দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর (সিএমবিসি)। প্রায় দেড় দশক আগে যে ধারণার সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে, সেটিই এখন নতুন রূপে ফিরে এসেছে। তবে এবার ভারত কার্যত এর বাইরে। ফলে এই করিডোর শুধু একটি অবকাঠামো বা বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়; এটি আঞ্চলিক কূটনীতি, ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এটি যেমন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে, তেমনি ভুল কৌশল গ্রহণ করলে এটি নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, এই করিডোর কি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, নাকি দুই দেশের সম্পর্ক এতটাই পরিণত হয়েছে যে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে?
চীনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সবসময়ই ছিল ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে বিকল্প প্রবেশপথ তৈরি করা। বর্তমানে চীনের অধিকাংশ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক পণ্য মালাক্কা প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কোনো সংঘাতের পরিস্থিতিতে এই রুট বন্ধ হয়ে গেলে চীনের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। তাই ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর হয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর পরিকল্পনা বহুদিনের।
এই করিডোরে বাংলাদেশ যুক্ত হলে চীনের জন্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যয় কমবে, পরিবহন সময় হ্রাস পাবে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ বর্তমানে এমন একটি ভূ-অর্থনৈতিক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন—সব পক্ষই দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী। এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ।
সিএমবিসি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কেবল দেশের বন্দর হিসেবেই নয়, আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। উত্তর-পূর্ব ভারতের পাশাপাশি মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়তে পারে। নতুন মহাসড়ক, রেলপথ, শিল্পাঞ্চল, লজিস্টিক কেন্দ্র এবং সীমান্তভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সংযোগসেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই করিডোর সেই লক্ষ্য পূরণে বাস্তব সুযোগ এনে দিতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদনশিল্প, রপ্তানি, গুদামজাতকরণ, পরিবহন এবং বন্দরভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতা হলো, কোনো অর্থনৈতিক করিডোর কেবল সড়ক নির্মাণের প্রকল্প নয়। এর সফলতা নির্ভর করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, সুশাসন এবং কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে মিয়ানমারকে ঘিরে। প্রস্তাবিত করিডোরের একটি বড় অংশ মিয়ানমারের এমন অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করবে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্য বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল সংঘাতপূর্ণ এলাকা। বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী, সামরিক সরকার এবং বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংঘর্ষের কারণে ওই অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা নিয়মিত বাণিজ্য পরিচালনা সহজ হবে না।
চীন ইতোমধ্যে কিয়াউকফিউ বন্দর এবং তেল-গ্যাস পাইপলাইনে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু নিরাপত্তা সংকটের কারণে এসব প্রকল্পও বহুবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ফলে বাংলাদেশকে কেবল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার হিসাব করলেই চলবে না; নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন হলো, এই করিডোরে ভারতের ক্ষতি কতটা হতে পারে।
ভারতের উদ্বেগের কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। প্রথমত, বিসিআইএম প্রকল্পে ভারত ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু সীমান্ত উত্তেজনা, বিশেষ করে ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত কার্যত এই উদ্যোগ থেকে সরে আসে। এখন ভারতকে বাদ দিয়েই যদি করিডোর বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংযোগে ভারতের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কমে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হলে ভারত এটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। কারণ বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীদের একটি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান গভীরভাবে সম্পর্কিত।
তৃতীয়ত, বঙ্গোপসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভারতের দীর্ঘমেয়াদি সামুদ্রিক নিরাপত্তা কৌশলের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। যদিও করিডোরটি আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থনৈতিক প্রকল্প, তবু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অর্থনৈতিক অবকাঠামো অনেক সময় ভবিষ্যতের কৌশলগত উপস্থিতির ভিত্তি তৈরি করে।
তবে এটিও সত্য যে ভারতের ক্ষতির প্রশ্নটি অনেকাংশেই নির্ভর করবে করিডোরের বাস্তবায়ন এবং ব্যবহারের ধরন কেমন হবে তার ওপর। যদি এটি কেবল বাণিজ্যিক সংযোগে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ভারতের আশঙ্কা সীমিত থাকবে। কিন্তু যদি ভবিষ্যতে এর সঙ্গে নিরাপত্তা বা সামরিক সহযোগিতার কোনো মাত্রা যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যেতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই করিডোর কি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে?
আমার মূল্যায়নে, সরাসরি নয়।
কারণ গত দেড় দশকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল একটি প্রকল্প বা একটি ইস্যুর ওপর দাঁড়িয়ে নেই। সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিদ্যুৎ আমদানি, জ্বালানি, ট্রানজিট, রেল যোগাযোগ, নৌপথ, প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং বাণিজ্য—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ভারতও জানে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। নিজের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করবে—এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে বাংলাদেশও উপলব্ধি করে যে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক তার নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
তবে সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি বা কূটনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে। বিশেষ করে যদি কোনো পক্ষ এই করিডোরকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে ভুল বোঝাবুঝি বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত তার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই নীতিকে অনুসরণ করে আসছে। বর্তমান পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় এই নীতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশের উচিত হবে চীনের বিনিয়োগ গ্রহণ করা, তবে এমনভাবে যাতে তা কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না করে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের বিনিয়োগও সমানভাবে আকৃষ্ট করতে হবে।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক করিডোর মানেই কোনো একটি দেশের প্রতি আনুগত্য নয়। ভিয়েতনাম যেমন একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে, তেমনি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতও বহুমুখী অংশীদারিত্বের নীতি অনুসরণ করছে। বাংলাদেশও চাইলে একই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অনুসরণ করতে পারে।
অবশেষে বলা যায়, চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর বাংলাদেশের জন্য যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ, তেমনি এটি একটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষাও। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবে সেই সুবিধা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি এবং ঋণনির্ভর উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
ভারতের কিছু কৌশলগত উদ্বেগ স্বাভাবিক, কিন্তু সেই উদ্বেগকে বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে বাংলাদেশেরও উচিত হবে উন্নয়নের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যাতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা যেমন এগিয়ে যায়, তেমনি ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আস্থাভিত্তিক সম্পর্কও অটুট থাকে।
কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো করিডোরই বাংলাদেশের জন্য সফল হবে না, যদি সেটি আঞ্চলিক সহযোগিতার পরিবর্তে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি করে। আর বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি এখানেই—প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু না হয়ে সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া।
— হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

