চট্টগ্রামে পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ, বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকট

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। জেলার অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবিক সংকটে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া উপজেলা, যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা পানিতে ডুবে গিয়ে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি মানুষ দুর্ভোগে রয়েছেন। একই সঙ্গে চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালীর বিস্তীর্ণ এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ প্রতিটি উপজেলায় ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু রাখা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, উদ্ধার অভিযান, ত্রাণ বিতরণ এবং বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য উপজেলা প্রশাসনগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে প্রশাসন কাজ করছে।

সাতকানিয়ায় তিন বছরের ব্যবধানে আবারও বড় ধরনের বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় অসংখ্য বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাতকানিয়া আদালত, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কার্যালয়, পৌরসভা কার্যালয় এবং থানাতেও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।

বাঁশখালীতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বন্যার পানিতে পাঁচ শতাধিক মাটির ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) রাত ১১টার দিকে বৈলছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় শহরের সঙ্গে উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে হাজারো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বহু পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে গেলেও অনেকেই এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। পুইছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা পারভেজ মোশারফ বলেন, ভারী বর্ষণ ও সমুদ্রের জোয়ারে অধিকাংশ এলাকা ডুবে গেছে। মাটির ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে এবং রান্নার সুযোগ না থাকায় মানুষ খাদ্যসংকটে ভুগছেন।

এদিকে সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের বুড়ির দোকান এলাকা, বাজালিয়া অলি আহমেদ বীর বিক্রম কলেজের সামনে এবং দস্তিদারহাট এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে কয়েক ফুট উচ্চতায় বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বন্যার কারণে উপজেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ডলু নদীর প্রবল স্রোতে পৌরসভার রামপুর এলাকায় কয়েকশ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। অধিকাংশ সড়ক পানির নিচে থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অনেক এলাকায় এখনো পানি বাড়ছে।

চন্দনাইশেও বন্যার তীব্রতা বেড়েছে। উপজেলার দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অন্তত ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। পাহাড়ি ঢলে শঙ্খ নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে।

গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশের হাশিমপুর এলাকায় প্রায় দেড় ফুট পানি জমে থাকায় দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে। এতে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়ে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

চন্দনাইশের বাসিন্দা আবু নাসের আলিফ বলেন, প্রতিদিনই বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। অনেক মানুষ এখনও পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.