স্তালিন ও সেই সময়ের কবি সাহিত্যকরা

ফাতেমা জোহরা : নাটকের নাম -” হাউ টু এক্সপ্লেইন কম্যুনিজম টু সাইক্রিয়াট্রিক পেশেন্টস “। একটা দৃশ্যে চারজন রোগী একটা বিমান দুর্ঘটনার ব্যাখ্যা করছেন। একজন বলছেন, পাইলটের ভুলের জন্য দুর্ঘটনা ঘটেছে । আরেকজনের দাবী – না, খারাপ আবহাওয়ার জন্য । তৃতীয়জনের বক্তব্য – বড় ধরণের কোন পাখির সাথে ধাক্কা লেগে । এসব ব্যাখ্যায় অসহিষ্ণু চতুর্থ জন বলে উঠলেন , কি আশ্চর্য , খোদ বিমানটি যে ত্রুটিপূর্ণ ছিল একথা কেন তোমরা বোঝ না !
রুশ বিপ্লব পরবর্তী সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে গর্বাচেভ স্পষ্টতই বলেছেন , “আইডিওলজিক্যাল নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র নির্মাণের চেষ্টা ছিল ত্রুটিপূর্ণ । স্তালিনের হাতে এই আদর্শিক ভিত্তি “quasi religious doctrine ” এ পরিণত হয় , যার ফলাফল ছিল নির্মম রাজনৈতিক নিষ্পেষণ ।

মার্ক্স এর সর্বহারার গণতন্ত্রের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত লেনিন বিপ্লবের পূর্বে বলেছিলেন,”গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যতিত অন্য কোন উপায়ে সর্বহারার পক্ষে ক্ষমতায় আসা অসম্ভব। অথচ বিপ্লবের শুরু থেকে গণতন্ত্রকে নির্বাসন দেওয়া হয়। স্তালিন একনায়কতন্ত্র নিরংকুশ করে তোলেন । অনুগত নমেনক্লাতুরা নিয়ে অতি ক্ষুদ্র এক দলের হাতে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা । দেশে শাসনতন্ত্র ছিল , আইন ছিল , এমনকি নিয়মিত নির্বাচনের ব্যবস্থাও ছিল । কিন্তু দেশের মানুষের কোন অধিকার ছিল না।

রজার কিম্বাল সমাজতন্ত্রকে মানুষের” নিরন্তর আশাবাদ ” বলে উল্লেখ করেছেন।এই আশাবাদ বিমূর্ত কিন্তু মস্কো ছিল সেই আশাবাদের বাস্তবায়ন । পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী তারিক আলী তাঁর কম্যুনিস্ট পিতার কথা স্মরণ করে লিখেছেন , তাঁর কাছে মস্কো ছিল মক্কা । শুধু তৃতীয় বিশ্ব নয় , ইউরোপের অনেক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন বা করেন ।
যে রুশ বিপ্লবের আগে ” মহান ” যোগ না করলে অপরাধ বিবেচিত হত , তার চরিত্র নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে । রুশ ঐতিহাসিকরা এখন সে বিপ্লবকে ঐতিহাসিক অনিবার্যতা বিবেচনা না করে ইতিহাসের একটা ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করছেন । সেন্সরের বেড়া ডিঙিয়ে সোভিয়েত ইতিহাসের যত গভীরে ঢোকা যাচ্ছে , ততই খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে ক্লেদ ও শোণিতের ।
২০ শে অক্টোবর ১৯১৭ সালে সোভিয়েত কংগ্রেসের নির্ধারিত সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে বলশেভিকরা গণতান্ত্রিক ক্ষমতায় আসীন হতে পারতো কিন্তু ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে হবে এই আশংকায় লেনিন অস্ত্র হাতে তুলে নিলেন । দিমিত্রি বলকাগনফের – ” লেনিন – এ নিউ বায়োগ্রাফি ” ও অরল্যান্ডো ফ্রিজেসের – “এ পিপলস ট্রাজেডি – ভাইকিং ” এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ফ্রিজেস লিখেছেন, ” স্তালিনের হাতে যে রাস্ট্রীয় সন্ত্রাস বল্গাহীন ছিল , তার প্রতিটা উপাদান লেনিনের সময়ে তাঁর ব্যবস্থাপনায় নির্মিত হয় । এই উপাদানগুলো হচ্ছে একদলীয় শাসন , রাস্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং কাল্ট অব পার্সোনালিটি । লেনিনের ঘনিষ্ট সহযোগী বুখারিন খোলামেলাভাবেই বলেছেন , ” “সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভিন্ন মতের কোন স্থান নেই । যারা ভিন্ন মত পোষণ করেন তাদের একমাত্র জায়গা জেলখানা ( অন পোয়েটস এন্ড আদার্স – অক্টাভিও পাজ) । ১৯২৩ সালে লেনিন নিজেই বলেছেন , ” মেনশেভিক ও বিপ্লবী সোশ্যালিস্ট দলের একমাত্র জায়গা জেলখানা “। নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতার অবিশ্বাস্য অবনমন ঘটে ।

স্তেফান কুরতোয়া সম্পাদিত একটা প্রতিবেদন ” দি ব্ল্যাক বুক অব কম্যুনিজম ; ক্রাইমস , টেরর , রিপ্রেশন ( হার্ভাড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯১) এ উল্লেখ করা হয় , এই সোভিয়েত আমলে রাস্ট্রীয় সন্ত্রাসের ফলে নিহতের সংখ্যা ২০ মিলিয়ন । রয় মেদভেদেভ তাঁর ” লেট হিস্ট্রি জাজ ” এ লিখেন , স্তালিন ব্যক্তিগত ভাবে ৪৪ হাজার সোভিয়েত ইউনিয়নে বসবাসরত কম্যুনিস্ট কর্মীকে হত্যার নির্দেশ দেন । বল্গাহীন সন্ত্রাস সত্ত্বেও স্তালিন প্রায় তিনদশক ক্ষমতায় ছিলেন এবং আমৃত্যু জনপ্রিয়তা ভোগ করেছেন । দেশের মানুষ তাঁর অপরাধ সম্পর্কে খুব কম জানতেন । সেন্সর ব্যবস্থা ছিল স্তালিনের অতুলনীয় সাফল্য । মানবতার বিরুদ্ধে এই যে অপরাধ তার সমর্থনে বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বা কর্মীরা কেন যুক্তি এগিয়ে দেবে ? এই প্রশ্নের উত্তরে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত এক কম্যুনিস্ট নেতা বলেছেন – ” আমরা সবাই যারা সরাসরি স্তালিনের সহকর্মী ছিলাম , বিশ্বাস করতাম রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষেই গৃহীত প্রতিটা পদক্ষেপই সমাজতন্ত্রের স্বার্থে গৃহীত হচ্ছে । আমরা কখনোই ভাবি নাই কম্যুনিস্ট রাজনীতি ও কম্যুনিস্ট নৈতিকতার মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব থাকতে পারে “।
১৯৫১ সালে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো সম্পাদিত ” সুর ” পত্রিকায় সোভিয়েত ইউনিয়নের অব্যাহত রাজনৈতিক নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও তীব্র মতামত ব্যক্ত করেন অক্টাভিও পাজ। তিনি লিখেন , সোলঝেনিৎসিন বা মান্দেলমাস্ত , যাঁরা এই ব্যবস্থার শিকার , তাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার নৈতিক সাহস হারিয়েছি আমরা। এই পাপ আমাদের প্রত্যেককে ক্লেদাক্ত করেছে ( অন পোয়েটস এন্ড আদার্স ) । এইরকম নৈতিক অনুশোচনায় ছিলেন দিমিত্রি ভালকাগনফ । তিনি ছিলেন একজন কম্যুনিস্ট অ্যাপারাতচিক । জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন এই ব্যবস্থার সমর্থনে । ১৯৮৯ সালের দিকে পুরোনো দলিল দস্তাবেজ থেকে তিনি উদ্ধার করেন তার পিতা ও দুই পিতৃব্য নিহত হন স্তালিনের গোপন পুলিশের হাতে । পিতার মৃত্যুর পর অনাহারে মা মারা যান । পিতার অপরাধ ছিল – বুখারিনের লেখা বই সংগ্রেহে রাখা ।মৃত্যুর আগে ভালকাগনফ লিখেছেন , ” আমার জীবনে যদি আদৌ কোন অর্জন থেকে থাকে তাহলো দীর্ঘদিন ধরে যে বিশ্বাসের অনুগত ছিলাম , তার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ । ”

চলবে……

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.