ফ্রাঙ্কফুর্টে বৃহত্তর সিলেট সমিতির জাঁকজমকপূর্ণ ঈদ পুনর্মিলনী

রবিবার ২৮ শে মার্চ  জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে এক বর্ণাঢ্য ও আনন্দঘন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো বৃহত্তর সিলেট সমিতির ঈদ উপলক্ষে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুনর্মিলনী। প্রবাসে বসবাসরত সিলেটবাসীর পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার মানুষদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় এক মিলনমেলায়। প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও সমিতি অত্যন্ত সুনিপুণ আয়োজনের মাধ্যমে প্রবাসীদের মাঝে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি অভিজাত হলে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিকেল  থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের আগমনে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। পরিবার-পরিজন নিয়ে অংশ নেওয়া অতিথিরা যেন কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়েছিলেন প্রবাস জীবনের ব্যস্ততা ও দূরত্ব, ফিরে গিয়েছিলেন শেকড়ের টানে।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর স্বাগত বক্তব্য দেন বৃহত্তর সিলেট সমিতির সভাপতি রেজাউল হক কামরান এবং সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম খালেদ। তারা আগত অতিথিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান এবং সমিতির বিভিন্ন কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। বক্তারা বলেন, প্রবাসে থেকেও নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা আরও উল্লেখ করেন, বৃহত্তর সিলেট সমিতি শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রবাসীদের কল্যাণে নানা সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালনা করে আসছে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের শিশুরা তাদের নাচ, গান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করে। তাদের প্রাণবন্ত পরিবেশনা প্রমাণ করে, প্রবাসেও বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সমানভাবে লালিত হচ্ছে।

সাংস্কৃতিক পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করেন জনপ্রিয় শিল্পী রিয়েল আনয়োর। তিনি সিলেটের আঞ্চলিক গান পরিবেশন করে উপস্থিত দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যান। তার গানের সুরে ও কথায় যেন ভেসে ওঠে সিলেটের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগ। মুহূর্তের জন্য দর্শকরা যেন ফিরে যান নিজেদের জন্মভূমিতে। তার পরিবেশনা শেষ হলে দীর্ঘ করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো হল।

এছাড়াও কণ্ঠশিল্পী তাপসী রায় আধুনিক বাংলা গান পরিবেশন করে অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন। তার সুরেলা কণ্ঠ ও সাবলীল উপস্থাপনা দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে পুরো সময়জুড়ে। একের পর এক জনপ্রিয় গানের মাধ্যমে তিনি উপস্থিত সবাইকে গানে গানে মাতিয়ে রাখেন।

কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে অনুষ্ঠানে ভিন্নমাত্রা যোগ করেন  প্রতিভাবান বাচিক শিল্পী হ্যাপি উদ্দিন   । তার আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী আবৃত্তি শ্রোতাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। শব্দের মাধুর্য ও কণ্ঠের জাদুতে তিনি সৃষ্টি করেন এক অনন্য পরিবেশ, যা অনুষ্ঠানের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।

অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আপ্যায়ন। আয়োজকরা অতিথিদের জন্য রেখেছিলেন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলি, যা প্রবাসীদের মনে করিয়ে দেয় দেশের স্বাদ ও স্মৃতি। নৈশভোজে পরিবেশন করা হয় পোলাওসহ বিভিন্ন ধরনের মাংসের বাহারি পদ। খাবারের মান ও বৈচিত্র্যে অতিথিরা অত্যন্ত সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

সার্বিকভাবে অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও উপভোগ্য। আয়োজকদের আন্তরিকতা ও পরিশ্রম প্রতিটি মুহূর্তে ছিল স্পষ্ট। অতিথিরা আয়োজকদের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং এমন আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।

প্রবাস জীবনে এ ধরনের আয়োজন শুধু আনন্দের উপলক্ষই নয়, বরং এটি একটি সামাজিক বন্ধন তৈরির মাধ্যম। একই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মানুষদের একত্রিত করে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে। বৃহত্তর সিলেট সমিতির এ উদ্যোগ প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মাঝে ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

সব মিলিয়ে, ফ্রাঙ্কফুর্টে অনুষ্ঠিত বৃহত্তর সিলেট সমিতির ঈদ পুনর্মিলনী ছিল এক সফল ও স্মরণীয় আয়োজন, যা অংশগ্রহণকারী সবার হৃদয়ে দীর্ঘদিন ধরে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.