জাতিসংঘে বক্তৃতা, বৈঠক ও ছবির বাইরে বাংলাদেশের অর্জন কোথায় ?

 

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন যেন প্রতিবছরই বিশ্বরাজনীতির এক বিশাল মঞ্চ। নিউইয়র্কে বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সমাবেশ, একের পর এক বক্তৃতা, করমর্দন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, নৈশভোজ, ছবি—সব মিলিয়ে কয়েক দিনের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে জাতিসংঘ সদর দপ্তর। কিন্তু অধিবেশন শেষ হওয়ার পর প্রশ্নটি থেকে যায়—এসব আয়োজনের বাস্তব ফলাফল কী?

আরও কঠিন প্রশ্ন হলো, বিশ্বের এত যুদ্ধ, সংঘাত, গণহত্যা, শরণার্থী সংকট, দারিদ্র্য ও জলবায়ু বিপর্যয়ের মধ্যে জাতিসংঘ আসলে কতটা কার্যকর?

২০২৬ সালের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনও সেই পুরোনো প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন মোকাবিলা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’। অথচ অধিবেশন চলাকালেই বিশ্ব দেখছে একের পর এক ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং বড় শক্তিগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থান।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এবার জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর ভাষণে বাংলাদেশ, বিশ্বশান্তি, সংলাপ, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা উঠে এসেছে। কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের মূল্যায়ন কি শুধু বক্তৃতার বিষয়বস্তু দিয়ে করা যায় ? অবশ্যই যায় না।

সরকারি হিসাব বলছে, নিউইয়র্ক সফরে তারেক রহমান মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ছিল জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট আটটি অনুষ্ঠান, চারটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট এবং ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হয়েছে। আলোচনায় ছিল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক শান্তি।

অর্থাৎ এটিকে নিছক ‘ভাষণ দিয়ে ফিরে আসা’ বলা ঠিক হবে না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই ৩০টি কর্মসূচি এবং ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক থেকে বাংলাদেশ কী পেল?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি।

তারেক রহমান তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, ক্রোয়েশিয়া, হাইতি, ভুটান ও থাইল্যান্ডের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ, ইউএনএইচসিআরের প্রধান বারহাম সালেহ এবং মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্কের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হয়েছে।

এসব বৈঠকের কূটনৈতিক মূল্য আছে। কিন্তু বৈঠক নিজে কোনো অর্জন নয়; অর্জনের সম্ভাবনা তৈরি করাই বৈঠকের প্রথম ধাপ।

উদাহরণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশকে ধরা যাক। কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তারেক রহমানকে নিজ নিজ দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাত, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক কূটনৈতিক বার্তা। কিন্তু আমন্ত্রণ আর বিনিয়োগ এক নয়। আলোচনা আর চুক্তি এক নয়। চুক্তি আর বাস্তবায়নও এক নয়। বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ, নতুন শ্রমবাজার, জ্বালানি সুবিধা বা বড় কোনো অর্থনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তখন বলা যাবে নিউইয়র্ক সফর বাস্তব ফল দিয়েছে।

একই কথা প্রযোজ্য রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে। জাতিসংঘ মহাসচিব এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা এখনো মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারেনি। অতএব নিউইয়র্কের বৈঠক আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, চাপ সৃষ্টির কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে পারে; কিন্তু প্রত্যাবাসন শুরু না হলে এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য বলা যাবে না।

এখানেই জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন আসে।

জাতিসংঘকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসেবেও তাকে দেখা যায় না। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে জাতিসংঘের বাস্তব সাফল্যের বহু উদাহরণ আছে। কম্বোডিয়া, সিয়েরা লিওন, লাইবেরিয়া, মোজাম্বিক, নামিবিয়া, তিমুর-লেস্তে এবং আরও কয়েকটি দেশে জাতিসংঘ সংঘাত-পরবর্তী শান্তি প্রতিষ্ঠা, নিরস্ত্রীকরণ, নির্বাচন ও রাজনৈতিক রূপান্তরে ভূমিকা রেখেছে।

কিন্তু বড় শক্তিগুলোর সরাসরি স্বার্থ জড়িয়ে গেলে জাতিসংঘের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের ভেটো ক্ষমতা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। যুদ্ধ বন্ধ করতে চাইলেও যদি শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ঐকমত্য না থাকে, জাতিসংঘ অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়েই আটকে যায়।

এ কারণেই প্রশ্নটি হওয়া উচিত—জাতিসংঘ কি ব্যর্থ, নাকি জাতিসংঘকে যেভাবে পরিচালিত করা হচ্ছে সেটিই সমস্যার বড় অংশ?

বাস্তবতা হলো, জাতিসংঘ কোনো বিশ্বসরকার নয়। তার নিজের কোনো সেনাবাহিনী নেই, অধিকাংশ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয় এবং নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শক্তির ভারসাম্যের প্রতিফলন। ফলে বর্তমান বিশ্বের বহুমেরু বাস্তবতার সঙ্গে জাতিসংঘের কাঠামোর বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে।

তবু এই প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রকে একই টেবিলে বসানোর মতো আর কোনো বৈশ্বিক রাজনৈতিক মঞ্চ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, শরণার্থী, জনস্বাস্থ্য, দারিদ্র্য, টেকসই উন্নয়ন, শান্তিরক্ষা—এসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রত্যাশা এবং সক্ষমতার মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান, সেটিই জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় সংকট।

বাংলাদেশের জন্যও জাতিসংঘের গুরুত্ব কম নয়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৬ সালের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ২ জুনের নির্বাচনে তিনি ১৯০ ভোটের মধ্যে ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করেন। অর্থাৎ এই অধিবেশনে বাংলাদেশের একটি প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের অবস্থানও রয়েছে।

এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের কূটনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়ে। কারণ বাংলাদেশের সামনে শুধু বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ নয়, বরং জাতিসংঘের বিভিন্ন কাঠামো ব্যবহার করে বাংলাদেশের স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো অসুখ সামনে আসে। আমরা প্রায়ই বিদেশ সফরের হিসাব করি কতজন নেতার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে, কতটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে, কতজন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে বসা হয়েছে এবং কত বড় বড় কথা বলা হয়েছে—এসব দিয়ে। অথচ আসল হিসাব হওয়া উচিত সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সফরের ছয় মাস পর কত বিনিয়োগ এসেছে? কতটি নতুন শ্রমবাজার খুলেছে? কতজন বাংলাদেশি শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়েছে? জ্বালানি সহযোগিতায় কী পরিবর্তন এসেছে? রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কী নতুন অগ্রগতি হয়েছে? বাণিজ্যে কী নতুন সুবিধা এসেছে? আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের কোনো প্রস্তাব বাস্তব সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে কি না?—এসব প্রশ্নের উত্তরই হবে সফরের প্রকৃত মূল্যায়ন।

রাজনৈতিক সরকারের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কারণ বিদেশনীতি শুধু করমর্দনের কূটনীতি নয়; এটি ফলাফলের কূটনীতি।

তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরকে তাই এখনই ব্যর্থ বলা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি ৩০টি কর্মসূচি ও ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠককে বড় সাফল্যের সনদ দেওয়াও তাড়াহুড়ো হবে। বরং বলা যায়, সফরটি বেশ কিছু কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। এখন দেখতে হবে সরকার সেই সুযোগগুলোকে কতটা বাস্তব ফলাফলে পরিণত করতে পারে।

একই প্রশ্ন জাতিসংঘের ক্ষেত্রেও। জাতিসংঘ পৃথিবীর সব যুদ্ধ থামাতে পারেনি, সব শরণার্থীকে ঘরে ফেরাতে পারেনি, সব গণহত্যা ঠেকাতে পারেনি। কিন্তু যেখানে রাষ্ট্রগুলো সহযোগিতা করেছে, সেখানে শান্তিরক্ষা, মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ে জাতিসংঘের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।

সুতরাং নিউইয়র্কের আসল গল্প বক্তৃতা নয়, ছবি নয়, করমর্দনও নয়। আসল গল্প হলো—বক্তৃতার পর কী হলো, বৈঠকের পর কী হলো এবং ঘোষণার পর বাস্তবে কী পরিবর্তন এলো।

তারেক রহমানের এবারের সফরের ক্ষেত্রেও কয়েক মাস পর আমাদের সেই হিসাব চাইতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত কোনো আন্তর্জাতিক সফরের সাফল্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নয়, জনগণের জীবনে তার বাস্তব প্রতিফলনে প্রমাণিত হয়।

নিউইয়র্কে আলো জ্বলে কয়েক দিন। কিন্তু কূটনীতির আসল পরীক্ষা শুরু হয় বিমানটি ঢাকার মাটিতে নামার পর।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.