যুদ্ধের ছায়ায় উৎসব : প্রবাসী বাঙালির অপূর্ণ ঈদ ও এক অনিশ্চিত পৃথিবীর গল্প

বিশ্ব রাজনীতির অস্থির মানচিত্রে আবারও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যেন এক অদৃশ্য আতঙ্কের ছায়া বিস্তার করেছে। এই উত্তেজনার ঢেউ সরাসরি আঘাত হেনেছে সেইসব সাধারণ মানুষের জীবনে, যারা যুদ্ধের রাজনীতির অংশ নয়, কিন্তু তার নির্মম বাস্তবতার শিকার—বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি এবার ঈদে দেশে ফিরতে পারেননি। বিমানবন্দরের ফাঁকা প্রস্থান লাউঞ্জ, বুকিং বাতিলের দীর্ঘ তালিকা, এবং অনিশ্চয়তার কারণে থমকে যাওয়া যাত্রাপথ—সব মিলিয়ে এবারের ঈদ যেন এক গভীর বেদনার নাম। পরিবার-পরিজনের সাথে মিলিত হওয়ার যে স্বপ্ন তারা বছরের পর বছর ধরে লালন করেন, তা এবার যুদ্ধের অশনি সংকেতে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন, ক্ষমা ও ভালোবাসার উৎসব। কিন্তু এবারের ঈদ যেন তার বিপরীত এক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে বহু মানুষের কাছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের জন্য এই ঈদ এসেছে ভয়, আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার আবহে। প্রতিদিনের সংবাদে যুদ্ধের সম্ভাবনা, সামরিক প্রস্তুতি, আকাশে টহলরত যুদ্ধবিমান—এসব দৃশ্য মানুষের মনে এক অদৃশ্য চাপ তৈরি করছে। রমজানের সংযম ও আধ্যাত্মিকতার পর যে প্রশান্তির ঈদ আসার কথা, তা যেন হারিয়ে গেছে অজানা আশঙ্কার ভিড়ে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনের গল্প বরাবরই সংগ্রামের। পরিবার থেকে দূরে, অপরিচিত পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করে তারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বছরের একটি বিশেষ সময়—ঈদ—তাদের কাছে হয়ে ওঠে ঘরে ফেরার, প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরার, মায়ের হাতের রান্না খাওয়ার, এবং শৈশবের স্মৃতিগুলোকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার এক অমূল্য সুযোগ। কিন্তু এবারের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেকেই টিকিট কেটেও যেতে পারেননি, কেউবা ঝুঁকি এড়াতে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন না যাওয়ার। আবার কেউ কেউ কর্মস্থলের অনিশ্চয়তার কারণে ছুটি পাননি।

এই বিচ্ছিন্নতার কষ্ট শুধু প্রবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দেশের ঘরে বসে থাকা পরিবারগুলোর জন্যও এটি এক গভীর বেদনার কারণ। মা অপেক্ষা করছেন সন্তানের জন্য, স্ত্রী অপেক্ষা করছেন স্বামীর জন্য, শিশুরা অপেক্ষা করছে বাবার জন্য—কিন্তু সেই অপেক্ষা এবার অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ভিডিও কলই হয়ে উঠেছে একমাত্র সান্ত্বনা, কিন্তু তা কি কখনও স্পর্শের উষ্ণতা বা উপস্থিতির অনুভূতি দিতে পারে?

বিশ্বব্যাপী এই যুদ্ধ-উদ্বেগ শুধু ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের মানসিক জগতে গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা এবং মানসিক চাপ বাড়িয়ে তোলে। মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত অনেক প্রবাসী এখন শুধু চাকরি বা আয় নিয়েই চিন্তিত নন, তারা নিজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন। যুদ্ধ শুরু হলে কী হবে, কোথায় আশ্রয় নেবেন, দেশে ফিরতে পারবেন কিনা—এসব প্রশ্ন তাদের প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

এমন পরিস্থিতি অতীতেও এসেছে, কিন্তু বর্তমানের এই সংকটের ব্যাপকতা ও গভীরতা অনেকটাই ভিন্ন। বিশ্বায়নের যুগে একটি অঞ্চলের অস্থিরতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অন্যত্র। অর্থনীতি, যোগাযোগ, এবং মানুষের চলাচল—সবকিছুই এখন পরস্পর নির্ভরশীল। ফলে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পৌঁছে যায় প্রত্যন্ত গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের জীবনেও।

এবারের ঈদ তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক প্রতীক—অনিশ্চয়তার, বিচ্ছিন্নতার, এবং মানুষের অসহায়ত্বের। মসজিদে নামাজ পড়া, নতুন কাপড় পরা, সেমাই রান্না—সবকিছুই চলছে, কিন্তু আনন্দের যে স্বতঃস্ফূর্ততা, তা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। মানুষের মুখে হাসি আছে, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে অজানা ভয়।

তবুও মানুষ আশা ছাড়ে না। ইতিহাস সাক্ষী, প্রতিটি অন্ধকারের পরেই আলো এসেছে। যুদ্ধের ভয়, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব—এসব সাময়িক; কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, সম্পর্ক, এবং একে অপরের প্রতি মমত্ববোধ চিরস্থায়ী। প্রবাসী সেই শ্রমিক, যে আজ পরিবার থেকে দূরে বসে চোখের জল ফেলছে, সে-ই আবার আগামী দিনে ফিরে আসবে তার প্রিয়জনের কাছে। সেই মা, যে আজ সন্তানের অপেক্ষায় কাঁদছেন, তিনিও আবার একদিন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন।

এই কঠিন সময়ে প্রয়োজন সহমর্মিতা, সংহতি এবং মানবিকতা। রাষ্ট্রগুলোকে যেমন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, তেমনি আমাদের ব্যক্তিগত পর্যায়েও একে অপরের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। প্রবাসীদের জন্য সহায়তা, নিরাপত্তা এবং সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে, পরিবারগুলোকেও মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে, কারণ এই সময়টাও একদিন কেটে যাবে।

ঈদের আসল শিক্ষা হলো ত্যাগ, ধৈর্য এবং ভালোবাসা। হয়তো এবারের ঈদ সেই শিক্ষাকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। আনন্দের মাঝে বেদনা, মিলনের মাঝে বিচ্ছেদ—এই দ্বৈত অনুভূতির মধ্য দিয়েই মানুষ তার অস্তিত্বকে নতুন করে উপলব্ধি করে।

শেষ পর্যন্ত, এই পৃথিবী মানুষের—যুদ্ধের নয়। যত অস্থিরতাই আসুক, মানুষের হৃদয়ের শক্তি, ভালোবাসার ক্ষমতা, এবং শান্তির আকাঙ্ক্ষা কখনও নিঃশেষ হয় না। প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই অপূর্ণ ঈদ তাই শুধু দুঃখের গল্প নয়; এটি এক আশার গল্পও—যে আশা বলে, আগামী ঈদে হয়তো সবকিছু আবার স্বাভাবিক হবে, আবার মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বলবে—“ঈদ মোবারক।”

লেখক: হাবিব বাবুল
শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.