সার্বিয়ার শিক্ষা : ক্ষমতার কাছে নতিস্বীকার, নাকি সত্যের পক্ষে সাহসী সাংবাদিকতা ?

 

সার্বিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম রেডিও টেলিভিশন অব ভোজভোদিনার (আরটিভি) পক্ষ থেকে দর্শকদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন একপেশে সংবাদ পরিবেশন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীরবতা এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতি সমালোচনাহীন অবস্থানের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন ওই সম্প্রচারমাধ্যমের একজন সংবাদ উপস্থাপক। এর পর সম্প্রচারমাধ্যমটির একজন শীর্ষ সম্পাদকও পদত্যাগ করেছেন। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সার্বিয়ার এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি দেশের গণমাধ্যমের আত্মসমালোচনার ঘটনা নয়। এটি বিশ্বজুড়ে সরকার-অনুগত সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাই সাংবাদিকতার সাফল্য নয়; বরং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সাহস, জনগণের পক্ষে সত্য তুলে ধরা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি।

সার্বিয়ায় ২০২৪ সালে নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর পর ছাত্রদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমে বিস্তৃত হয়। প্রায় দুই বছরের প্রতিবাদের পর ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবরের সংসদ নির্বাচনে ছাত্রসমর্থিত ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। প্রাথমিক ফলাফলে তারা ২৫০ আসনের সংসদে প্রায় ১৪০টি আসন পেয়েছে বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা আলেকসান্দার ভুচিচের রাজনৈতিক শিবিরের পরাজয়ের পরই গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনার বিষয়টি সামনে আসে।

আরটিভির সংবাদ উপস্থাপক গোরান এরর স্বীকার করেন, বছরের পর বছর সংবাদমাধ্যমটি তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। অনেক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, একপেশে তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে, সমালোচনামূলক প্রশ্ন তোলা হয়নি। দর্শকদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি যে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন, তা সাংবাদিকতার নৈতিকতার প্রশ্নে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রশ্ন হলো, ক্ষমতাসীনদের পরাজয়ের পরই কেন গণমাধ্যমের এই আত্মোপলব্ধি সামনে আসে? ক্ষমতায় থাকাকালে যে সত্য উচ্চারণ করা সম্ভব হয়নি, ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই সত্য স্বীকার করার প্রয়োজন কেন দেখা দেয়?

এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার গভীর সংকট।

গণতন্ত্রে গণমাধ্যমকে প্রায়ই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। আইনসভা আইন তৈরি করে, নির্বাহী বিভাগ রাষ্ট্র পরিচালনা করে, বিচার বিভাগ আইন ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ভূমিকা রাখে। আর গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো এই তিনটি প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষমতাকেন্দ্রের কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে তুলে ধরা। কোথায় অনিয়ম হচ্ছে, কারা জনগণের অধিকার লঙ্ঘন করছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, ক্ষমতাবানরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান কাজ।

কিন্তু গণমাধ্যম যখন ক্ষমতাসীনদের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভটি নিজের দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়। সংবাদ তখন আর জনগণের জানার মাধ্যম থাকে না; হয়ে ওঠে ক্ষমতার ভাবমূর্তি রক্ষার হাতিয়ার। সরকারের সাফল্য বড় করে দেখানো হয়, ব্যর্থতা আড়াল করা হয়, বিরোধীদের বক্তব্যকে গুরুত্বহীন করে তোলা হয় এবং নাগরিকদের অসন্তোষকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এভাবে সংবাদমাধ্যমের পর্দায় একটি কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি হয়, যার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবতার দূরত্ব ক্রমেই বাড়তে থাকে।

সরকার-অনুগত বিশ্বমাধ্যমের জন্য শিক্ষা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমের মালিকানা, বিজ্ঞাপন, রাষ্ট্রীয় অনুদান, লাইসেন্স এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধের ভয় দেখানো হয়, কোথাও মালিকপক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থ সংবাদ পরিবেশনায় প্রভাব ফেলে, কোথাও সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা হয়। আবার কোথাও সংবাদমাধ্যমের ভেতরেই এমন এক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যেখানে ক্ষমতাসীনদের অসন্তুষ্ট করতে পারে—এমন প্রশ্ন না করাই নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়।

এ ধরনের পরিবেশে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় নীরবে। প্রতিটি সংবাদ সরাসরি মিথ্যা না হলেও সংবাদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সত্যকে আড়াল করা সম্ভব। কোনো ঘটনা প্রকাশ না করা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দেওয়া, একটি পক্ষের বক্তব্যকে প্রাধান্য দেওয়া কিংবা সমালোচনাকে অযৌক্তিক বিতর্ক হিসেবে উপস্থাপন করাও জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।

সুতরাং, গণমাধ্যমের পক্ষপাত শুধু মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে, কোনটি চাপা পড়ছে এবং কোন কণ্ঠস্বরকে জনপরিসর থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের প্রশংসা করা সাংবাদিকতার অপরাধ নয়। সরকার ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করা অবশ্যই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু সেই প্রশংসা যদি সমালোচনাকে নিষিদ্ধ করে, ভুলকে আড়াল করে এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির বাইরে রাখে, তখন তা আর স্বাধীন সাংবাদিকতা থাকে না।

একটি স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারবিরোধী হওয়ার জন্য স্বাধীন নয়; স্বাধীন হওয়ার জন্যই তার সরকারকে সমর্থন বা সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। তার আনুগত্য কোনো রাজনৈতিক দল, সরকার, মালিক বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছে নয়—তার আনুগত্য সত্য, জনস্বার্থ ও পেশাগত নীতির কাছে।

জনগণের অর্থে পরিচালিত গণমাধ্যমের দায় আরও বেশি

সরকারি বা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত সম্প্রচারমাধ্যমের দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের অর্থ মানে জনগণের অর্থ। ফলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের কাজ সরকারের বক্তব্য প্রচার করেই দায়িত্ব শেষ করা নয়। সেখানে সরকার ও বিরোধী পক্ষের বক্তব্য, নাগরিক সমাজের মতামত, ভিন্নমত এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের ন্যায্য জায়গা থাকা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আর সরকারি গণমাধ্যমের মধ্যে এই পার্থক্যটি বুঝতে হবে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মালিকানা বা অর্থায়নের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তার সম্পাদকীয় নীতি কোনো নির্দিষ্ট সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থের অধীন হতে পারে না।

সরকার পরিবর্তন হলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের অবস্থানও যদি নতুন ক্ষমতাসীনদের অনুকূলে বদলে যায়, তাহলে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি তার স্বাধীন ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেনি। আজ এক সরকারের প্রচার, কাল আরেক সরকারের প্রচার—এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়; এটি ক্ষমতার সঙ্গে অবস্থান বদলের কৌশল।

সার্বিয়ার অভিজ্ঞতার গুরুত্ব এখানেই। একটি গণমাধ্যম যখন নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে, তখন সেই স্বীকারোক্তি ইতিবাচক হলেও সেটিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ক্ষমা চাওয়া নৈতিক পুনরুদ্ধারের সূচনা হতে পারে, কিন্তু হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

সাংবাদিকতার প্রথম দায়িত্ব সত্যের প্রতি

একজন সাংবাদিকের কাজ কেবল সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকা, সরকারি বিবৃতি সংগ্রহ করা কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য প্রচার করা নয়। তার কাজ হলো বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা, তথ্যের পেছনের তথ্য অনুসন্ধান করা এবং যেসব প্রশ্নের উত্তর ক্ষমতাবানরা এড়িয়ে যেতে চান, সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।

সরকার বললেই কোনো তথ্য সত্য হয়ে যায় না। বিরোধী দল অভিযোগ তুললেই সেটি প্রমাণিত সত্য হয়ে যায় না। সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা, প্রমাণ সংগ্রহ করা, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং পাঠক বা দর্শককে বাস্তবতা বোঝার মতো তথ্য সরবরাহ করা।

এখানে নিরপেক্ষতার অর্থ অন্যায় ও ন্যায়ের মধ্যে কৃত্রিম ভারসাম্য তৈরি করা নয়। কোনো বিষয়ে প্রমাণ যদি এক পক্ষের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে শুধু ভারসাম্য রক্ষার অজুহাতে অপর পক্ষের সমান বক্তব্য জুড়ে দেওয়াই পেশাদারিত্ব নয়। বরং প্রমাণের শক্তি অনুযায়ী সত্যকে তুলে ধরাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।

একই সঙ্গে সাংবাদিকদের মনে রাখতে হবে, সমালোচনা মানেই শত্রুতা নয়। সরকারের কোনো নীতির সমালোচনা করা রাষ্ট্রের বিরোধিতা নয়। দুর্নীতির তদন্ত দাবি করা উন্নয়নবিরোধিতা নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর প্রকাশ করা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার ষড়যন্ত্র নয়। বরং এসব প্রশ্নের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলা সম্ভব।

ভুল স্বীকারের সাহস এবং আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন

সার্বিয়ার সংবাদমাধ্যমের ক্ষমাপ্রার্থনার ঘটনাটি থেকে আরেকটি শিক্ষা নেওয়া জরুরি। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা শুধু সরকারের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের বিষয় নয়; গণমাধ্যমের ভেতরেও স্বাধীনতার পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

সম্পাদক যদি মালিকের রাজনৈতিক পছন্দের বাইরে চিন্তা করতে না পারেন, সাংবাদিক যদি চাকরি হারানোর ভয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ এড়িয়ে যান, সংবাদকক্ষ যদি ভিন্নমতকে সহ্য করতে না পারে, তাহলে কেবল স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

প্রয়োজন স্বচ্ছ সম্পাদকীয় নীতি, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, সংবাদ ও মতামতের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য, ভুল সংবাদ সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা এবং পাঠক-দর্শকের অভিযোগ শোনার সংস্কৃতি। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের মালিকানা, স্বার্থের সংঘাত এবং রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক প্রভাব সম্পর্কেও স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।

কোনো গণমাধ্যম ভুল করতে পারে। ভুল সংবাদ প্রকাশিত হলে তা সংশোধন করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ দেওয়া পেশাগত দায়িত্ব। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে একপেশে সংবাদ পরিবেশন করে পরে শুধু ক্ষমা চেয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। আত্মসমালোচনার প্রমাণ দিতে হয় কাজের মাধ্যমে।

সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা একদিনে তৈরি হয় না, আবার একদিনেই সম্পূর্ণ ফিরে আসে না। তা তৈরি হয় প্রতিদিনের সংবাদ নির্বাচন, তথ্য যাচাই, ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করা এবং জনগণের জানার অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়ে।

ক্ষমতা বদলায়, সত্যের দায়িত্ব বদলায় না

সার্বিয়ার রাজনৈতিক পালাবদল এবং গণমাধ্যমের আত্মসমালোচনা বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে: সংবাদমাধ্যম কি ক্ষমতাকে রক্ষা করবে, নাকি জনগণকে ক্ষমতার প্রকৃত চেহারা দেখাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর কোনো দলের জয়-পরাজয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। আজ যে দল ক্ষমতায়, আগামীকাল সে দল বিরোধী দলে যেতে পারে। আজ যে নেতা জনপ্রিয়, আগামীকাল তার নীতির সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু জনগণের জানার অধিকার এবং সাংবাদিকতার দায়িত্ব সব সময়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ছাত্রদের আন্দোলন, নাগরিকদের প্রতিবাদ কিংবা নির্বাচনের ফলাফল কোনো গণমাধ্যমের স্বাধীনতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। আসল মাপকাঠি হলো, ক্ষমতাসীনদের শক্তিশালী অবস্থানের সময়েও সংবাদমাধ্যম কতটা সত্য বলতে পেরেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কতটা দাঁড়িয়েছে এবং জনগণের প্রশ্নকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছে।

গণমাধ্যমের কাজ জনগণকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিচালিত করা নয়; বরং সঠিক তথ্য দিয়ে তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সংবাদমাধ্যমের ভবন, প্রযুক্তি, প্রচারসংখ্যা কিংবা দর্শকসংখ্যা যত বড়ই হোক, তার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

সার্বিয়ার ঘটনাটি তাই বিশ্বের সরকার-অনুগত গণমাধ্যমগুলোর জন্য একটি আয়না। সেই আয়নায় নিজেদের অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন। প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি সত্য তুলে ধরছি, নাকি ক্ষমতার পছন্দমতো সত্যের একটি সংস্করণ তৈরি করছি? আমরা কি জনগণের কণ্ঠস্বরকে জায়গা দিচ্ছি, নাকি তাদের প্রশ্নকে আড়াল করছি? আমরা কি ভুল হলে তা স্বীকার করতে প্রস্তুত, নাকি ক্ষমতার ছায়ায় থেকে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছি?

গণতন্ত্রে সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, পেশাগত সততা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতার নৈকট্য নয়, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। আর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কেবল ভুল সংবাদ প্রকাশ করা নয়—সত্য জানা সত্ত্বেও ভয়ে, স্বার্থে কিংবা আনুগত্যে তা প্রকাশ না করা।

যে গণমাধ্যম এই সত্য উপলব্ধি করতে পারবে, তার জন্য ক্ষমা চাওয়া শেষ কথা হবে না; বরং সেখান থেকেই শুরু হবে নতুন করে বিশ্বাস অর্জনের যাত্রা।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম
ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.