ফাতেমা জোহরা’র গল্প “নীল মেঘ”

পড়ন্ত বিকেল।সূর্যটা হেলে আছে গাছপালার ওপারে। সজল গাছপালায় আদিমতার ঘ্রাণ।ছাই ছাই মেঘের সাথে  মনের  উড়াউড়ি চলে।ছায়া ছায়া দুঃখী মেঘগুলো যেন  জলভরা মনের ভার নিয়ে চলে।যদি মেঘ  হতে  পারতাম ! আগরবাতির সুঘ্রাণ নির্জনতাকে বিদূর করে  দিচ্ছে।মনটা  খুব বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।ইচ্ছে করছে বাবার শীতল শয়ানের বেদীতে  বুকের সব পাষাণভার  বইয়ে দিই চোখের  জলে । ভাবনাগুলো  জট পাকিয়ে,জট খুলে যেন  সময়কে  অলসতা দিচ্ছে ।দূরে অস্পষ্ট কিছু কন্ঠ ক্রমে সরব হয়ে উঠছে।উৎকীর্ণ হয়ে উঠে মোমেনা।
বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত উঠে পড়ে  মোমেনা,ডাকে – জেবু ,জেবু । এ ঘর,সে ঘর খোঁজে ,কোত্থাও নেই।দৌড়ে সামনের  বারান্দায় আসে।কি কুক্ষণে যে ভুল
করে তালা লাগাইনি  গেটে।সে নিজেকে অভিসম্পাত দেয়। দেখে ,অদূরে  রাস্তার  উপর খাটো  ফ্রক  পরা   জেবুর  দুই  উরু বেয়ে রক্তিম ধারা । তার  হাত ও  রক্তবর্ণ।সে দুই হাত  সামনে উঁচিয়ে  ছুঁয়ে দিতে চাচ্ছে একদল দুষ্ট ছেলেমেয়ের  দলকে।পালটিও কম  নয় ,তারা নিরাপদ দূরত্বে খেপাচ্ছে  জেবুকে।চিৎকার আর শোর মিলিয়ে বিকেলটাকে খানখান  করে দিচ্ছে ।চোখ ভেঙে জল এসে গেল মোমেনার। অনেক  কষ্টে  নিজেকে   সামলে  এগিয়ে  গেল   মেয়ের  দিকে । কিছুতেই  তাকে  ধরা  যাচ্ছে  না । জোর  করার  তো  প্রশ্নই   আসে  না । ক্ষ্যাপা   মোষের  বল   যেন   ভর  করেছে   তার  উপর । অনেক   কষ্টে ,  আঁচড়  আর  কামড়  খেয়ে  ঘরে  নিয়ে  আসা  হলো  জেবুকে।  মাসের  এ কয়টা  দিন  জীবন  থেকে  মুছে  দিতে  পারলে  যেন  বাঁচে   মোমেনা । কিছুতেই   তাকে  প্যান্টি , ন্যাপকিন  পরানো   যাবে  না । জোর   করে  কাপড়ের   টুকরো  কোমড়ের  ঘুচনির  সাথে  প্যাচিয়ে   দিতে  হয় ।  সে  আর  কতক্ষণ !  সারা  ঘরে  , বিছানায়   ছোপ  ছোপ   দাগ ।খুব  বিব্রত  থাকতে   হয়  মোমেনাকে  এইসময়  । প্রাণপণে  প্রার্থনা  করে  কোন   অতিথি  যেন  না  আসে   বাড়িতে ।  নির্জন  বাড়ির  শূণ্যতা   তার  ভারাক্রান্ত  মনকে  আরো  নিঃসঙ্গ   করে  তোলে ।
বছর   তিনেকের   ফুটফুটে  মেয়ে  জেবা , শ্যাম বর্ণের , বড়  বড়  ডাগর  চোখে  যেন  চঞ্চল  প্রজাপতি  উড়ে  বেড়ায় । চমৎকার  ছড়া বলে।সবার  সাথে আপন হয়ে  যাবার  সহজাত গুণ আছে তার।ছটফটে স্বভাবের  মেয়েটি  সহজে  সবার  হৃদয় কাড়ে ।এক দুঃস্বপ্নের রাতে গা কাঁপিয়ে জ্বর আসলো জেবুর।চাকরিজীবী বাবার  শখ  হোমিওপ্যাথ চিকিৎসায়।ছালবাকল দিয়ে তরল ওষুধ আর পাউডারে মত মিক্সচার দিয়ে পুরিয়া বানান।মেয়েকে পাতলা সাগুর পথ্য  দিলেন  আর পাউডারের এক পুরিয়া ।সান্নিপাতিক জ্বরটা যেন হুহু করে বাড়ছে।থার্মোমিটারের কাঁচ ভেঙ্গে পড়ার মত অবস্থা!প্রলাপ বকে যাচ্ছে সে,কখনো কখনো ছড়া পর ছড়া।মায়ের মন, ফজরের আযান শেষ না  হতেই  মেয়েকে বুকে নিয়ে আঁধারের মধ্যে পুকুর,ঝোপঝাড় পেরিয়ে ছুটলেন ঐ পাড়ার ডাক্তার সাহেবের কাছে।
ধুপধাপ শব্দ দরজায়,খুব বিরক্ত হয়ে  দরজা  খুললো  পারভিন।কারণ রোগীদের সময়জ্ঞান  নিয়ে সে খুব ত্যাক্ত। তাকে অসময়ে দরজা খুলে দিতে হয়, বসতে বলতে হয়। নানুকে ( ডাক্তার ) ডাকতে গিয়ে মাঝে মাঝে কড়া ধমক  খেতে  হয়।
ডাক্তার ভাই ,ডাক্তার ভাই ,আপনার পায়ে পড়ি।আমার  জেবুকে সুস্থ করে দেন ,কান্না যেন গুমরে উঠে মোমেনার  গলায়।ডাক্তার  সাহেব হাত ছোঁয়ালেন কপালে।কপাল  কুঁচকে থার্মোমিটারে চেক করলেন জ্বর।সদা হাসিমুখ ডাক্তারের মুখে কুয়াশা।যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে  এডমিটের পরামর্শ  দিলেন।বাড়ি ফিরলেন না আর।আলো ফুটলে মেয়েকে  নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এডমিট  করালেন। এবার  কিছুটা  নিশ্চিন্ত বোধ করলেন  যেন। যাক,আর কোন বিপদ নেই।ডাক্তারের নিবিড় চিকিৎসা  আর মায়ের ঐকান্তিক শুশ্রূষায় ভাল হয়ে যাবে জেবু।কিন্তু ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।জ্বর ১০৪ ডিগ্রী  ছাড়িয়ে গেছিল রাতে ,যা মস্তিষ্কে  ইফেক্ট করে।হাসপাতাল থেকে যে মেয়েটি ফিরে এল ,সে আর প্রজাপতি রইলো না। তার মুখের ভাষা ডুব দিলো কোন গহ্বরে,চোখে চঞ্চলতা  হারিয়ে গেছে।ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে শূণ্যতা যেন থির হয়ে  আছে ।
দিন যায় , প্রহর পর প্রহর কাটে মোমেনার মেয়েকে নিয়ে।  ভরা বাড়ি ,শরিকি  কোন্দল ও বড় হয়ে উঠা  জেবুকে  নিয়ে  দুঃচিন্তাগুলো  নিঃসাড় করে দেয় তাকে।এ জীবন  যেন তার  নয়। জোয়াল কাঁধে  নিয়ে মন ও দেহের জোরে  টেনে চলছে  এক অনিশ্চিত জীবন । এক  এক  সময়  টান  আসে  ধৈর্যে । আর  পারে  না  বুঝি । কৌতূহলী  দৃষ্টির  আড়ালে  নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারলে  যেন  বাঁচে। সিদ্ধান্ত নেয় ,এখানে আর নয়।
গ্রামের শেষ প্রান্তে শাহ বাবাজীর মাঝার।মাঝারের পাশেই ছোট্ট এক টুকরো জমিতে ঠাঁই করে নিলো।নির্জনতাকে  আশ্রয় করে বাঁচার চেষ্টা করলো।জেবুর ছেলেমানুষি  চিৎকার,বাইরে বেরুনোর জন্য চেষ্টা সেই নির্জনতাকে  ভাঙ্গে না আর।জনমানুষের আড়ালে সুরক্ষার খাঁচায়  মেয়েকে নিয়ে এক বন্দীজীবন।আগরবাতির ঘ্রাণ সেই  নির্জনতাকে আরো বিদূর করে তোলে।এ এক অদৃশ্য খাঁচা, গুমরে গুমরে কাঁপে কষ্টের বিদীর্ণতায় বন্দী চিড়িয়া।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.