বারো বছরের কেভিন জন্মের পর থেকেই ছটফটে। কখনই চুপচাপ থাকতে পারে না। পাঁচ মিনিটও কোথাও বসে না! স্কুলে মাষ্টাররা তাকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে যান। বাড়িতে মা সেরীল প্রতি মুহূর্তেই আতংকে থাকেন, কখন কোন অঘটন করে ও! বলেন, ও যে আমাকে জ্বালাতেই আসছে তা বুঝতাম পেটে যখন অনবরত হাত পা ছোঁড়াছুড়ি করে আমাকে পেরেশান করতো। বাবা কনরাড একটি ভালো ফার্মের ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি। সব সময় কোম্পানীর গাড়িতে জার্মানি আর আশে পাশের দেশগুলি চষে বেড়ান। তাদের অনেক প্রডাক্ট, ইলেক্ট্রনিক। এসব জিনিসের প্রতিদ্বন্দি অনেক। পঁচিশটি ইউরোপিয়ান কম্যুনিটি অন্তর্ভুক্ত দেশগুলিতে একই মুদ্রার চলন। কোন সীমান্ত নেই। ব্যবসায় তাই কম্পিটিশান অনেক বেড়ে গেছে। মাঝে মাঝে শনি-রবিবারেও কনরাড বাড়িতে আসতে পারে না। মোট কথা একমাত্র সন্তান কেভিনকে একা মাকেই সামলাতে হয়। গত বছর সেরীলের বাবা কিছুদিন রোগে ভূগে হঠাৎ মারা গেলেন। সেরীলের মা তাকে দশ বছরের রেখে মারা যাবার পর, বাবা আর বিয়ে করেন নি। মেয়েকে বড় করে, পড়াশুনা করিয়ে, তার বিয়ের পর মেয়ের সাথেই থাকতেন। বাড়িটাও তারই। সেরীলই একমাত্র সন্তান। ওরা গত পাঁচ পুরুষ এক সন্তানেরই পরিবার।
কনরাড বহুবার বলেও সেরীলকে আরেকটি সন্তান ধারনে রাজি করাতে পারে নি। তার কথা, আমাদের পরিবারের এতদিনের ঐতিহ্য আমি নষ্ট করবো না। তারপর দিন দিন কেভিন যেরকম দুরন্ত হয়ে উঠল, তার কোন ভাই বা বোন এলে সংকট আর ঝামেলা যে আরও বাড়বে তাতে এখন স্বামী স্ত্রী দুজনেই একমত।
দাদুর মৃত্যুর পর কেভিনের চাঞ্চল্য একটু কমে গেল। দাদুর ঘরে প্রায়ই গিয়ে ওর বড় সোফাটিতে চুপ করে বসে থাকে। সেরীল বাবার ঘরটি আগের মত করেই রেখে দিয়েছে। বিছানার চাদর বালিশ নিয়মিত বদলায়। টেবিল, চেয়ার, র্যাক পরিষ্কার করে। দিনে জানালা দরজা খুলে দেয়। হাওয়া চলাচল করে। বাবার মৃত্যুকে সে এখনও মেনে নিতে পারে নি। বাড়ির পরিবেশে সে কোন পরিবর্তন আনে নি। সব কিছু দেখে মনে হয় ওর বাবা বাইরে গেছে, এখনি ফিরবে। কনরাড কিছু বলতে গেলে, সেরীল এমন করুণভাবে তাকায় যে ও প্রসঙ্গ বাদ দেয়। শ্বশুর মারা যাবার পর ও ভেবেছিল ওর ঘরটিতে সে তার কাজকর্ম করবে। এখনকার কাজের জায়গাটি খুব ছোট। দাদুর ঘরটিই বাড়ির মধ্যে সবচাইতে বড়। কিন্ত যেভাবে সেরীল বাপের ঘরের যতœ-আত্তি করে, প্রস্তাবটি করাররই সাহস পায় নি।
বাইরে খেলতে খেলতে কেভিন হঠাৎ বসার ঘরে এসে দেয়ালে শিল্পির আঁকা দাদুর বড় লাইফ-পোট্রেটটির দিকে একভাবে চেয়ে থাকে অনেক্ষণ। মা সেরীলের দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল। কি ব্যাপার! এটাতো ওর প্রকৃতির সাথে মোটেই মেলে না। কেভিন ১০/১২ মিনিট দাদুর ঘরে বসে আছে বা তার ছবির সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে! তাকে যারা কাছে থেকে চিনত, চোখে না দেখা পর্যন্ত বিশ্বাস করতে চাইত না। স্কুলে কেভিনের টিচার মিসেস রাখেল টেলিফোনে সেরীলকে জানালেন, কয়েকমাস ধরে কেভিন ছুটির সময় আগের মত খেলাধূলা করে না। মাঝে মাঝেই একা একা মাঠের বড় বার্চ গাছটির নিচে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। ক্লাসেও আর আগের মত হৈ চৈ করে না। তিনি এটা ভালো মনে করছেন না। তাকে পরামর্শ দিলেন কোন শিশু-সাইকোলজিস্টের কাছে কেভিনকে নিয়ে যেতে। কনরাড শুনে বলল, কেভিন দুষ্টামি করলে তুমিই তো অনুযোগ করো, ও কেন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতে পারে না। এখন তাই করে মাঝে মাঝে। কিন্ত এতেও তোমার চিন্তা! বয়স বাড়ছে ওর। এখন একটু শান্ত তো হবেই। সেরীল এ ব্যাখ্যায় খুশি হতে পারে না। তার মনে হয়, কেভিন একটু অচেনা হয়ে যাচ্ছে। সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করবে, বাসনপত্র ভাঙবে, চেঁচিয়ে কথা বলবে, খেতে বসে অল্প খেয়েই উঠে যেতে নানা রকম বাহানা করবে। এই কেভিনকেই সে জন্মের পর থেকে চেনে। এখন খাওয়ার সময় শান্ত হয়ে সব খেয়ে তারপর উঠে। মার তো এতে খুশি হবারই কথা। খোশামদ ছাড়াই্ ছেলে পেটপুরে খাচ্ছে। কিন্ত সেরীলের মন মানে না। আগে কথার খই ফুটতো মুখে। এখন অনেক সময় কিছু জিজ্ঞেস করলেও কোন উত্তর দেয় না। মাঝে মাঝে একদিকে চেয়ে থাকে, কোথায় তা ও নিজেই জানে না। চোখদুটি কেমন নি®প্রান মনে হয়। মনে হয় ও এখানে থেকেও এখানে নেই। মনের তরী বেয়ে কোথাও দূরে চলে গেছে। মা বলেন, কেভিন, কী দেখছিস? কেভিন বলে, না কিছু না। বলে উঠে যায়। আর কিছুই বলে না। মা শংকিত হয়ে উঠেন। দিন দিনই ছেলেটা অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে।
আবদুল্লাহ আল-হারুন
লেখক এবং কথাসাহিত্যিক

