স্বাধীনতার স্বপ্ন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা এবং এক নতুন রাজনৈতিক সংকট

দ্বাদশ পর্ব

 

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা ছিল—প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্ব। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে, লাল-সবুজের পতাকা উড়ছে, পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে; কিন্তু যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা হাজার হাজার তরুণের সামনে তখনও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

আমরা যারা ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তারা খুব কাছ থেকে সেই অস্থিরতা অনুভব করতাম।

যুদ্ধ করে ফেরা ছেলেদের চোখে তখনও বিজয়ের দীপ্তি ছিল, কিন্তু সেই দীপ্তির আড়ালেই ধীরে ধীরে জমতে শুরু করেছিল হতাশা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা বই-খাতা ফেলে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল।

অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ কিংবা স্কুলের ছাত্র।

অনেকে আবার চাকরি কিংবা ব্যবসা ছেড়ে যুদ্ধ করেছিলেন।

স্বাধীনতার পরে তাঁদের অধিকাংশই আবার শূন্য হাতে ফিরে এলেন।

ফিরে যাওয়ার মতো নির্দিষ্ট কোনো পেশা অনেকেরই ছিল না।

যাদের ছাত্রজীবন যুদ্ধের কারণে থেমে গিয়েছিল, তাদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।

এই প্রজন্মের অনেকেই আশা করেছিল, স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের জন্য একটি সুস্পষ্ট পথ তৈরি করবে।

যোগ্যতা অনুযায়ী রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

কেউ হয়তো প্রশাসনে, কেউ সামরিক বাহিনীতে, কেউ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবেন।

স্বাধীনতার জন্য যে আত্মত্যাগ তাঁরা করেছেন, তার একটি মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি রাষ্ট্র দেবে—এটাই ছিল তাদের বিশ্বাস।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি জটিল।

একদিন রমনা রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সেই সমাবেশে উপস্থিত থাকার সুযোগ আমার হয়েছিল।

আজও চোখ বন্ধ করলে সেই  সমাবেশের  দৃশ্য ভেসে ওঠে।

চারদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের ভিড়।

কেউ সামরিক পোশাকে, কেউ সাধারণ পোশাকে।

কারও কাঁধে যুদ্ধের স্মৃতি, কারও শরীরে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন।

সবাই অপেক্ষা করছেন—স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী ঘোষণা আসবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের কথা বলেছিলেন।

সমাবেশে উপস্থিত অনেকের মতো আমরাও সেই ঘোষণা মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলাম।

আমাদের মনে হয়েছিল, যুদ্ধফেরত তরুণদের সংগঠিত করে নতুন রাষ্ট্র গঠনের কাজে যুক্ত করার একটি পরিকল্পনা হয়তো সামনে আসছে।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে অন্তত আমাদের দৃষ্টিতে সেই ধারণাটি বাস্তব রূপ লাভ করতে দেখিনি।

অন্যদিকে, আরেকটি সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের যার যার পেশায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।

কথাটি শুনতে সহজ ছিল, কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

যাদের নির্দিষ্ট পেশাই ছিল না, তারা কোথায় ফিরে যাবেন?

যে ছাত্র যুদ্ধ করতে গিয়ে তার পড়াশোনা থামিয়ে দিয়েছে, সে কীভাবে নতুন জীবন শুরু করবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তখন অনেকের কাছেই অস্পষ্ট ছিল।

ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশের মধ্যে ধীরে ধীরে এক ধরনের হতাশা জন্ম নিতে থাকে।

এই হতাশা শুধু কর্মসংস্থানের প্রশ্ন ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেরও প্রশ্ন।

স্বাধীনতার সময় যে ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল, স্বাধীনতার পর সেই ঐক্য ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে মাওলানা ভাসানীসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

এটি ছিল জাতীয় ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা।

কিন্তু স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগ এককভাবে সরকার গঠন করল।

তখন অনেকের মধ্যেই এই প্রশ্ন উঠেছিল যে, পাকিস্তান আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভিত্তিতে গঠিত প্রতিনিধিত্ব কি স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতাকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করছে?

এই প্রশ্ন কেবল বিরোধী মহলেই নয়, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেও কিছু পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছিল—এমন ধারণা সে সময় আমাদের মধ্যে ছিল।

এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা আলোচনা করতাম ১৯৭২ সালের ২৫ মে অবিভক্ত ছাত্রলীগের স্বাধীনতাপন্থী অংশের নামে প্রচারিত একটি বিবৃতি নিয়ে।

সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, দেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং কেবল বঙ্গবন্ধুই দেশকে সংকট থেকে উদ্ধার করতে পারেন।

তবে সেই আহ্বানের সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রস্তাবও যুক্ত ছিল।

তাদের দাবির মধ্যে ছিল—দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করা, বিদ্যমান মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি বিপ্লবী সরকার গঠন, এবং রাজনৈতিক নেতা ও উচ্চপদস্থ আমলাদের সম্পদের হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা।

আরও কয়েকটি সংস্কারমূলক দাবিও সেই বিবৃতিতে উত্থাপিত হয়েছিল।

সেই সময় ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একজন নেতার কাছ থেকে আমি শুনেছিলাম, এই বিবৃতির পেছনে সিরাজুল আলম খান, তাজউদ্দীন আহমদসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির নীরব সম্মতি ছিল।

এই তথ্য আমি প্রত্যক্ষভাবে যাচাই করার সুযোগ পাইনি, তবে সে সময় রাজনৈতিক মহলে এমন আলোচনা প্রচলিত ছিল।

স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের ভেতরে যে নানা মত, নানা ধারা এবং ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ একসঙ্গে অবস্থান করছিলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে, অর্থনীতি কোন পথে এগোবে, প্রশাসনের চরিত্র কেমন হবে, রাজনৈতিক কাঠামো কী রূপ নেবে—এসব প্রশ্নে সবার মধ্যে একক মত ছিল না।

বিভিন্ন আদর্শ, বিভিন্ন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যাশা নিয়ে অনেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একত্রিত হয়েছিলেন।

যুদ্ধকালীন ঐক্য ছিল স্বাধীনতার জন্য।

কিন্তু স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে সেই মতপার্থক্যগুলো ধীরে ধীরে সামনে চলে আসে।

আমাদের মতো তরুণ কর্মীরাও তা অনুভব করতে শুরু করি।

পরে বহুবার ভেবে দেখেছি, স্বাধীনতার আগে আমাদের অধিকাংশের চিন্তার কেন্দ্র ছিল একটি স্বাধীন মানচিত্র এবং একটি স্বাধীন পতাকা।

কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল বাস্তবতা আমাদের সামনে নতুনভাবে উপস্থিত হলো।

সংবিধানের চার মূলনীতি স্বাধীনতার পর প্রণীত হলো, রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক ভিত্তি পেল।

কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আরও বিস্তৃত।

তারা চেয়েছিল জীবনের দ্রুত পরিবর্তন, প্রশাসনের রূপান্তর, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান এবং যুদ্ধের চেতনাকে প্রতিদিনের রাষ্ট্রজীবনে প্রতিফলিত হতে দেখতে।

যখন সেই পরিবর্তন প্রত্যাশিত গতিতে দৃশ্যমান হলো না, তখন মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়তে লাগল।

আজ এত বছর পরে ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, স্বাধীনতা অর্জন ছিল ইতিহাসের এক মহৎ বিজয়; কিন্তু সেই বিজয়কে একটি কার্যকর, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা ছিল আরও কঠিন কাজ।

আমরা তখন সেই কঠিন পথের শুরুতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।

সামনে যে রাজনৈতিক সংঘাত, আদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং রাষ্ট্রক্ষমতার নতুন অধ্যায় অপেক্ষা করছিল, তার পূর্ণ চিত্র তখনও আমাদের কাছে স্পষ্ট ছিল না।

তবে বাতাসে পরিবর্তনের গন্ধ আমরা টের পাচ্ছিলাম।

আর সেই পরিবর্তনের অভিঘাত খুব শিগগিরই বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন মোড়ে নিয়ে যাবে—যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হওয়ার সুযোগও আমাদের হয়েছিল।

সেই ইতিহাসের কথাই পরবর্তী পর্বে লিখব।

লেখক : হাবিব বাবুল

৭০ দশকের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অনুসারী ছাত্রলীগের সংগঠক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.