১৯৭২ সাল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তখন নানা পরিবর্তন, ভাঙাগড়া ও নতুন স্বপ্নের সময়। স্বাধীনতার পর দেশকে নিয়ে মানুষের মনে ছিল অনেক প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা। সেই সময়েই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। আমি ছিলাম আ স ম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের অংশে।
সেই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর, শিক্ষা দিবসে ঢাকার পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের এক জনসভায় আ স ম আবদুর রবের ভাষণ শুনেছিলাম। সেদিনের সেই পড়ন্ত বিকেল আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা, নতুন পথের সন্ধান এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে কিছু করার আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত খুঁজে পেয়েছিলাম। আমরা যারা সেদিন পল্টন ময়দানে উপস্থিত ছিলাম, তাঁর ভাষণে উদ্বেলিত হয়েছিলাম, আলোড়িত হয়েছিলাম নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনার ভাবনায়।
সময়ের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদ। তখন আমি কিশোর। সেই কিশোর বয়সেই জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ি। রাজনীতির পথচলা শুরু হয়েছিল আবেগ, বিশ্বাস, স্বপ্ন আর দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা থেকে।
আজ পেছন ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, রাজনীতির সেই দিনগুলো শুধু মিছিল, সভা-সমাবেশ কিংবা স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেসব দিনের মধ্য দিয়েই শিখেছি মানুষের সঙ্গে মিশতে, মানুষের কথা শুনতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে, নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়াতে এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখতে। রাজনৈতিক জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, ভুল-শুদ্ধ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছে আমার চিন্তা ও উপলব্ধির জগৎ।
জাসদের রাজনীতির সবকিছু নিয়ে হয়তো আজও প্রশ্ন আছে, মতভেদ আছে, মূল্যায়নের ভিন্নতা আছে। সময়ের বিচারে কোনো রাজনৈতিক দলের সব সিদ্ধান্ত বা ভূমিকা যে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে, এমন নয়। আমিও ইতিহাসের সবকিছুকে নির্ভুল বলে দাবি করি না। কিন্তু একটি কথা অকপটে স্বীকার করি—জাসদের রাজনীতি থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। জাসদ ছিল আমার রাজনৈতিক পাঠশালা। এই পাঠশালার অভিজ্ঞতা আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
জাসদের রাজনীতির সেই দিনগুলোতে কত ভাই, কত বন্ধু, কত সহযোদ্ধার সঙ্গে পথ চলেছি! কত স্বপ্ন দেখেছি, কত আলোচনা করেছি, কত মিছিল-সমাবেশে একসঙ্গে দাঁড়িয়েছি। আমাদের সবার চিন্তা ও পথচলা এক রকম ছিল না, সময়ের সঙ্গে অনেকেই ভিন্ন পথে গেছেন। কিন্তু একসময়কার সেই বন্ধন, সেই সংগ্রামী দিনগুলোর স্মৃতি আজও হৃদয়ের গভীরে অমলিন হয়ে আছে।
জাসদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আজ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি সেই সব সহযোদ্ধাকে, যাঁরা অকালে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁদের অনেকেরই হয়তো আরও অনেক পথ চলার কথা ছিল, আরও অনেক স্বপ্ন দেখার কথা ছিল। কিন্তু সময় তাঁদের থামিয়ে দিয়েছে। তাঁরা আজ আমাদের মাঝে নেই, অথচ তাঁদের স্মৃতি রয়ে গেছে আমাদের জীবনের সঙ্গে, আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে, আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোর সঙ্গে।
যাঁরা আজও বেঁচে আছেন, যাঁরা সেই দিনগুলোর স্মৃতি বুকে নিয়ে জীবন পার করছেন, তাঁদের সবার প্রতি রইল আন্তরিক শুভকামনা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। মত ও পথের পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু আমাদের যৌবনের স্মৃতি, একসঙ্গে পথচলার অভিজ্ঞতা এবং জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের অংশীদারত্বকে অস্বীকার করার উপায় নেই।
জীবনের এই পর্যায়ে এসে উপলব্ধি করি, সময় বদলায়, রাজনীতির ভাষা বদলায়, মানুষের চিন্তা ও অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু জীবনের ফেলে আসা অধ্যায়গুলো কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সেগুলো আমাদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে, আমাদের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে, আমাদের অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র তৈরি করে।
জাসদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্মদিনকে স্মরণ করছি না; স্মরণ করছি আমার কৈশোর, আমার রাজনৈতিক জীবনের সূচনালগ্ন, আমার একঝাঁক সহযোদ্ধা এবং আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে।
সেই দিনগুলোর জন্য ভালোবাসা।
হারিয়ে যাওয়া সহযোদ্ধাদের জন্য গভীর শ্রদ্ধা।
বেঁচে থাকা সকলের জন্য শুভকামনা।
জাসদ আমার জীবনের ইতিহাসের একটি অংশ, আর সেই ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে আমার কৈশোর, আমার স্বপ্ন, আমার সংগ্রাম এবং আমার অসংখ্য প্রিয় মানুষের নাম।
হাবিব বাবুল , ৭০ দশকের জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের সংগঠক ।

