কমিউনিসট থেকে স্বাধীন উপভোগ্য শহর ব্র্যাটিস্লাভা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং অষ্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির পরে, চেকোস্লোভাক ন্যাশনাল কাউন্সিল চেকোস্লোভাকিয়া ( ১৯১৮-১৯৯৯ ) প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৮ সালে একটি ( ওয়ার্সা চুক্তি) অভ্যুত্থানের পরে চেকোস্লোভাকিয়া একটি কমিউনিস্ট প্রশাসনের অধীনে সর্বগ্রাসী একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং এই সময়ে দেশটি সোভিয়েত পূর্ব ব্লকের অংশ হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে একটি ভেলভেট বিপ্লবের ( Velvet Revolution) মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে চেকোস্লোভাকিয়ার কমিউনিসট শাসনের অবসান ঘটেছিল । ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি বিশ্বে একটি উদাহরণ তৈরি করে , একটি গুলি বা মানুষ হত্যা ব্যতিরেকেই, চেকোস্লোভাকিয়া শান্তিপূর্ণভাবে দুইভাগ হয়ে স্লোভাকিয়া স্বাধীন হয়। কখনও কখনও এই ভেলভেট বিপ্লবকে ” ভেলভেট ডির্ভোস ” নামেও আখ্যায়িত করা হয়।

20190820_143104.jpg

 

স্লোভাকিয়ার রাজধানী শহর ব্র্যাটিস্লাভা। শহরটি ইউরোপের বিখ্যাত নদী দা নিউব নদীর দুপাশে অবস্থিত । দা নিউব নদীটি শহরের মধ্যে দিয়ে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত। এই দেশটি মধ্যে ইউরোপের একটি ল্যান্ডলকড দেশ হিসেবে পরিচিত । দেশটির উত্তরে পোল্যান্ড, পূর্বে ইউক্রেন, দক্ষিণে হাঙ্গেরি , পশ্চিমে অষ্ট্রিয়া এবং উত্তর-পশ্চিমে চেক প্রজাতন্ত্রের সীমানা। স্লোভাকিয়ার অঞ্চল প্রায় ৪৯,০০০ বর্গ কিলোমিটার (১৯,০০০ বর্গ মাইল) পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর বেশিরভাগই পর্বতমালা। জনসংখ্যা ৫,৪ মিলিয়ন যার বেশিরভাগই স্লোভাকিয়ান। দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কোয়েসিস এবং রাষ্ট্রীয়ভাষা স্লোভাক। স্লোভাকিয়া বর্তমানে  একটি উচ্চ-আয়ের উন্নত অর্থনীতির দেশ, উচ্চমানের জীবনযাত্রা, নাগরিক স্বাধীনতা, প্রেসের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক ক্ষেত্রে অনুকূলভাবে শাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।

20190818_105025.jpg

স্লোভাকিয়ায় অনেক আঞ্চলিক বৈষম্য বিরাজমান, তারপরেও দেশটিতে একটি বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রয়েছে। দেশটির ৯০% নাগরিক বাড়ির নিজস্ব মালিক। স্লোভাকিয়া তার নাগরিকদের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করে থাকে। ২০০৪ সালে স্লোভাকিয়া ইউরোপীয়ইউনিয়নে যোগদান করে এবং ২০০৯ সালে  পহেলা জানুয়ারী ইউরোজোনে যোগদান করে। সেই থেকে দেশটিতে ইউরো মুদ্রা হিসেবে পরিচালিত । দেশটি ন্যাটো, জাতিসংঘ সহ প্রায় সব কাউন্সিলের সদস্য । ইউরোপীয় ইউনিয়নের ষষ্ঠতম বৃহত্তম গাড়ি উৎপাদককারী দেশ স্লোভাকিয়া ।20190817_101513 (1)

স্লোভাকিয়া দেশটিতে ৯ টি জাতীয় উদ্যান রয়েছে। যা কিনা দেশটির মোট ৬,৫% জুরে বিস্তৃত । ক্রমান্বয়ে জাতীয় উদ্যানগুলো , তাত্রা জাতীয় উদ্যান ( ৭৩,৮০০ হেক্টর), নিম্ন তাত্রা জাতীয় উদ্যান ( ৭২,৮০০ হেক্টর), ভেল্কা ফেট্রা জাতীয় উদ্যান ( ৪০,৪০০ হেক্টর), স্লোভাক কার্স্ট জাতীয় উদ্যান ( ৩৪,৬০০ হেক্টর) পোলোনিন জাতীয় উদ্যান ( ২৯,৮০০ হেক্টর), মালে ফেট্রা জাতীয় উদ্যান ( ২২,৬০০ হেক্টর), মুরানস্কাপ্লেনিন জাতীয় উদ্যান (২০,৩০০ হেক্টর), স্লোভাক প্যারাডাইস জাতীয় উদ্যান (১৯,৭০০ হেক্টর) , পিনিনি জাতীয় উদ্যান ( ৩,৮০০ হেক্টর)। এই জাতীয় উদ্যান থেকেই পরিস্ফুট যে স্লোভাকিয়া কতটুকুন সবুজায়নের দেশ।

20190817_104837.jpg

ব্র্যাটিস্লাভার দর্শনীয় স্থানগুলো বলতে অনেক বলা প্রয়োজন। তাই সংক্ষেপে শহরের মধ্যে থেকে পরিদর্শনের কিছু অংশ। শহরের মাঝে দা নিউব নদীর উপরে দর্শনীয় কয়েকটি ব্রিজের একটি,

apollo-bridge.jpg

অ্যাপোলো ব্রিজ (  Apollo Most, স্লোভাক ভাষায় Most=সেতু ) এই ব্রিজটি দা নিউবের উপর একটি রাস্তা সেতু। এই ব্রিজটি প্রথম অবস্থায় মোস্ট কোসিকা নামে পরিচিতি পায় । ব্রিজটি ২০০৩ সালে নির্মাণ শুরু হয় এবং ২০০৫ সালে জনসাধারণের জন্য  উন্মুক্ত করা হয়। এই ব্রিজটি পরবর্তীতে এই অঞ্চলের অ্যাপোলো আধুনিক তেল শোধনাগারের নামে নামকরণ করা হয়।

20190820_132023 (1).jpg

 

নিউ ব্রিজ ( Novy= নিউ, Most= সেতু)। এই ব্রিজটি অত্যাধুনিক ব্রিজ । নদীর মাঝখানে কোনো পিলার নেই, অনেকটা ঝুলানো ব্রিজের মত। এই ব্রিজটির মাঝামাঝি দেখতে অনেকটা উফোর মত দর্শনীয় স্থান ।  দুটো পিলারে ভর করে বেশ উপরে গোলাকৃতি স্থান । লিফ্ট এর সাহায্যে উপরে অবস্থান নেওয়া যায়, যেখান থেকে পুরো ব্র্যাটিস্লাভা রাতে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠে।

the-old-bridge.jpg

দি ওল্ড ব্রিজ  ( Stary Most = পুরোনো সেতু ) ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেই সময়ের প্রেসব্রুর্গ যা আজকের দিনে ব্র্যাটিস্লাভা, যার প্রথম সেতু ছিলো ১৮২৫ সালের ক্যারোলিনা সেতু। সেতটি কাঠের ছিলো , বরফ এবং নানান ক্ষতির কারণে সেটি ১৮৯০ সালর শেষ অব্দি অব্যাহত ছিলো। আজকের দিনের পুরোনু লোহার সেতুটি ৪৬৫ মিটার লম্বা। এই ব্রিজটিতে পায়ে এবং সাইকেলে চলাকলের ব্যবস্থা এবং ট্রাম চদাচল করে। এই ব্রিজটিকে অনেকে রং এর কারনে সবুজ ব্রিজ বলে আখ্যায়িত করে থাকে।

20190817_121323.jpg

 

ব্র্যাটিস্লাভা শহরটিকে দৃশ্যত দুইভাগে ভাগ করা যায় । এক অংশ দেখলেই বুঝা যায়, এটা কমিউনিসট শহরের অংশ । যেখানে এখনও কঠিন ইট-পাথরের দালান-কোঠা। আর ভিন্ন অংশ অত্যাধুনিক ভাবে গড়ে উঠছে। শহরের মাঝখানে পুরাতন শহরের অংশটি বেশ আকর্ষণীয় বটে। যেখানে অনেক প্রশস্ত গলি আর পুরানো দালান কোঠা। এই পুরানো অংশে প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই গির্জার উপস্থিতি পাওয়া যায় । সাথে শহরের অনেক পুরনো দূর্গ।

IMG-20190817-WA0001.jpg

শহরের পশ্চিম পাশেই বিশাল আকৃতির পুরানো ব্র্যাটিস্লাভা ক্যাসেল বা দূর্গ। সেই সময়র রাজ সাম্রাজ্যের প্যালেস থেকে শুরু করে নানান ধরনের প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা দেখা যায় ।  এই শহরের পুরাতন এলাকায় শত শত কফি হাউজ আর খাবারের রেস্টুরেন্ট । বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইউরোপের আশেপাশের দেশ থেকেই অনেকেই এই শহরে বিয়ে বা জন্মদিন পালন করা থেকে শুরু করে অনেক অনুষ্ঠানের জন্য এই শহরকে বেছে নেয়। আমাদের থাকাকালিন সময়েও সেরকম অনেক অনুষ্ঠানের উপস্থিতি দেখা মেলে। শহরের কফি হাউজ বা রেস্তরাঁয় লোকজনে গমগম বেশ। ঐতিহাসিকভাবেই চেকোস্লোভাকিয়ার মানুষেরা অ্যালকোহল পানে বেশ প্রসিদ্ধ, এই ব্র্যাটিস্লাভা শহরেও তার নমুনা স্পষ্ট বটে। এমনকি শহরের বার বা রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি ” শিশা পান ” ( যা আমাদের হুক্কা ) করার জন্য অনেক বার পাওয়া যায় । হাজারে হাজারে মানুষ দলে দলে বারে বসে গল্পগুজব, আড্ডা আর হাসিঠাট্টায় মশগুল, সাথে চলে খাওয়া দাওয়া আর মদ্যপান । দেখতে সবাই কে বেশ সুখি ও সমৃদ্ধ মনে হয়। শুক্র/শনি বন্ধের দিনে যেন শহরটি আরো বেগবান হয়ে উঠে। তরুণ/তরুণী থেকে বৃদ্ধ/বৃদ্ধা সবাই যতটা সম্ভব নিজেকে আনন্দময় রাখতে বেশ চেষ্টায় থাকে।

IMG-20190818-WA0001 (1).jpg

শহরের গলির মোড়ে মোড়ে অনেকগুলো ডিস্কো বা ড্যান্সবারের উপস্থিত লক্ষ্য করা যায় । রাস্তার মোড়ে মোড়ে আছে নানান ধরনের আয়োজন, যেমন স্ট্রিটফুড কিংবা ওপের এয়ার কনসার্ট । মানুষজন একদিক থেকে অন্যদিকে বেশ উৎফুল্লতার সাথে ছুটে বেড়াচ্ছে। শিশুরা তাদের বাবা/মা এর সাথে নানানভাবে আনন্দ উল্লাসে ব্যস্ত । শিশুদের জন্যেও নানান ধরনের আনন্দ উল্লাসের উপভোগ্য ব্যবস্থা করা আছে। সবাই সবার মত ছুটচ্ছে , কাজে ব্যস্ত আছে কিংবা ঘুরে বেড়াচ্ছে। শহরটি কখনো কমিউনিসট শহর ছিলো ! এটা বুঝার কোনো উপায় নেই। কত দ্রুত সব পরিবর্তনশীল। এই শহর দেখে এটা বলাই যায়, মানুষ তার জীবনে আনন্দ উপভোগ চায়, চায় জীবনে চলার পথে নিরাপত্তা এবং শতভাগ স্বাধীনতা। এই শহরে এই সবগুলো উপাদান শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়। এই শহর যেন চিৎকার করে বলে দিচ্ছে, হে মানুষ জীবনটা খুব ছোটো , জীবনটাকে উপভোগ কর।

IMG-20190817-WA0003.jpg

ব্র্যাটিস্লাভা শহরটি সত্যি উপভোগ্য একটি শহর, নিশ্চয়তার শহর। আনন্দময় জীবনের জন্য আকর্ষণীয় একটি শহর। মধ্যে ইউরোপের এই শহরটি সময় সুযোগ হলে ঘুরে দেখার মত একটি শহর। শহরটি প্রমাণ করে মানুষের জীবনে স্বাধীনতা পাওয়া একটি বড় প্রয়োজন, তবেই মানুষ শান্তির উপলক্ষ্যে খুঁজে পায় অনায়াসে । বাংলাদেশী ট্যুরিস্টদের ( ইদানিং অনেকেই ঘুরতে আসে)  জন্য ব্র্যাটিস্লাভাশহরটি  হতে পারে একটি উৎকৃষ্ট উপভোগ্য শহর।

20190210_195317

 

বুলবুল তালুকদার 

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম 

 

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.