যোগ্যতা যেখানে যথেষ্ট নয় : বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন

বাংলাদেশ কি জাতি-রাষ্ট্র, না কি মুসলিম জাতি-রাষ্ট্র—প্রশ্নটি শুনতে যতটা সরল, বাস্তবে ততটাই গভীর। কারণ একটি রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম দিয়ে নির্ধারিত হয় না; রাষ্ট্রের চরিত্র বোঝা যায় তার নাগরিকদের সমান মর্যাদা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সুযোগ দিয়ে। বাংলাদেশের সংবিধান একদিকে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্যদিকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মের সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছে। একই সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সব নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাতি ইত্যাদির ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কিন্তু সংবিধানের অঙ্গীকার আর রাষ্ট্রের বাস্তব রাজনৈতিক সংস্কৃতি সব সময় এক জিনিস নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে তার নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কতটা রাজনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে—সেখানেই আসল প্রশ্ন।

প্রথমেই একটি সংশোধন জরুরি। বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কখনও রাষ্ট্রের মূলধারায় আসতে পারেনি—এ কথাটি আক্ষরিক অর্থে পুরোপুরি সঠিক নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ সংসদ সদস্য হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন, এমনকি পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্বও পেয়েছেন। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় তিনজন অমুসলিম মন্ত্রী ছিলেন—দিলীপ বড়ুয়া, দীপঙ্কর তালুকদার এবং রমেশ চন্দ্র সেন; পরে প্রমোদ মানকিনও মন্ত্রিসভায় যুক্ত হন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব নেই—এমন দাবি ইতিহাসসম্মত হবে না।

তবে প্রশ্নটি এখানেই শেষ হয় না। বরং আরও কঠিন প্রশ্ন হলো: রাষ্ট্রের ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে তাদের প্রতিনিধিত্ব কতটা স্বাভাবিক হয়েছে? একটি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা আদিবাসী নাগরিককে কি কেবল যোগ্যতা, রাজনৈতিক দক্ষতা, জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক ভূমিকার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বিবেচনা করা হয়? নাকি তার ধর্মীয় পরিচয় অদৃশ্য একটি রাজনৈতিক দেয়াল তৈরি করে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাংলাদেশের দিকে তাকালে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা চোখে পড়ে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো অত্যন্ত দৃশ্যমান ও প্রতীকী পদে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অনুপস্থিতি নিছক পরিসংখ্যান নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীর সংকেত। অবশ্য এর প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মই একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে আরও প্রমাণ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নির্বাচনী বাস্তবতা, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের হিসাব, দলীয় নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো—সবকিছুর ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় যে রাজনৈতিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে, সে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।

বিশ্বের অন্যান্য গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের উদাহরণটি সবচেয়ে কাছের। ভারত একটি হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও তার রাজনৈতিক কাঠামোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে পৌঁছেছেন। ড. জাকির হুসেন ১৯৬৭ সালে ভারতের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি হন এবং ছিলেন এই পদে প্রথম মুসলিম। ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ ১৯৭৪ সালে পঞ্চম রাষ্ট্রপতি হন। পরে বিজ্ঞানী এ. পি. জে. আবদুল কালাম ২০০২ সালে ভারতের একাদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ভারতের রাষ্ট্রপতির সরকারি তালিকাতেও এই তিনজনের রাষ্ট্রপতি হওয়ার তথ্য স্পষ্টভাবে রয়েছে।

ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিখুঁত নয়, সাম্প্রদায়িক সংঘাতও সেখানে কম নয়। তবু একটি মুসলিম নাগরিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছাতে পারেন—এই রাজনৈতিক স্বীকৃতির প্রতীকী মূল্য অনেক। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেখানে কোনো নাগরিকের রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তাকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়নি যে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের মানুষ কি না।

ব্রিটেনের উদাহরণও একইভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ঋষি সুনাক হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত হয়েও ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। লন্ডনের মেয়র সাদিক খান মুসলিম এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত; তিনি শুধু লন্ডনের মেয়রই হননি, এর আগে ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রথম মুসলিম ও প্রথম এশীয় হিসেবে জায়গা করেছিলেন। বর্তমানে তিনি আবারও লন্ডনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জার্মানির সাম্প্রতিক ঘটনাটি বাংলাদেশের আলোচনার জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের ১৩ মে তুর্কি বংশোদ্ভূত Cem Özdemir Baden-Württemberg-এর Minister-President নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি জার্মানির ইতিহাসে তুর্কি শিকড়ের প্রথম কোনো রাজ্য সরকারপ্রধান। আরও আগে Aydan Özoğuz তুর্কি অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে জার্মান বুন্ডেসটাগের সদস্য, ফেডারেল সরকারের স্টেট মিনিস্টার এবং ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বুন্ডেসটাগের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অর্থাৎ অভিবাসী বা সংখ্যালঘু পরিচয় সেখানে রাজনৈতিক অগ্রগতির পথে একটি স্থায়ী সাংবিধানিক বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ আরও ঐতিহাসিক। বর্ণবৈষম্যের দীর্ঘ যুগের পর ১৯৯৪ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হন। সেটি শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষমতায় আসা ছিল না; রাষ্ট্রের মালিকানা সম্পর্কে একটি নতুন ধারণার জন্ম হয়েছিল—রাষ্ট্র কোনো বিশেষ বর্ণের নয়, সব নাগরিকের। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি নথিতেও ম্যান্ডেলাকে দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিউজিল্যান্ডেও মাওরি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বহু আগে থেকেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ। ১৮৬৮ সালেই প্রথম মাওরি সদস্যরা সংসদে প্রবেশ করেন; পরবর্তী সময়ে মাওরি নেতারা সাধারণ নির্বাচনী আসনেও নির্বাচিত হয়েছেন এবং জাতীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

এসব উদাহরণ আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়: গণতন্ত্রের সাফল্য শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে নয়, সংখ্যালঘুর রাষ্ট্রীয় মালিকানার অনুভূতিতেও নিহিত। একজন সংখ্যালঘু নাগরিক যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে পৌঁছান, তখন তার ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি একটি বৃহত্তর বার্তা যায়—এই রাষ্ট্র আমারও।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। কারণ এখানে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি দলীয় আনুগত্য, পরিবারতন্ত্র, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সম্পর্কও পদায়নের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে কোনো সংখ্যালঘু নেতা কোনো পদ না পাওয়ার কারণকে সরাসরি ধর্মীয় বৈষম্য বলে ঘোষণা করাও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সতর্কতার দাবি রাখে। কিন্তু যদি দেখা যায়, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনৈতিক কর্মী, দলের দুঃসময়ের সহযোদ্ধা, আন্দোলনের মাঠের মানুষ কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছেন, তাহলে সেই অভিযোগ অবশ্যই অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির একজন শীর্ষ নেতাকে ঘিরে যে বঞ্চনার আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রযোজ্য। তাঁর নাম উল্লেখ না করেও বলা যায়, ওয়ান-ইলেভেনের পর বিএনপির সংকটময় সময়ে এবং পরবর্তী দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় তিনি দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন—এমন দাবি তাঁর সমর্থকদের। অথচ ক্ষমতার পালাবদলের পর দলের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান ছিলেন, তাদের কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন, আর দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা অনেকে হতাশ হয়েছেন। এটি যদি সত্য হয়, তবে প্রশ্ন শুধু ধর্মের নয়; প্রশ্ন রাজনৈতিক স্মৃতি, দলীয় মূল্যায়ন এবং ক্ষমতার বণ্টনেরও।

একটি রাজনৈতিক দল যদি শুধু নির্বাচনের সময় কর্মীদের প্রয়োজন মনে করে, আর ক্ষমতার সময় তাদের ভুলে যায়, তাহলে সেই দলের সাংগঠনিক নৈতিকতা দুর্বল হয়। আবার কোনো নেতা যদি দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করেও নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অদৃশ্য কাচের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে যান, তাহলে সেটি আরও গভীর সংকট—কারণ তখন দলীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নও জড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশকে তাই ‘মুসলিম জাতি-রাষ্ট্র’ বনাম ‘জাতি-রাষ্ট্র’—এই দ্বৈততার মধ্যে আটকে রাখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, যার সংবিধানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম; একই সঙ্গে এটি এমন একটি প্রজাতন্ত্র, যার সংবিধান নাগরিকের ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

রাষ্ট্রের পরিচয় শেষ পর্যন্ত তার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মে নয়, তার সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদায়ও প্রকাশ পায়। কোনো হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী বা অন্য কোনো সংখ্যালঘু নাগরিক যদি একদিন তাঁর যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, স্পিকার বা বড় কোনো নগরীর মেয়র হতে পারেন, তখন সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বিজয় হবে না; বাংলাদেশের গণতন্ত্রেরও বিজয় হবে।

ভারত, ব্রিটেন, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা নিউজিল্যান্ড আমাদের দেখিয়েছে যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে সংখ্যালঘু বা ভিন্ন বংশোদ্ভূত মানুষের উপস্থিতি রাষ্ট্রের পরিচয়কে দুর্বল করে না; বরং নাগরিকত্বের ধারণাকে শক্তিশালী করে। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই—আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারব, যেখানে একজন মানুষের ধর্ম নয়, তার যোগ্যতা, সততা, রাজনৈতিক অবদান ও জনগণের আস্থা তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?

এই প্রশ্নটি তাই অবান্তর নয়। বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র, জাতীয় পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচরিত্র নিয়ে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলোর একটি।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.