা হয় না।
কর্তৃত্ববাদী একনায়কতান্ত্রিক শাসকরা সকল যুগেই ক্ষমতার মিনার গড়ে তোলার নিরন্তর চেষ্টা করে থাকে। ওরা ছায়া দেখলে ভয় পায় কি জানি পাছে কোনো ক্ষতি করে ফেলে। তাই তাদের আরো ক্ষমতা চাই; ক্ষমতার মসনদ গড়ে তোলে নিজের ক্ষমতাকে নিরংকুশ করার জন্য এরা প্রচুর ক্ষমতা পিয়াসী। সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে একনায়করা নিজেদের শাসনকে পাকাপোক্ত করে সদম্ভে ঘোষণা করে-আমিই সবকিছু; আমিই রাষ্ট্র ও জনগণের ত্রাণকর্তা, নিয়ন্ত্রক।
যেমন-ইতিহাস থেকে দেখা যায়, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক হয়ে ফরাসী সম্রাট ষোড়শ লুই সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন ‘আমিই রাষ্ট্র’। অন্যদিকে, তুরস্কের তৎকালীন শাসক কামাল আতাতুর্কের কণ্ঠে ঘোষিত হয়েছিলো-‘আমিই তোমাদের স্বপ্ন’-(আই এ্যাম ইওর ড্রিমস)। তিনি নিজেকে রাষ্ট্র দাবি করেননি সত্য; তবে জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের ত্রাতা হিসেবে দাবি করেছিলেন।
বর্তমান যুগের কর্তৃত্ববাদী শাসকরা অবশ্য ‘একনায়ক’-অভিধায় ভূষিত হতে চান না। তবে এরা জাতি ও রাষ্ট্রের ত্রাণকর্তা, গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা এবং উন্নয়নের রূপকার হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেন। অনেক ক্ষেত্রে এরা লোকরঞ্জনবাদী শাসক হিসেবে প্রতিপন্ন করতে চান। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই তাদের ক্ষমতার ভিত্তি বলে দাবি করেন; যদিও ক্ষমতায় টিকে থাকেন বিরোধী মতকে নির্মমভাবে দমন করে। যেমন-তুরস্কের বর্তমান শাসক রিসেপ এরদোয়ান একজন লোকরঞ্জনবাদী একনায়ক; কিন্তু তিনি তাঁর ক্ষমতা নিরংকুশ করে চলেছেন কঠোরভাবে বিরোধী মত দমন করে। একই কথা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের বেলায়ও প্রযোজ্য।
প্রাচীনকালের বা মধ্যযুগের বা আধুনিককালের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যে মাত্রাগত পার্থক্য থাকলেও চরিত্রগত বা কার্যক্রমগত কোনো পার্থক্য এদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। কারণ কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসকই জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী নয়। জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য অপরিহার্য চারটি উপাদান, যথা : ১. অবাধ, নিরপেক্ষ, মুক্ত এবং স্বাধীন নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি বা সরকার বাছাই করার জনগণের অধিকার, ২. জনগণের সকল মৌলিক ও নাগরিক অধিকার ভোগ করার বা শান্তিপূর্ণ জমায়েত ও সরকারের জনস্বার্থ বিরোধী কাজের প্রতিবাদ করার অধিকার অস্বীকার করা বা সীমিত করা, ৩. মাইনোরিটির অধিকারের স্বীকৃতি ও তার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ, আইনের শাসন, বাক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করার নিশ্চিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা-এসব মৌলিক অধিকারগুলো কোনো কালে কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসকই স্বীকার করেনি। বরং কীভাবে জনগণকে শৃঙ্খলিত করে শাসকের নিয়ন্ত্রণে ও কর্তৃত্বে রাখা যায় সে চেষ্টাই নিরন্তর করে থাকে কর্তৃত্ববাদী শাসকরা।
কর্তৃত্ববাদী শাসনে দেশের সংবিধানকে এমনভাবে সাজানো হয় যা একমাত্র শাসকের অনুকূল ক্ষেত্র সৃষ্টি করে মাত্র। সংবিধানের দোহাই দিয়ে শাসকরা রাষ্ট্রযন্ত্র ও এর সকল প্রতিষ্ঠানের ওপর অবাধ ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে থাকে। অর্থাৎ শাসক নিজের ক্ষমতাকে নিরংকুশ করার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন করার লক্ষ্যে উপর থেকে নীচ পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্যবর্তী সকল প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দিয়ে এর ওপর নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন ও কায়েম করে যাতে বাধাহীনভাবে শাসকের আকাংখার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
আধুনিককালের লোকরঞ্জনবাদী কর্তৃত্ব পরায়ন শাসকরা নিজেদেরকে সাধারণত: চারস্তর বিশিষ্ট পিরামিডের সর্বোচ্চ চূড়ায় স্থাপন করেন, যেখানে শাসকই হলেন একমাত্র পূজনীয়; রাষ্ট্রের সকল কিছুই পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় একমাত্র শাসকের কর্তৃত্বে। চারটা স্তর হলো; ১. সক্রিয়, অন্ধ অনুগত একদল সমর্থক গোষ্ঠী, ২. বাহ্যত: দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী জনগোষ্ঠী, সমর্থকগোষ্ঠী যারা সত্যিকারভাবেই বিশ্বাস করে শাসকের অধীনে দেশ ও জনগণের উন্নতি নিশ্চিত হয়েছে। ৩. এ ধরনের শাসনে এমন একদল লোকের উদ্ভব হয় যারা শাসকের বদৌলতে সুবিধাপ্রাপ্ত এবং এরা সুবিধাভোগী। ৪. খুন, গুম, ভয়ভীতির কারণে একদল লোক শাসককে সমর্থন দিয়ে থাকে, শাসকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
এ ধরনের চার স্তরের মিনারের চূড়ায় বসে শাসক রাষ্ট্র ও সমাজের সকল কিছু, বিশেষ করে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি এবং বুদ্ধি বৃত্তিক জীবনের ওপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে জনগণের সকল মৌলিক অধিকারের উপাদানসমূহ হত্যা করে এবং হত্যা করে সকল বিরোধী মত ও পথকে।
এভাবেই নানা পন্থা গ্রহণের দ্বারা কর্তৃত্ববাদী শাসক নিজের কর্তৃত্ব ও শাসন কায়েম করে থাকে এবং শাসক হয়ে ওঠে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, জনগণ হয়ে পড়ে শাসকের নিয়ন্ত্রণাধীন ভৃত্যে।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

