বাংলা সংস্কৃতি সমন্ধে যাদের সামান্য একটু ধারনা আছে, তারা কখনোই পহেলা বৈশাখকে হিন্দুয়ানি বলতে গেলে জিহ্বায় দাঁগ কাঁটবেই। হাজার বছরের সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে নিয়ে এখন যেভাবে কথা বিনিময় হয় শুনে হতভম্ব হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। পহেলা বৈশাখের মঙ্গলযাত্রা নিয়ে বেশি কিছু বলবো না, এই মঙ্গল শোভাযাত্রা ১৯৮৯ এ কিভাবে প্রতিবাদ স্বরূপ চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিলো, সেই ইতিহাস বেশিদিন আগের নয়, সুতরাং সবার সেটা ভালোই জানা থাকার কথা। সব শুরুর কালে কালে নতুনত্ব আসবে বা আসতে পারে এটাই চিরন্তন সত্য । এক সময়ে হাল খাতা খুলে গ্রামের হাটবাজারে বাতাসা, মুড়ি, মুড়কি, বিভিন্ন হাতি ঘোড়ার তালমিশ্রী দিয়ে খানাপিনা হতো( সেই হাতি ঘোড়ার তালমিস্রি হুজুরদের পেটপুরে খেতে মুসলমানীত্ব বরবাদ হতো না)। আরবানাইজেশনের কারণে গ্রামের সেই হাল খাতার খানাপিনারও এখন পরিবর্তন এসেছে, আসতেই পারে । শহর অঞ্চলে এখন পান্তাইলিশের বেশ রমরমা ভাব। এই ভোজ পর্বের কথায় আমি যাচ্ছি না। পহেলা বৈশাখে যে যা খেয়ে উপভোগ করতে পারে করুক। অনেকের হয়তো জানা থাকবে , পহেলা বৈশাখে ভালো মন্দ খাবারের পিছনের কাহিনি খুবই সহজ সরল চিন্তাভাবনা জড়িত। সহজভাবে ভাবনা ছিলো, বছরের প্রথম দিন ভালো খেলে হয়তো সারা বছর ভালো খাওয়া দাওয়া হতে পারে। এটা কোনো কুসংস্কার নয়, তবে এক ধরনের বিশ্বাস । একেবারেই সাধারণ চিন্তা। অপরদিকে বাঙালি আবার ভোজনপ্রিয় সুতারং সেই ভোজন প্রিয়তা থেকেই নানান নতুনত্বের খাবারের আগমন। সেটা সেই বাতাসা থেকে শুরু করে এখন পোলাও বিরিয়ানি বা পান্তাইলিশ। হোক তবু পহেলা বৈশাখ সকলের জন্য আনন্দের।
গত কয়েক বছর যাবত্ পহেলা বৈশাখের আনন্দে কালো দাঁগ দিচ্ছে আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী । তাদের জরুরি হুকুম বিকেল পাঁচটায় সব আনন্দ শেষ করতে হবে !!! কেননা রাষ্ট্রের দায়িত্ব জানমালের রক্ষা করা ,বেশ বেশ ! তা হঠাৎ করে জান মালের এত হুমকি কোথা থেকে আসে ? সেই দিকে আমাদের আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর কোনো নজর নাই। এক ধর্মান্ধগোষ্ঠি সেই যে রমনা বটমূলে বোমা ফেলেছিলো এই উৎসবকে ভুলুন্ঠিত করতে, সেই যে শুরু আজও চলছে। এত বছর হয়ে গেলো সেই বোমার বিচার আজ অব্দি হয় নাই, আগামীতে কবে যে হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নাই। বিচার হয়নি বটে, সেই বোমা কি বাঙালির এই উৎসবকে বন্ধ করতে পেরেছে ? উত্তর সরাসরি হলো , না। বরং তারপরের বছর বটমূলে আরো বেশি মানুষের আগমন ঘটেছে এবং দিনকে দিন বেড়েই চলছে, আশা করি আগামীতে আরো বাড়বে। একবার ভাবুনতো , যদি সেই বোমার বিচার হতো তাহলে কি আজকেও সেই ধর্মান্ধগোষ্ঠি সেই একইভাবে পহেলা বৈশাখ নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে এত হুমকি ধামকি বা নানান ফতোয়া দেওয়ার সাহস দেখাতে পারতো ? এখানেও উত্তর সরাসরি না।
তাহলে কেন এরকমটি হচ্ছে ? একটু ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করি। লক্ষ্য করুন, শহর-মফস্বল , গ্রাম-গঞ্জে , আনাচে-কানাচে সাড়া বাংলাদেশে এমন কোনো জায়গা নাই যেখানে সেখানে সারারাত ওয়াজ মাহফিল চলেছে। জানিনা সেই সকল মাহফিলের জন্য পুলিশ অনুমতি লাগে কিনা ? লাগলেও পুলিশ কখনো আইন শৃঙ্খলার কথা বলে বন্ধ করেছে কিনা ? জানিনা এবং বলতেও পারবো না। তবে যেটা অনুমান করতে পারি, সেটা হলো ওইসব ওয়াজ মাহফিলে কমিটির লোকজনের মধ্যে ঝগড়াঝাটি ছাড়া তেমন কোনো গন্ডগোল হবার কথা না ( উদহারণ আছে)। কেননা বাঙালি প্রধানত ধর্মভীরু, তাড়া কখনোই সেই ওয়াজ মাহফিল কোনো প্রকার ভন্ডুল করতে যাবে না এবং যাবার কারণও নাই। যদিও ওয়াজ মাহফিলের নামে আজকাল যা হচ্ছে তা কেবল নারী/ প্রগতিশীল মানুষ/ দেশের সম্মানিত মানুষদের কে নিয়ে গিবত ছাড়া কোরানের তাফসির পাওয়া কঠিন । এতটাই চরম পর্যায়ে চলে গেছে যে, বর্তমানে সরকারকে অনেক ওয়াজকারি মাওলানা (!) দের কে সতর্ক করতে বাধ্য হচ্ছে। বাঙালিরা ধর্মের প্রতি অনুগত থাকায়, কোনো দিন সেই সব ওয়াজ মাহফিল ভন্ডুলের চিন্তা মাথায় আনবে না। বোমা ফেলার কথা তো দূরে থাক। পুলিশ নিশ্চয়ই সেটা ভালো করেই জানে, সুতরাং পুলিশের সেখানে তেমন কোনো মাথা ব্যাথা নাই। অথচ পুলিশ কিন্তু ঠিকই জানে সেই সকল ফতোয়াবাজ ধর্মান্ধগোষ্ঠি সুযোগ পেলেই বাঙালির সংস্কৃতিকে আঘাত করবে। সেই চিন্তা থেকেই এত সাবধানতা গ্রহণ । তাহলে লক্ষ্যণীয় যে , সেই সকল ধর্মান্ধগোষ্ঠির নিকটও প্রশাসন কতটা পরাজিত হচ্ছে? সেই প্রশ্ন তোলাই জায়। এখন পহেলা বৈশাখ সময় বেঁধে দিচ্ছে , আগামীতে না বই মেলায় হাত বসায় , আমি আশ্চর্য হবো না।
কেন সেই সকল ধর্মান্ধগোষ্ঠী এতটা আশকারা পেল ? তার ব্যাখ্যা বিশদ। তবে ছোট্ট করে বলি, গত বছর হেফাজতের দাবীতে পাঠ্যসূচিতে এক ধরণের পরিবর্তন আনা এবং সেই সময়ে সেই সকল মোল্লারা জোর গলায় অগ্রিম বলে রেখেছিলো, আগামীতে ধীরে ধীরে ওদের সব দাবী পূরণ হবেই! লক্ষ্যণীয় যে গত কয়েকদিন পূর্বেই সেই সকল মোল্লাদের দাবীর পরিপ্রেক্ষীতে আবারো পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনা হয়েছে! কোনো সামঞ্জস্যতা না থাকা সত্ত্বেও মাদ্রাসার সার্টিফিকেট কে মাস্টার্স সার্টিফিকেটের মর্যাদা দেওয়া! এইভাবে যদি কেবলমাত্র রাজনৈতিক ফয়দা লুটতে তাদের কাছে মাথা নত করা হয়, তাহলে দেখা যাবে কোনো একদিন সেই সকল ধর্মান্ধগোষ্ঠি রাজনীতিবিদদের কুকর্মের যে ফল সংবিধানে বর্তমান আছে ,” রাষ্ট্রধর্ম ইসদাম” তার পরিপ্রেক্ষীতে শরিয়া আইন দাবী জোরালো করবে। যদিও বর্তমানে তা নানানভাবে নানান ফর্মে দাবী তুলে বসে আছে। সরকার কে ভালো করে ভাবতে হবে, দেশকে তারা কোনদিকে ধাবিত করতে চান? সরকার কে দ্বিতীয়বার ভালো করে ভাবা উচিত, আফগানিস্তান বা পাকিস্তান কোনো কল্যাণকর রাষ্ট্র নয়। যদিও বর্তমানে কেন জানি মনে হয় প্রগতিশীলরা ধর্মান্ধগোষ্ঠির নিকট ধরাশায়ী হচ্ছে!!! তবে একটা কথা জোর গলায় বলতে চাই, এই বাঙালি অন্যায়, অবিচার, ধর্মান্ধ জাতির বিরূদ্ধে রক্তদানে এই দেশ স্বাধীন করেছে, বীর বাঙালি কখনোই মাথা নত করবার নয়। সুতরাং আকাশে ক্ষণিকের মেঘ কালো হলেও, সময়ে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।
এই লেখা যখন প্রবাসে বসে লিখছি , ততক্ষণে বাংলাদেশে নববর্ষের শুভ আলোকিত সকাল শুরুর অপেক্ষায় । সমগ্র বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর জন্য শুদ্ধস্বর পত্রিকার সকল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানাই , ” নববর্ষের শুভেচ্ছা ” ।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক ,শুদ্ধস্বর ডটকম ।

