OLYMPUS DIGITAL CAMERA

বুলবুল তালুকদারের কলাম ” প্রতিশ্রুতি অতীব দূর্বল “

আজকের লেখা একটা গল্প দিয়ে শুরু করি । অবশ্য এটাকে গল্প বলা ঠিক হবে না , এটা একধরনের কাহিনী বটে । কাহিনীটি আমার প্রাণপ্রিয় আপন বড় ভাই খুব মজা করে বলতেন । উনি যেভাবে কাহিনীটি উপস্থাপন করতেন , লেখায় সেটা ফুঁটিয়ে তোলা সম্ভব নয় , তারপরেও চেষ্টা করচ্ছি :

কাহিনীটি এরকম , ব্রিটিশ আমলে থানায় কোনো এক ঘটনা কে জিডি ( জেনারেল ডাইরী) করার জন্য থানার দারোগার  ইংরেজিতে লেখা জিডি ।  ঘটনাটি দুই ভাইয়ের মধ্যে জমি সংক্রান্ত বিষয় এবং জমি নিয়ে মারামারি । থানার দারোগা এসে জিডিতে লিখছেন ইংরেজিতে , কিন্তু ইংরেজিতে দূর্বল হলে যা হয় ।

” ছবির উদ্দিন এন্ড দবির উদ্দিন আর টু ব্রাদার্স । দে ডু মারামারি বিকোজ্ অফ বীন্নাছোবা । দে ফাইট অন দি ক্ষেতের আইল । ছবির উদ্দিন দিলো কোপ অন দি হেড দবির উদ্দিন ,  উইথ্ দি দাউ , দেন দবির উদ্দিন ব্লিডিং । উই কট ছবির উদ্দিন উইথ্ লুঙ্গি পড়া এন্ড দবির উদ্দিন সেন্ড হসপিটাল …..  ইত্যাদি ইত্যাদি ।

কথায় বলে না , ভাত রান্না করতে সব ভাত টিপতে হয় না । নির্বাচনের বাজারে নতুন ফ্রন্ট শুক্কুরে শুক্কুরে তিনদিন যেতে না যেতেই মনে হচ্ছে কাহিনির দারোগার মতন অবস্থা । প্রতিশ্রুতির খুঁটি ভীষণ দূর্বল লাগছে । দুটা টিভি টকশোর উদহারণ দিলে মোটামুটি বুঝা যাবে ।

লক্ষ্য করুণ , ফ্রন্ট ঘোষণার একদিন পরে মাননীয় বি চৌধুরীর ছেলে মাহী বি চৌধুরীর আগমন ঘটে ইনডিপেন্ডেন্ট টিভির পর্দায় । সৌভাগ্যক্রমে টকশোটি আমার দেখা হয়েছে ।  যেহেতু কেবলি যুক্তফ্রন্ট ঘোষণা এসেছে , তাই একটু দেখারও বেশ আগ্রহ হলো । দেখলাম আর ভাবলাম বাহ্ কি চমত্কার  ।

মাহী বি চৌধুরীর ভাষ্যনুযায়ী , জামাত নামক দলটিকে মাননীয় খালেদা জিয়া  একক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপি জোটভুক্ত করেছেন ।  খালেদা জিয়া স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং এ বিষয়টি জানিয়ে দিলেন মাত্র । লক্ষ্যণীয় সেই মিটিং এ কেউ কোনো প্রতিবাদ করলেন না ।  সেই প্রতিবাদ না করার বিষয়টি যে ওনার পিতার ভুল ছিলো ,  সেই ভুলটি মাননীয় বি চৌধুরী সাহেব এখন অনুধাবন করেন  এবং বিব্রত হন , বলে জানালেন  !  মাহী বি চৌধুরী স্পষ্টই বললেন , ওনার পিতার পক্ষ থেকে উনি জাতির নিকট ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন ।  পিতার পক্ষ থেকে জাতির নিকট ভুলের ক্ষমা চাওয়া অবশ্যই গ্রহণযোগ্য । এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই ।  প্রশ্নটি একেবারেই ভিন্ন জায়গায়

১ ) মাননীয় বি চৌধুরী সাহেব যদি সত্যি সত্যি উপলব্ধি করেন , সেদিন প্রতিবাদ না করা ভুল ছিলো । তাহলে উনি নিজেই জাতির কাছে বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন না কেন ?

২ ) ওনার দল বিকল্প ধারার দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি মেজর মান্নান সাহেব , যিনি পাকিস্তান আর্মির পক্ষ হয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন , এই মেজর মান্নান এর ব্যাপারে বি চৌধুরী সাহেবের কি ব্যাখ্যা  আছে ?

৩ ) ২০০১ সালে বিএনপি – জামাত জোট ভোটে বিশাল ব্যবধানে যখন জয়ী হয়েছিলো  , সেই সময়ে বিবিসি বাংলায় বি চৌধুরী সাহেবের এক সাক্ষাত্কার নিজ কানে শুনেছিলাম  । সেই সাক্ষাত্কারে এক প্রশ্ন ছিলো জামাতকে মন্ত্রীত্ব দেওয়া হবে কিনা ? যদি মন্ত্রীত্ব দেওয়া হয় , তাহলে  তাদের গাড়িতেও জাতীয় পতাকা উঠবে । উত্তরে বি চৌধুরী সাহেব ওনার অতি প্রাঞ্জল বাংলা ভাষায় বলেছিলেন , ” দিতে হবে না , না দিলে বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে যাবে না ?” বিশ্বাস না হয় সেই সময়ে ভোটের সন্ধ্যায় বিবিসির রেকর্ড খুঁজে দেখতে পারেন ।

৪ ) মাহী বি চৌধুরী সাহেব প্রশ্ন করা যাবে কি ,  আপনি আপনার পিতা সমন্বয়ে যে কথা বললেন ” তিনি অনুতপ্ত ”  এটা কি এখন আমাদের বিশ্বাস করতে হবে ? নাকি এখানে রাজনীতি আছে ?  ভেবে দেখুন , আপনার পিতা প্রতিবাদ করেন নি , এখন অনুতপ্ত! কিন্তু সেই সময়ে উনি জামাত কে মন্ত্রীত্ব এবং পতাকা দিতে দু- পা এগিয়ে ছিলেন ? কি বলবেন এই বিষয়ে  ?

৫ ) মাহী বি সাহেব আমরা কি বলতে পারি , সেই সময়ে বি চৌধুরী সাহেব দেশের প্রেসিডেনট হওয়ার জন্য সবকিছুকেই তুচ্ছ ভেবেছিলেন ? এবং সফলও হয়েছিলেন ।  এখন কেন শুধু শুধু অন্যের উপরে দোষ চাপানো ? ব্যাখ্যা দিতে পারবেন কি ?

এখন বলি দ্বিতীয় টকশোর বিষয়ে । এই টকশোটি যমুনা টিভিতে মাননীয় ডঃ কামাল হোসেন সাহেবের ।  উপস্থাপকের প্রশ্ন ছিলো বিকল্প ধারার মেজর মান্নান সাহেব যে দলে আছেন , সেই দলের সাথে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা কি প্রশ্নবোধক রয়ে যায় কিনা ? মাননীয় কামাল হোসেন সাহেবের উত্তরটি ছিলো একেবারে গধবাঁধা। আমরা দলের সাথে ( বিকল্প ধারা) জোটভুক্ত হয়েছি । দ্বিতীয় প্রশ্নটিও কাছাকাছি প্রশ্ন । এরশাদ সাহেবের দলকে নিয়ে । জাতীয় পার্টির সাথে কোনো ঐক্য হতে পারে কি ? এখানেও উত্তর একই  , রাজনৈতিক দলের সাথে ঐক্য হওয়ায় কোনো বাঁধা নাই । লক্ষ্যণীয় যে এই উত্তর গুলো থেকেই বুঝা যায়, প্রতিশ্রুতি কত দূর্বল  !  শোনা যাচ্ছিলো , যুক্তফ্রন্ট আর যাই করুক জামাত যতদিন বিএনপির সাথে আছে , ততদিন যুক্তফ্রন্টের সাথে কোনো ঐক্য হবে না । ডঃ কামাল হোসেন সাহেবের কথা শুনে তা মোটেও মনে হয়নি । এই জোটে শ্রদ্ধেয় মাহমুদুর রহমান মান্না ভাই এর নাগরিক ঐক্যেও আছে । ইদানিংকালে মান্না ভাইয়ের অনেক দৃঢ় প্রত্যয়ের বক্তব্য সোসাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে । অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে । কিন্তু যুক্তফ্রন্টের ভবিষ্যত কোন দিকে ধাবিত হওয়া দরকার, তার কোনো সঠিক স্পষ্ট বক্তব্য মান্না ভাইয়ের নিকট থেকে এখনও আসেনি । এখানে বলা ভালো মান্না ভাই আবার এই ফ্রন্টে বয়সের দিক দিয়ে সর্ব কনিষ্ঠ বটে । তারপরেও বলবো , মান্না ভাইয়ের রাজনৈতিক দল নাগরিক ঐক্যের স্বকীয়তায় যুক্তফ্রন্টের  বিষয়টি  পরিষ্কার করলে ভালো ।

শেষে বলবো , যেহেতু যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন কালিন সময়ে গঠিত হয়েছে , তাই আমাদের মত সাধারন জনগনের আগ্রহটি একটু বেশিই বটে । কেননা নির্বাচন সামনে ,  জামাত, হেফাজত, পীর, ওলি আউলিয়াদের ভোটের  কিছুটা হিসেব নিকেস তো আছেই বটে ! তাই আগামীতে কি হতে যাচ্ছে , দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক ,শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.