বাংলাদেশের জার্মানিস্থ রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জুলকার নায়েন বলেছেন, বিশ্বব্যাপী দ্রুত বিকাশমান কোয়ান্টাম প্রযুক্তির যুগে শতবর্ষ আগে সত্যেন্দ্রনাথ বোসের অবদান নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁর মতে, বোস-আইনস্টাইন তত্ত্ব শুধু আধুনিক কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ভিত্তি শক্তিশালী করেনি, বরং বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ১৯২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বোস উপ-পরমাণবিক কণার আচরণ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের কাছে পাঠান। আইনস্টাইন সেই গবেষণার গুরুত্ব উপলব্ধি করে বোসের সঙ্গে যৌথভাবে যে তত্ত্বের বিকাশ ঘটান, সেটিই আজ বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট (Bose-Einstein Condensate – BEC) নামে পরিচিত। এটি পদার্থের পঞ্চম অবস্থা হিসেবে স্বীকৃত।
তিনি জানান, ১৯৯৫ সালে পরীক্ষাগারে বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেটের বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়। পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি অবস্থায় কিছু বোসন কণা তাদের গতিশক্তি হারিয়ে একই কোয়ান্টাম অবস্থায় একত্রিত হয় এবং একটি “সুপার অ্যাটম”-এর মতো আচরণ করে। এই বৈশিষ্ট্য কোয়ান্টাম প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচলিত কম্পিউটার যেখানে ০ ও ১ বিটের উপর নির্ভর করে, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিউবিটের মাধ্যমে একই সঙ্গে একাধিক অবস্থায় (Superposition) কাজ করতে পারে এবং পারস্পরিক সংযুক্তি (Entanglement) ব্যবহার করে অত্যন্ত জটিল গাণিতিক ও বিশ্লেষণধর্মী সমস্যা অতি দ্রুত সমাধান করতে সক্ষম।
তিনি বলেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের অন্যতম চ্যালেঞ্জ—ডিকোহেরেন্স (Decoherence), স্কেলেবিলিটি এবং ত্রুটি সংশোধনের মতো বিষয়গুলোর সমাধানে বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সুপার অ্যাটমের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে তুলনামূলক কম কিউবিট ব্যবহার করে অধিক দক্ষতার সঙ্গে গণনা সম্পাদনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, ওষুধ আবিষ্কার, লজিস্টিকস, সাইবার নিরাপত্তা, শিল্প সিমুলেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম কম্পিউটার যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৯ সালে গুগলের Sycamore Quantum Processor মাত্র কয়েক মিনিটে এমন একটি গণনা সম্পন্ন করেছিল, যা সে সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারের করতে কয়েক দশক সময় লাগত বলে ধারণা করা হয়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোয়ান্টাম প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে এখন থেকেই জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যথায় উন্নয়নশীল দেশগুলো শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধা থেকেই বঞ্চিত হবে না, তাদের বিদ্যমান সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। বর্তমানের প্রচলিত এনক্রিপশন অ্যালগরিদম ভবিষ্যতের শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কাছে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এজন্য পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং নতুন নিরাপত্তা অ্যালগরিদমের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
রাষ্ট্রদূতের মতে, বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামো পরিকল্পনায় কোয়ান্টাম প্রযুক্তিকে এখনই অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় কোয়ান্টাম নীতি প্রণয়ন, শিক্ষা কারিকুলামে কোয়ান্টাম বিজ্ঞান ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিং অন্তর্ভুক্ত করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ম্যাককিনজির এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই খাতে যোগ্য প্রার্থীর তুলনায় চাকরির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং ভবিষ্যতে এ ব্যবধান আরও বাড়বে। ফলে STEM-ভিত্তিক বিষয়—যেমন পদার্থবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, গণিত, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার ক্ষেত্র।
রাষ্ট্রদূত জানান, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং শিক্ষা ও গবেষণার জন্য জার্মানি বিশ্বের অন্যতম সেরা গন্তব্য। দেশটিতে ইংরেজি মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রাম, তুলনামূলক কম খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক সোসাইটি ও ফ্রাউনহোফার-গেজেলশাফটের মতো শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বিশেষভাবে Technical University of Munich (TUM), Leibniz University Hannover, Quantum Initiative Rhineland-Palatinate (QUIP), TU Chemnitz, TU Braunschweig, DLR Quantum Computing Initiative, Forschungszentrum Jülich (FZJ), QUTAC এবং Integrated Quantum Science and Technology Centre (IQST), Baden-Württemberg-এর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, সম্প্রতি তিনি জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোয়ান্টাম শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রের সঙ্গে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সত্যেন্দ্রনাথ বোসের ঐতিহাসিক অবদানকে ভিত্তি করে বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে কোয়ান্টাম বিজ্ঞান, উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণা সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে এবং বাংলাদেশের তরুণ গবেষকরা এই উদীয়মান প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবেন।

